১৪ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, শুক্রবার, ৩১শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১লা শাওয়াল, ১৪৪২ হিজরি

শিরোনামঃ-

তার ছেঁড়া শিক্ষক স্বেচ্ছায় কান ধরেছে,ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই আসে না-সেলিম ওসমান

Khorshed Alam Chowdhury

আপডেট টাইম : মে ২০ ২০১৬, ০৪:২৪ | 669 বার পঠিত

14842_f2 নয়া আলো- শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনায় ক্ষমা চাইবেন না বলে জানিয়েছেন সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান। তিনি দাবি করেছেন ওই শিক্ষককে অপমান করেননি, এলাকাবাসীর দাবির প্রেক্ষিতে শাস্তি দিয়েছেন। ওই শিক্ষককে ‘তার ছেঁড়া’ আখ্যা দিয়ে জাতীয় পার্টির এ সংসদ সদস্য বলেছেন, এ ঘটনার জন্য তার ফাঁসি হলেও তিনি তা মাথা পেতে নেবেন। কারণ ওই শিক্ষক আল্লাহকে নিয়ে কটূক্তি করেছেন।
গতকাল নারায়ণগঞ্জ ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। গত শুক্রবার বন্দর উপজেলার পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে প্রকাশ্যে হেনস্তা করা হয়। এমপি সেলিম ওসমান ওই শিক্ষককে কান ধরে উঠবস করান। এ ঘটনার ভিডিও চিত্র প্রকাশ হওয়ার পর ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয় দেশজুড়ে। দাবি উঠে সেলিম ওসমানের সংসদ সদস্য পদ বাতিলের। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে আসেন সেলিম ওসমান। তার কাছে একজন সাংবাদিক জানতে চান, এ ঘটনায় সারা দেশের লোক ‘সরি স্যার’ বলছে। সাধারণ জনগণ ও রাজনৈতিক মহল থেকে আপনার ক্ষমা চাওয়ার দাবি উঠেছে। আপনি ক্ষমা চাইবেন কি না? এতে পাল্টা প্রশ্ন করে তিনি বলেন, ‘আমি কার কাছে ক্ষমা চাইব? আল্লাহর কটাক্ষকারীর কাছে?। আমি যদি মরেও যাই তাও ক্ষমা চাইবো না। তিনি আরো বলেন, কোনো শিক্ষককে অপমান করিনি, আল্লাহকে কটূক্তি করার কারণে এলাকাবাসীর দাবির প্রেক্ষিতে সাজা দিয়েছি। বিচার হয়েছে। এতে যদি আমার ফাঁসি হয় মাথা পেতে নেব। ১৯৭১ সালে যুদ্ধ করে শহীদ হতে পারিনি গাজী হয়েছি। এখন আমার আল্লাহকে নিয়ে কটূক্তির বিচার করে যদি ফাঁসি হয় তাহলে বুঝবো শহীদ হয়েছি। তবে আমি সমাজের কাছে দুঃখিত, লজ্জিত যে, তারা এমন একটি ভিডিও দেখেছেন, যাতে তারা আমাকে ভুল বুঝেছেন। কারণ যখন মাস্টারকে কান ধরে উঠবস করা হয় তখন এলাকার লোকজন ‘নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবর’ স্লোগান দেয়। অথচ সেখানে জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান জুড়ে দেয়া হয়েছে। ঘটনার পর আমি প্রধান শিক্ষককে পুলিশ প্রহরায় হাসপাতালে পাঠিয়েছিলাম। মাস্টার এখন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে অথচ কেউ কোন খবর নিল না তার চিকিৎসার খরচ কে চালাচ্ছে? স্টোক করেছিল। এ ধরনের একজন ব্যক্তিকে কিভাবে প্রধান শিক্ষক বানানো হয়েছিল সেটাও আমার বোধগম্য না। এই ঘটনার পর আমি স্থানীয় হিন্দু নেতাদের দিয়ে তার সম্পর্কে খোঁজ খবর নিয়েছি। তারা আমাকে জানিয়েছে শ্যামল কান্তি এলাকায় ‘তার ছেঁড়া’ শিক্ষক হিসেবে পরিচিত।
