২৯শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, বৃহস্পতিবার, ১৪ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৮ই জিলহজ, ১৪৪২ হিজরি

শিরোনামঃ-

মাদক একটি আতংকের নাম।

Khorshed Alam Chowdhury

আপডেট টাইম : আগস্ট ১৩ ২০১৬, ০০:০১ | 749 বার পঠিত

13939297_1567652556874034_7567036045811935842_nমাদক একটি আতংকের নাম।-

মোঃ আক্তারুজ্জামান- মাদক একটি আতংকের নাম। মাদক কি ধরণের আতংক, তা শুধু ভুক্তভোগী পরিবারই হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করতে পারে। একটি পরিবারের কেউ মাদকাসক্ত হয়ে পড়লে সেই পরিবারটির ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। প্রতিটি সন্তানই বাবা মায়ের অতি আদরের ধন। সেই সন্তান যদি মাদকের কবলে পড়ে নষ্ট হয়, তখন বাবা মায়ের কষ্টের শেষ থাকে না। অনেক সময়ই পত্রিকায় খবর হয়, নেশার টাকা না পেয়ে বাবা মাকে খুন করেছে মাদক আসক্ত সন্তান।

আবার অনেক সময়ই জানা যায়, বাবা মা অতিষ্ঠ হয়ে মাদকাসক্ত সন্তানকে তুলে দেন পুলিশের হাতে। উপায় কি? একজন মাদকাসক্ত একটি সমাজ ধ্বংসের জন্য যেখানে যথেষ্ট, সেখানে নষ্ট সন্তানকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দিয়ে গোটা সমাজকে রক্ষার চেষ্টা করাই শ্রেয়। শোনা যায়, বিত্ত বৈভবে বেড়ে ওঠা কোন কোন পরিবারের ছেলে মেয়েরা ফ্যাশন হিসেবে এখন মাদক গ্রহণ করে। আবার কোন কোন পরিবারের শিক্ষিত আধাশিক্ষিত যুবশক্তি বেকার থাকায় এক ধরণের হতাশা থেকেই মাদক আসক্ত হয়ে পড়ে। আবার মাদক আসক্ত ছেলে মেয়ের মধ্যে অনেকেই মাদকের টাকা জোগাড় করতে জড়িয়ে পড়ে অনৈতিক কর্মকান্ডে।

এমনকি মাদকাসক্ত একজন তরুণ কিম্বা যুবককে অনায়াসেই খুনখারাপি, রাহাজানি, ছিনতাই কিম্বা চাঁদাবাজির মতো কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে অনেক সময় নেশাগ্রস্তদের দিয়ে মাদকের চালান পাচারের কিম্বা বিক্রির চেষ্টা কালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হাতে ধরাও পড়ে। কিন্তু মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত রাঘব বোয়ালরা ধরা পড়ে না। তারা থেকে যায় পর্দার আড়ালে। তাদেরকে কেন সনাক্ত করে আইনে সোর্পদ করা হয় না তা সাধারণ মানুষের বোধগম্য নয়। তবে জনশ্র“তি আছে, অনেক ক্ষেত্রে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় মাদকের অবাধ কেনা বেচা হয়। মাদক ব্যবসায়ীরা মাসোহারা দিয়ে নির্বিঘেœ মাদকের ব্যবসা চালিয়ে যায়। আবার কোন কারণে উভয়ের মধ্যে লেনদেনে সমস্যা হলে মাঝে মধ্যেই অপরাধীদের কেউ কেউ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরাও পড়ে।

কিন্তু মাদকের চালান আসা বন্ধ হয় না। ফলে মাদকের ব্যবহারও ক্রমান্বয়েই বাড়ে। সর্বনাশা মাদক নিয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য গোটাদেশেই মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর দেয়াল লিখন, পোষ্টার, ব্যানার টাঙ্গিয়ে দিচ্ছে, এমনকি মোবাইলে এসএমএসও করছে। অবশ্যই জনসচেতনতার জন্য এগুলো যে ভাল দিক, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে, জনসচেতনতার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরো বেশি তৎপর হতে হবে, যেন মাদকের চালান বন্ধের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অপরাধিদের পাকড়াও করে আইনে সোপর্দ করা হয়। বাস্তবতা হচ্ছে, মাদক সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের দ্রুত ট্রাইব্যুনালে বিচার করে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে মাদকের বিস্তার রোধ করা সম্ভব হবে না। এজন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলাও জরুরী। মূলত মাদক অতি মুনাফার একটি পণ্য।

