২রা মার্চ, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, মঙ্গলবার, ১৭ই ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৭ই রজব, ১৪৪২ হিজরি

শিরোনামঃ-

করণিকের কাছে জিম্মি নাসিরনগর হাসপাতাল

Khorshed Alam Chowdhury

আপডেট টাইম : মে ০৭ ২০১৬, ০১:৫১ | 706 বার পঠিত

sarail-picHospital-06.05-16-4 নয়া আলো-

অফিসে বসে প্রাইভেট প্র্যাকটিস, দূর্নীতি যাচাইয়ে তদন্ত কমিটি
সামান্য একজন অফিস সহকারি (করণিক)। নাম রফিকুল ইসলাম। তার ইশারায় চলে নাসিরনগর হাসপাতাল। তার কাছে জিম্মি হাসপাতালের সকল কর্মকর্তা কর্মচারী। ঘুষ ছাড়া কোন কাজ করেন না তিনি। হাসপাতালের সকল অনিয়ম দূর্নীতির মূলে তিনি। কেউ প্রতিবাদ করলে বদলি ও চাকুরীচ্যুত করার হুমকি দেন রফিক। নতুন এরিয়ার বিল করতে আড়াই লক্ষাধিক টাকা মাসোয়ারা আদায় করেছেন রফিক। তার সকল অবৈধ কাজে মদদ দিচ্ছেন ইউএইচও। চিকিৎসকরা ইচ্ছেমত কর্মস্থলে আসেন ও যান। অনেকে অফিস সময়ে বাসায় বসে করছেন প্রাইভেট প্র্যাকটিস। খোদ ইউএইচও নিজেই অফিসে ২’শ টাকা ফি নিয়ে নিয়মিত রোগী দেখছেন। এখানে তৃতীয় চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ও গুটি কয়েক চিকিৎসকের যোগসাজশে চলে সার্টিফিকেট বাণিজ্য। এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিক লিখিত অভিযোগও হয়েছে। সম্প্রতি তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি ঘুরে গেছেন হাসপাতাল। কিন্তু চুরে না শুনে ধর্মের কাহিনী। হাসপাতালের দূর্নীতিবাজরা এখনো রয়েছে বহাল তবিয়তে। চিকিৎসা, বিছানা বালিশ না থাকায় রোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। সম্প্রতি সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সকাল সাড়ে ৯টা। হাসাপাতালে নেই কোন কর্মচারী কর্মকর্তা। চিকিৎসকদের কক্ষে ঝুলছে তালা। রোগীরা বসে অপেক্ষা করছেন। হাসপাতাল সংলগ্ন কোয়ার্টারে থাকেন আবাসিক চিকিৎসক ডা. মাসুক আল-মারজান (মারুফ)। ৩ বছরেরও অধিক সময় ধরে আছেন এখানে। বাসায় বসে ২শ টাকা ভিজিটে রোগী দেখছেন তিনি। বাসার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ডজন খানেক এমআর। ডা.মারুফের বাসা থেকে বেরিয়ে আসেন শ্রীঘর গ্রামের হাজী ওয়াহেদ আলী (৭০)। হাতে ডা. মারুফের প্রেসকিপশন। তিনি ক্ষোভের সাথে বলেন, হাসপাতালে কোন চিকিৎসা নেই। টাকা ছাড়া রোগী দেখে না। এখন মারুফ ডাক্তারকে ২’শ টাকা দিয়ে চিকিৎসা করলাম। ফ্যান বিকল। বিছানা, বালিশ বাড়ি থেকে নিয়ে আসতে বলে। নইলে বের করে দেয়ার হুমকি দেয় ডাক্তাররা। ৯টা ৩৭ মিনিটে আসেন ডা. রনি রায়। ৯টা ৫৪ মিনিটে দৌঁড়ে আসেন ডা. মারুফ ও ডা. মকবুল। ওইদিন ১২ জন চিকিৎসকের মধ্যে মাত্র ৪ জনকে পাওয়া যায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মচারী ও রোগী