সংবাদ সম্মেলনে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য লিয়াকত হোসেন খোকা, জাতীয় শ্রমিকলীগের সাবেক সভাপতি আবদুল মতিন মাস্টার, গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ এর সহ-সভাপতি জিএম ফারুক, বাংলাদেশ ইয়ার্ন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি লিটন সাহা, বাংলাদেশ হোসিয়ারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নাজমুল আলম সজল, নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সহ-সভাপতি মঞ্জুরুল হক, আবদুস সোবহান, নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি খোকন সাহা, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আনিসুর রহমান মিঞা, বন্দর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান মুকুলসহ বিপুল সংখ্যক দলীয় নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।
সেলিম ওসমান বলেন, নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে আমাকে গণপিটুনি দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। আমাকে গণপিটুনি দেয়া হলে আমার ভালোবাসার মানুষরা কি হাতে চুড়ি পরে বসে থাকবে? তবে আমার নির্দেশ, অনুরোধ কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে। আমার ফাঁসি হলেও বিশৃঙ্খলা করা যাবে না। আমাকে সাজা দেয়া হলেও কোনো প্রতিবাদ হবে না। আমি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করবো।
একজন শিক্ষককে কান ধরানো অপরাধ ও এতে আইনভঙ্গ হয়, এ কথা স্বীকার করে সেলিম ওসমান বলেন, শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে বাঁচানোর জন্য তিনি তা করেছেন। ইমানদার মুসলমানেরা শিক্ষকের শাস্তি চেয়েছিলেন। তিনি সাংবাদিকদের কাছে জানতে চান, ‘আমরা কি ইবলিশের রাজত্বে বাস করছি? আপনারা জবাব দেন।’ তখন এক সাংবাদিক বলেন, আমরা ইবলিশের রাজত্বে বাস করছি না। তবে কিছু ইবলিশ আছে। তারা সমস্যা সৃষ্টি করছে।
শিক্ষামন্ত্রী স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি বাতিল ও প্রধান শিক্ষককে স্বপদে বহাল করেছেন সংবাদ সম্মেলন করে। এ বিষয়ে সেলিম ওসমান বলেন, তদন্ত কমিটি তো আমার কাছে একবারও ঘটনা সম্পর্কে জানতে চায়নি। তাহলে রিপোর্ট চূড়ান্ত হলো কীভাবে?  আমি উন্মাদ না, আমার কাছে ওই শিক্ষকের কটূক্তির বিষয়ে প্রমাণ আছে। তার জীবন বাঁচানোর জন্য আমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ওই শিক্ষক লিখিত দিয়েছেন। সেগুলো আমি প্রকাশ করবো। আর শিক্ষককে স্বপদে বহাল করা না করার দায়িত্ব তো আমার না।  সেটা শিক্ষা মন্ত্রণালয় দেখবে।
আদালতের রুলের বিষয়ে তিনি বলেন, আদালত রুল জারি করেছেন, এখন আদালত যদি আমার ফাঁসিও দেন, তাহলেও আমি আপত্তি করব না। তবে আমি এটা মনে করব যে, জাহান্নামের আগুন থেকে আমি বেঁচে গেছি। আল্লাহকে কটূক্তিকারীকে জনরোষ থেকে বাঁচাতে কান ধরে উঠবস করানোর কারণে যদি আমার ফাঁসি হয়, আমি মাথা  পেতে নেবো।
আদালতে সাজা হলে আমি সব ধরনের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করবো উল্লেখ করে তিনি বলেন, আদালতের রুলে বলা হয়েছে, ওই সময় ভিডিওতে যাদের দেখা গেছে তারা আমার সহকর্মী। তারা আমার সহকর্মী না, তারা ঘটনার সাক্ষী হিসেবে ছিলেন। ফলে যা সাজা হয়, তা যেন সব আমারই হয়। তাদের কোনো দোষ নেই।
শুক্রবারের ঘটনা প্রসঙ্গে সেলিম ওসমান বলেন, শুক্রবার সকাল ১০টায় ওই স্কুলের হিসেব নিকেশ নিয়ে একটি সভা ডাকা হয়েছিল। ওই স্কুলে ইতিমধ্যে আমার ব্যক্তিগত তহবিল হতে ৫০ লাখ টাকা অনুদান দেয়া হয়েছে।  শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টায় স্কুল শিক্ষককে গণপিটুনি দিয়ে একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়। পরে পুলিশ এসে প্রধান শিক্ষককে উদ্ধার করে স্কুলের একটি কক্ষে আটকে রাখে। পুলিশ ও স্থানীয়রা তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছিল না। দুপুর ১২টায় আমাকে ফোন করা হয়। তখন আমি স্থানীয়দের জানাই তোমরা আমার ওপর আস্থা রাখতে পারবা কী না। উত্তরে তারা হ্যাঁ জানায়। ওই সময়টাতে পুলিশ প্রশংসা পাওয়ার মতো কাজ করেছে। কারণ উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করতে হলে তখন পুলিশের লাঠিচার্জ কিংবা গুলি করা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। আমি জুমার নামাজের পর রওনা দিয়ে বিকাল ৪টায় ঘটনাস্থলে গিয়ে পৌঁছাই। তখন সেখানে গিয়ে দেখি ৫ হাজারের মতো লোকজন বৃষ্টিতে ভিজে সেখানে উপস্থিত রয়েছে। তাদের মধ্যে ৮শ’ থেকে ১ হাজার নারীও ছিল। অনেকেই সেদিন দুপুরে নামাজ পড়তে যায় নাই। আমি সেখানে গিয়ে শুনেছি, ওই শিক্ষক একজন ছাত্রকে মেরেছিলেন। ছাত্র পরে অসুস্থ হয়ে যায়। শিক্ষক বাজার থেকে ওষুধ এনে ছাত্রকে খাওয়ান। ওই ছাত্র আরও অসুস্থ হয়ে পড়ে। এর মধ্যেই ওই শিক্ষক ইসলামধর্ম নিয়ে কটূক্তি করেছেন বলে এলাকার লোকজন তাঁকে গণপিটুনি দিয়েছিল। পুলিশ শিক্ষককে একটি ঘরে নিরাপত্তা দিয়ে রাখে। আমি সেখানে যাওয়া মাত্র এলাকার লোক আমাকে বলেছে, ‘ওই শিক্ষককে আমাদের হাতে ছেড়ে দেন।’ আমরা তাকে কেটে কুচি কুচি করবো। কিন্তু আমি কোনো সামপ্রদায়িক দাঙ্গা চাইনি। তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে আমি বদ্ধ ঘরে থাকা হেড মাস্টারের কাছে কারণ জানতে চাই এবং ধর্ম নিয়ে কোনো কটূক্তি করেছে কী না সেটা জানতে চাই। উত্তরে প্রধান শিক্ষক আমাকে বলেন, দুই বছর আগে আমার ব্রেন স্ট্রোক হয়েছে। মাথা ঠিক নেই। আমি ব্রেনের রোগী। কটূক্তি করলেও করতে পারি। আমি তিন কন্যার বাবা, আমি একজন কন্যা দ্বায়গ্রস্ত পিতা। আমার পা ধরে সে বলে আপনি আমার জীবন রক্ষা করেন। এ সময় আমার মনে হয়, আমার নিজেরও তিন মেয়ে আছে। কিন্তু জনগণের দাবি তাকে ক্ষমা চাইতে হবে। তখন তাকে আমি জিজ্ঞেস করি আপনি এখন কী করবেন, তখন প্রধান শিক্ষক স্বেচ্ছায় কানে ধরে উঠবস করার প্রস্তাব দেন। এতে আমি রাজি হই। পরে আমি তাকে ঘর থেকে বের করে আনি। তখন হেড মাস্টার স্বেচ্ছায় কানে ধরে উঠবস করেন। এবং হাতজোড় করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তবে হ্যাঁ, তখন আমি এলাকাবাসীর জন্য পরিস্থিতি সামাল দিতে আঙুল দিয়ে উঠবস করতে বলেছিলাম। আমি যা করেছি, একজন মানুষের জীবন রক্ষার জন্য।’
সেলিম ওসমান বলেন, ওই দিন আমিই পুলিশকে বলে ঘটনাস্থল থেকে শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে হাসপাতালে নেয়ার ব্যবস্থা করি। হাসপাতালে সব চিকিৎসার খরচ আমিই বহন করছি। শ্যামল কান্তি ভক্তের সঙ্গে আমার ফোনে যোগাযোগ হচ্ছে। আজ (গতকাল) সকালেও শিক্ষকের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। ওই শিক্ষক বলেছেন, তিনি ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত। উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি ভারতের ভেলোরে যেতে চান। আমি তাকে বলেছি সহায়তা করবো।

Please follow and like us:

পাঠক গনন যন্ত্র

  • 4527358আজকের পাঠক সংখ্যা::
  • 0এখন আমাদের সাথে আছেন::

সর্বশেষ খবর

এ বিভাগের আরও খবর

প্রধান সম্পাদক- খোরশেদ আলম চৌধুরী, সম্পাদক- আশরাফুল ইসলাম জয়,  উপদেষ্টা সম্পাদক- নজরুল ইসলাম চৌধুরী।

প্রধান সম্পাদক কর্তৃক  প্রচারিত ও প্রকাশিত

ঢাকা অফিস : রোড # ১৩, নিকুঞ্জ - ২, খিলক্ষেত, ঢাকা-১২২৯,

সম্পাদক - ০১৫২১৩৬৯৭২৭,০১৮৮০৯২০৭১৩

Email-dailynayaalo@gmail.com নিউজ রুম।

Email-Cvnayaalo@gmail.com সিভি জমা।

 

 

সাইট উন্নয়নেঃ ICTSYLHET