যে পণ্য চোরাই পথে এনে গোপনে বাজারজাত করলে রাতারাতি অঢেল অর্থের মালিক হওয়া যায়। ফলে দেশের নামিদামি লোকজন এমনকি নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য পর্যন্ত মাদকের বিশেষ করে ইয়াবা ব্যবসার সহিত জড়িয়ে পড়ছে। এই সাংসদকে ঘিরে ২০১৩ সালে জাতীয় দৈনিক সমকালে ধারাবাহিকভাবে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছিল। প্রকাশিত প্রতিবেদন মতে, টেকনাফের সাংসদ আব্দুর রহমান বদির পরিবার ও স্বজনরা ইয়াবা ব্যবসা ছড়িয়ে দিচ্ছে ১৩৬ সদস্যের বিশেষ একটি টিমের মাধ্যমে। যারা মিয়ানমার থেকে টেকনাফ এবং টেকনাফ থেকে ইয়াবা ছড়িয়ে দিচ্ছে গোটাদেশে। তবে সাংসদ আব্দুর রহমান বদি শুরু থেকেই বলে আসছেন, তিনি কিম্বা তার পরিবারের কেউ ইয়াবা ব্যবসার সহিত জড়িত নন। সে দাবী তিনি এখনও করেন। প্রশ্ন হলো, ইয়াবা যে মিয়ানমার থেকে টেকনাফ হয়েই দেশে প্রবেশ করছে, এটাকে তো অস্বীকার করার জো নেই। সাংসদ আব্দুর রহমান বদি যেহেতু টেকনাফের সংসদ সদস্য তিনি ইয়াবার চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত কারা কিম্বা কি করলে টেকনাফ হয়ে ইয়াবা আসা বন্ধ হবে, এ উদ্যোগ নিয়ে অপরাধিদের চিহ্নিত করলে হয়ত তার নাম মুছে ফেলা সম্ভব হত।

কিন্তু পত্র পত্রিকায় এমন খবর আমাদের চোখে যেহেতু পড়েনি, সেহেতু বলা যায়, রাঘব বোয়ালরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকেই কলকাঠি নাড়েন এবং চুটিয়ে ব্যবসা করেন। এ প্রসঙ্গে জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক দফতর (ইউএনওডিসি) ২০১৩ সালে প্রকাশিত একটি রিপোর্টে উলেখ করে, ২০০৯ সালে বাংলাদেশে ভয়ংকর মাদক ইয়াবা ধরা পড়ে এক লাখ ৩০ হাজার পিস। ২০১০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় আট লাখ ১২ হাজার পিস। আবার বছর ঘুরতে না ঘুরতেই ২০১১ সালের শুরুতে ইয়াবা আটকের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৪ লাখ পিস (সূত্র দৈনিক সমকাল ৩/১১/১৩ইং)। এত বিপুল পরিমাণ ইয়াবা যদি আটক হয়, তাহলে বলতেই হবে এর কয়েকগুণ বেশি ইয়াবার রমরমা ব্যবসাও হয়। তাহলে দেশের তরুণ তরুণী থেকে যুবক যুবতীরা ভাল থাকবে কি করে? বাংলাদেশ মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হলেও মাদকদ্রব্য চোরাকারবারীর আন্তর্জাতিক রুট হিসেবেই ব্যবহƒত হচ্ছে। ইতিমধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির (সিআইএ) প্রকাশনা ‘ওয়ার্ল্ড ফ্যাকট বুক’ ও জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের (আইএনসিটি) প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর মাদক পাচারের ট্রানজিট দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

শুধু বিদেশি সংস্থাই নয়, খোদ বাংলাদেশ সরকারের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটেও বাংলাদেশকে হিরোইন ট্রানজিট দেশ হিসেবে দেখানো হয়েছে। ভারত ও মিয়ানমার রুট ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় আন্তর্জাতিক মাদক ব্যবসায়ী ও মাফিয়াদের নিকট বাংলাদেশ এখন অনেকটাই নিরাপদ রুট। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে মাদক পাচারের জন্য বাংলাদেশকে পশ্চিমাঞ্চল, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল এবং উত্তর ও উত্তর পশ্চিমাঞ্চল রুটে ভাগ করা হয়েছে। মূলত মাদক পাচারের জন্য এই রুটগুলোই যথেচ্ছভাবে ব্যবহƒত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, পাকিস্তান, ভারত, ইরান, আফগানিস্তানের মতো দেশ আফিমের একটি বড় বাজার নিয়ন্ত্রণ করে।

শুধুমাত্র আফগানিস্তানেই বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ অফিম উৎপাদন হয় এবং ৮৫ শতাংশ হেরোইন ও মরফিনও তৈরি হয়। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিভাগ গত ২০১০ সালে ভারতেও প্রচুর পরিমাণ আফিম উৎপাদন হয় মর্মে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। প্রতিবেদন মতে, ভারতের আফিম ও হিরোইন বাংলাদেশ ও নেপালে চলে যায়। আন্তর্জাতিক মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থার তথ্যমতে, প্রতিবছর পাকিস্তান থেকে ২৫ মেট্রিক টন হিরোইন পৃথিবীর নানা দেশে চলে যায়। পাশাপাশি পাকিস্তান থেকে কুরিয়ারে, ভারত থেকে ট্রেন ও মোটরযানে এবং মিয়ানমার থেকে বঙ্গোপসাগর দিয়ে ট্রাক ও গণপরিবহনে হেরোইনের চালান বাংলাদেশে ঢোকে।