জানায়, ইউএইচও ডা. সুকলাল সরকার অফিসে বসেই সকাল থেকে ২’শ টাকা ভিজিটে রোগী দেখেন আড়াইটা পর্যন্ত। টেনে খিঁচড়ে রোগী ধরে আনার দায়িত্বে রয়েছেন এমএলএসএস আনোয়ার হোসেন, শাহ আলম ও হরিপদ সরকার নামের এক লোক। বিনিময়ে তাদেরকে দেয়া হয় কমিশন। এ ছাড়া হাসপাতাল সংলগ্ন একাধিক প্রাইভেট ক্লিনিক ও প্যাথলজির সাথে ওই চিকিৎসকদের রয়েছে গোপন কমিশন চুক্তি। তাই তারা রোগীদের ইচ্ছেমত নিরীক্ষা লিখে পাঠিয়ে দেন পছন্দের প্যাথলজিতে। ওয়ার্ড বয় চেনু মিয়া, ব্রাদার আমির হোসেন ও কতিপয় চিকিৎসকের যোগসাজশে চলে সার্টিফিকেট বাণিজ্য। সার্টিফিকেটের ধারা পরিবর্তনে টাকা রফাদফা করে চেনু ও আমির। আর কাজ করেন চিকিৎসকরা। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, এখানে দীর্ঘদিন ধরে বিকল হয়ে আছে এক্স-রে মেশিন। জনবল শুন্য প্যাথলজি। কম্পিউটার না থাকায় অচল আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন। তাই প্রাইভেট প্যাথলজি গুলোর ব্যবসা এখানে চাঙ্গা। দুপুর ১২টায় গোকর্ণ চাকমোতে গিয়ে দেখা যায় রোগীরা ঘুরছে। মেডিকেল অফিসের সকল কক্ষে তালা। কোন ছুটি ছাড়াই কর্মস্থলে অনুপস্থিত উপ-সহকারি কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার ডা. ছোটন চন্দ্র দাস। রোগীরা ঘুরছে। চিকিৎসা নিতে আসা রোগী তাছলিমা, আবের মা, সমুজ আলী ও তাইফুর জানায়, এখানে চিকিৎসার জন্য ৫টাকা থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। ডাক্তার মন চাইলে আসেন। অনেক দিন আসেন না। তিনি চৈয়ারকুড়ি বাজারে মায়া মেডিকেল হলে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন।
করণিক রফিকের অনিয়ম দূর্নীতিঃ
২০১১ সালে সিএস অফিস থেকে রফিককে দূর্নীতির দায়ে নাসিরনগরে পানিশম্যান বদলি করে কর্তৃপক্ষ। যোগদানের পর থেকে সরকারি বাসায় ভাড়া ফাঁকি দিয়ে বসবাস করছেন তিনি। রফিকের কলমের কারিশমার কাছে অসহায় সকল কর্মকর্তা কর্মচারী। এখানেও শুরু করেন দূর্নীতি। তার আরেক সহযোগী হলেন হিসাব সহকারি অমর চান ঘোষ। কর্মচারীদের যে কোন কাজে গুনতে হয় মোটা অংকের মাসোয়ারা। টাকা না দিলেই আটকে থাকে ফাইল। তাদের অপকর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলেই দেয়া হয় বদলির হুমকি। কর্মচারীদের উপর চালানো হয় কাগজ কলমের খড়গ। বিনা কারনে অনুপস্থিত দেখিয়ে দেয়া হয় কারন দর্শানো নোটিশ। গত ২ মার্চ গোকর্ণ উপ-স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অফিস সহায়ক মোহাম্মদ এমদাদুল হক সিভিল সার্জন বরাবরে রফিক ও ইউএইচও’র বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগ পত্র ও একাধিক কর্মচারীর সাথে কথা বলে জানা যায়, সম্প্রতি নতুন এরিয়ার বিলের জন্য আড়াই শতাধিক কর্মচারীর প্রত্যেকের কাছ থেকে রফিক ১ হাজার টাকা করে আদায় করেছে