বিজয়ের মাসে কতো স্মৃতি মনে পড়ে।
মুক্তিফৌজ কর্তৃক মাতুভুইয়া ব্রীজ ভাঙার দিন।
১৯৭১ সাল। ভোর থেকেই ধান সিদ্ব করা এবং উঠানে ধান শুকাতে ব্যস্ত মা বাবা। বিকট শব্দে সারা গাও কেপে উঠে। যুদ্ধের সময় আমার মায়ের সাথে ভাই বোন সবাই বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে ছিলাম। ঘরের ভিটায় কবর খুড়ে বাবা একা বাড়ি পাহারা দিতেন। গোয়াল ঘরে হালের গরু ছিলো। নিজেই রান্না করে খেতেন। মাঝেমাঝে লক্ষীগন্জে নদীর তীরে হালিমা ফুফুর বাড়িতে রাতে এসে আমাদের দেখে যেতেন। নঙরখানায় লাইনে দাড়িয়ে থাকতাম একটা রুটির জন্য। মান্নান ভাইয়ের সাথে নদীতে মাছ ধরতাম। সেখানে আমার বাবা সহ আবদুল খালেক ফুফা, ইসরাফিল মেম্বারকে সংগঠিত হতে দেখেছি । আমরা বেকের বাজার ফিরলে সেদিন জব্বার মুন্সী বলেছিল আবার পালাও। সন্ধ্যায় পাক বাহিনীর ক্যাম্পে খবর যায়। পান্জাবিরা আমাদের ঘরে ঢুকে বাবাকে ধরতে। বাবা টের পেয়ে পুকুরে কুচুরিফেনার তলে লুকিয়ে যান। মা, আমি, জাফর, সাহাব উদ্দিন, মেরাডোনা সহ সবাইকে লাইনে দাড় করা হয় গুলি করার জন্য। ইয়াকুব পুরের জাফর উল্লাহ রাজাকার বলে উঠে- ছোড় দো, ইয়ে আওরত মুসলিম হায়ে। তারা বলে- কলেমা বাতাও?
আমার মা দিলবাহারের কোলে শিশু আবুল বাসার। ভয়ে কেপে কেপে পাক বাহিনীকে কলেমা তাইয়েবা শোনান। তারা আকাশে গুলি করতে করতে মহাসড়কে চলে যায়। গভীর রাতে বাবা পুকুর থেকে উঠে আসেন। আমরা ভয়ে আবার বাড়ি ছেড়ে পালাই। মানিক মিয়ার বাড়ি ছিল পাক বাহিনীর ক্যাম্প। হাজি মান্নান চাচা ছিলেন তাদের বাবুর্চি হেলপার। কজন নেইবার বেকের বাজার মসজিদের মুয়াজ্জিন জব্বার মুন্সীর গাভিন গাই চুরি করে এনে রাতেই বাড়ির পেছনে জবাই করে। হারিকেনের আলোয় ভাগাভাগি করেন।আমি তামাশা দেখেছি। আবদুর রব চাচা ঢাকা থেকে হেটে হেটে ফেনী আসেন।
তার কিছুদিন পর আমার ছোটবোন রোকেয়ার জন্ম হয়। পাক বাহিনীর উৎপাতে আবার সবাই গ্রাম ছেড়ে পালাই। মাঝে মাঝে বাবার সাথে পুথি পড়তাম। সেই সুখ স্থায়ী হয়নি। যুদ্ধের পর শুরু হয় দুর্ভিক্ষ। বড় ভাইয়ের সাথে মানিক বিড়ির কারিগর হিসাবে হিরাপুর যেতাম। ময়না বিড়ি, রাজ বিড়ি বানাতাম। ফেলে আসা দিনগুলি মনে পড়ে। আবার স্কুলে ভর্তি হই। আবার পথচলা শুরু হয়। থেমে থেমে এম এ পাশ করা। হালাল রিজিকের সন্ধানে ছুটে চলা।
চলার পথের ক্লান্তি গুলো,
কি যেন সব ভুলিয়ে দিলো।
রেজাউল হক হেলাল
সৌদি আরব