এমনকি চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে বাংলাদেশ থেকে অধিকাংশ হেরোইন অন্যান্য দেশে পাচার হচ্ছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ এখন মাদক পাচারের নিরাপদ রুটে পরিণত হয়েছে। সংগত কারণেই বাংলাদেশে মাদকের ব্যবহার আশংকাজনক হারে বাড়ছে। এ প্রসঙ্গে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক এএমএস শাজাহান বলেন, এক দিকে অর্থনৈতিক উন্নতি, অন্যদিকে অর্থনৈতিক বৈষম্য, আকাশ সংস্কৃতি, দ্রুত প্রযুক্তির বিকাশ এবং মাত্রাতিরিক্ত শোষণের কারণে মানুষের নৈতিক মূল্যবোধ যেমন ধ্বংস হচ্ছে, তেমনি সামাজিক অস্থিরতাও সমানেই বাড়ছে। মানুষের নৈতিক মূল্যবোধের উন্নতি ঘটানো সম্ভব না হলে সামাজিক অপরাধকে রোধ করা সম্ভব হবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

বাস্তবে পুঁজিবাদি সমাজ ব্যবস্থায় একদিকে চলে বিত্ত বৈভবে বড় হওয়ার নগ্ন প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের অভাবে দেশের কর্মক্ষম একটি বড় অংশ বেকারত্বের কারণে হতাশার চোরাচালিতে আটকে গিয়ে নিজেদের ধ্বংস করছে অনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে। সা ¤প্রতিক সময়ে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার পাঁচেই গ্রামের একুশে স্কুল মাঠের এক অনুষ্ঠানে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোঃ আমির হোসেন বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর কিছু প্রভাবশালী নেতা মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। দেশকে মাদকের ছোবল থেকে বাঁচাতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা ও অঙ্গিকার থাকা

প্রয়োজন। তিনি আরো বলেন, বর্তমানে দেশের প্রায় ৭০ লক্ষ মানুষ নানা ধরণের মাদক গ্রহণ করছে। এর মধ্যে যুবকের সংখ্যাই বেশি। গত বছর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ১ কোটিরও বেশি ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে, যা মাদক বিস্তারের ১০ ভাগ মাত্র। তাঁর এ পরিসংখ্যান এতই উদ্বেগের যে, যেখানে বছরে উদ্ধারকৃত ১ কোটি ইয়াবা মোট ইয়াবা ব্যবহারের মাত্র ১০ শতাংশ, সেখানে বলার অপেক্ষা রাখে না ইয়াবাসহ মাদকের বিস্তার মহামারিতে রূপ নিয়েছে। গত ২৬ জুন ২০১৬ ‘আন্তর্জাতিক মাদক বিরোধী দিবস’ সারাবিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও পালিত হয়েছে। মূলত মাদকের ভয়াবহতা রোধে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে সভা, সমাবেশ, র্যালী, মানববন্ধনের মত কর্মসূচী সফল করে দিবসটি পালন করা হয়েছে। সচেতনতার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরো তৎপর হতে হবে যেন বাইরের দেশ থেকে মাদকের চালান সহসাই দেশে ঢুকতে না পারে। তা না হলে মাদকের বিস্তাররোধ করা কোন অবস্থাতেই সহজ হবে না। আর মাদকের মরণ ছোবল থেকে দেশের ভবিষ্যত প্রজš§কে বাঁচাতে হলে মাদকের বিস্তারকে রোধ করতেই হবে, এর কোন বিকল্প নেই।

Please follow and like us:

পাঠক গনন যন্ত্র

  • 4654419আজকের পাঠক সংখ্যা::
  • 3এখন আমাদের সাথে আছেন::

সর্বশেষ খবর

এ বিভাগের আরও খবর

প্রধান সম্পাদক- খোরশেদ আলম চৌধুরী, সম্পাদক- আশরাফুল ইসলাম জয়,  উপদেষ্টা সম্পাদক- নজরুল ইসলাম চৌধুরী।

প্রধান সম্পাদক কর্তৃক  প্রচারিত ও প্রকাশিত

ঢাকা অফিস : রোড # ১৩, নিকুঞ্জ - ২, খিলক্ষেত, ঢাকা-১২২৯,

সম্পাদক - ০১৫২১৩৬৯৭২৭,০১৮৮০৯২০৭১৩

Email-dailynayaalo@gmail.com নিউজ রুম।

Email-Cvnayaalo@gmail.com সিভি জমা।

 

 

সাইট উন্নয়নেঃ ICTSYLHET