ঘুষ। ঘুষের বিরুদ্ধে মুখ খুলেন কতিপয় কর্মচারী। তাদেরকে দেন নানা হুমকি ধমকি। রফিক ইউএইচও’র নির্দেশেই সবকিছু হচ্ছে বলে জানান। গত ৫ বছর ধরে সরকারি বাসায় থাকেন রফিক। কৌশলে ভাড়া ফাঁকি দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। জিপি ফান্ডের টাকা উত্তোলন করতে গেলে রফিকের ঘুষ লাখে ২ হাজার টাকা বাধ্যতামূলক। আর ৫০ হাজারে দিতে হয় ১ হাজার টাকা। ২০১৬ সালে চতুর্থ শ্রেণির ৭ জন কর্মচারীর পোশাক ক্রয়ের বরাদ্ধ আসে ৩৭ হাজার টাকা। এ বিষয়ে কোন দরপত্র আহবান করা হয়নি। রফিক নিজেই তাদের প্রত্যেককে নগদ ২ হাজার টাকা করে ১৪ হাজার টাকা দেন। বাকী ২৩ হাজার টাকা উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সাথে ভাগবাটোয়ারা করে ফেলেন। হাসাপাতালের দারোয়ান শাহিন বলেন, এরিয়ার বিলের জন্য রফিক স্যার ১ হাজার টাকা নিয়েছেন। তদন্তের পর ৫’শ টাকা ফেরৎ দিয়েছেন। এমদাদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয় থেকে সদর উপজেলা হাসপাতালের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আবু সালেহ মোহাম্মদ মুসা খান কে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত টীম গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কার্ডিওলজিষ্ট ডা. মোঃ দেলোয়ার হোসেন ও সিভিল সার্জন অফিসের মেডিকেল অফিসার ডা. আবদুল কাদির নোমান। গত ৮ মার্চ সরজমিনে অভিযোগ সমূহের তদন্ত করেন ওই কমিটি। ডা. এ এস এম মুসা খান বলেন, তদন্তকালে আমরা অধিকাংশ অভিযোগের সত্যতা পেয়েছি। তদন্ত প্রতিবেদনও জমা দিয়ে দিয়েছি। অফিস সহকারি মোঃ রফিকুল ইসলাম বলেন, গত মাঘ মাস থেকে আমি সরকারি বাসায় থাকি। এরিয়ার বিলের জন্য ঘুষ নেয়া সহ অন্য সকল অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন। আবাসিক চিকিৎসক ডা. মাসুক আল-মারজান (মারুফ) অফিস সময়ে রোগী দেখার কথা স্বীকার করে বলেন, টাকা নেয়নি। এলাকার লোকজন আসলে তো তাড়িয়ে দিতে পারি না। নাসিরনগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ সুকলাল সরকার চিকিৎসকদের বিলম্বে আসা ও না আসার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমি এ জন্য সবার আগে আসি। অফিস সময়ের আগে ও পরে আমি হাসপাতালে রোগী দেখি।সূত্র আমাদের ব্রাক্ষনবাড়িয়া

Please follow and like us:

পাঠক গনন যন্ত্র

  • 4394668আজকের পাঠক সংখ্যা::
  • 2এখন আমাদের সাথে আছেন::

সর্বশেষ খবর

এ বিভাগের আরও খবর

প্রধান সম্পাদক- খোরশেদ আলম চৌধুরী, সম্পাদক- আশরাফুল ইসলাম জয়,  উপদেষ্টা সম্পাদক- নজরুল ইসলাম চৌধুরী।

ঢাকা অফিস : রোড # ১৩, নিকুঞ্জ - ২, খিলক্ষেত, ঢাকা-১২২৯,

সম্পাদক - ০১৫২১৩৬৯৭২৭,০১৮৮০৯২০৭১৩

Email-dailynayaalo@gmail.com

প্রধান সম্পাদক কর্তৃক  প্রচারিত ও প্রকাশিত

সাইট উন্নয়নেঃ ICTSYLHET