৩১শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, শনিবার, ১৬ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২০শে জিলহজ, ১৪৪২ হিজরি

শিরোনামঃ-

সাহিত্য-“‘হাজার বছর ধরে’ চলবে? -ফেরদৌস আরা শাহীন

Khorshed Alam Chowdhury

আপডেট টাইম : আগস্ট ৩১ ২০১৬, ০২:৩৮ | 705 বার পঠিত

FB_IMG_1472576500845-1সাহিত্য-“‘হাজার বছর ধরে’ চলবে?
– ফেরদৌস আরা শাহীন
পাশের বস্তিতে এক মহিলা চিৎকার করে কেঁদে উঠেছে ‘ও মাগো’ ‘মারে মা’ ও ‘মা-মা তুমি কই গেলা’। তারপরই অনেক লোকের কথাবার্তার আওয়াজ। মনে হচ্ছিল বস্তিতে কোন বুড়ো মা মারা গেছে। লোকজন কী বলাবলি করছে আমি ঘরের ভেতর থেকে কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। কৌতুহল মেটাতে এবং প্রতিবেশী হিসেবে স্বান্তনা দিতে দরজা খুলে বের হলাম। আমার ধারণা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হল। মহিলার ‘ওমা গো’ বলে  আর্তচিৎকার মাকে হারানোর জন্য নয়- স্বামীর অত্যাচারেই সে সাহায্যের আশায় এমন করেছিল। পরে লোকজন এসে তাকে প্রাণে বাঁচাতে পেরেছে।
শুনলাম শোখোর স্বামী-নেশার টাকা না পেয়ে, কিছুদিন আগেও মেরেছিল, তবে আজকের মতো না। গরীব পরিবার। নুন আনতে পানতা ফুরায়। মহিলার ঠিকমত ভাতই যেখানে মেটে না, সেখানে নেশার টাকা দেবে কোত্থেকে? তবুও তার স্বামীর দাবী-নিশ্চয়ই মহিলার কাছে জমানো টাকা আছে ইচ্ছে করেই দিচ্ছে না। মহিলা যতোই-কাকুতি মিনতি করে বলুক না কেন, স্বামী সাহেব মানতে নারাজ।
ফলশ্রুতিতে ইচ্ছেমতে মেরে পা দিয়ে তার ডান হাতটা মাড়িয়ে এবং ঐ হাতের উপর লাফিয়ে (অথবা লাঠি মেরে) হাতটা ভেঙ্গেই দিয়েছে। স্বামীটির বক্তব্য- যেহেতু টাকা দিতে পারিসনি সেহেতু এই হাত দিয়ে তোকে কোন কাজ করতে দেব না। যাতে কোথাও গিয়ে তুই কাজ করেও খেতে না পারিস। আমার অন্যান্য প্রতিবেশীরা এমন নিষ্ঠুর ঘটনার বর্ণনা আমাকে দিলেও তাদের সাথে কথা বলে মনে হল এমন ঘটনা অস্বাভাবিক কিছু না। দুই একজন হাসাহাসি করে কিছু বলতে চেয়েছিল, আমি ধমক দেিয় তাদের কে নিজ নিজ বাসায় যেতে বলেছি।
কারণ ওরা কিছু করতে তো পারবেই না, একটু সমবেদনা ও না জানিয়ে নিজেরা স্বামীর হাতে মার খায়নি বলে দাঁত কেলিয়ে ক্রেডিট দেখানোকে আমি সমর্থন করতে পারি না। জহির রায়হানের বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে ‘হাজার বছর ধরে’ ছবিটির কথা মনে পড়ে গেল। নারীর প্রতি সহিংসতা হাজার বছর ধরেই শুধু চলবে? যুগে যুগে এত কিছু পাল্টাচ্ছে, এত এত চিন্তা ভাবনা বদলাচ্ছে, এই হীন মানসিকতা কোনদিন বদলাবে না।
প্রিয় পাঠক, হাজার বছর ধরে নারীর প্রতি প্রত্যেকটি পুরুষ আমি আবার বলছি- প্রত্যেকটি পুরুষ এমন করছে না, করছে কিছু কিছু পুরুষ। তাদের কেউ করছে সরাসরি শারীরিক অত্যাচার আবার কেউ করছে মানসিক অত্যচার। অর্থাৎ পরোক্ষ সহিসংতা।
কিন্তু উল্টো চিত্র ও আছে। আমি এমন বহু নারীকে দেখেছি যারা পুরুষকে এতটাই প্রভাবিত করে যে, পুরুষটার নিজস্ব অস্তিত্ব বলতে কিছুই থাকে না। পরিবারের, সমাজে যা করতে হয়, পুরুষটা তার স্ত্রীর অনুমিত ছাড়া কিছুই করতে পারেন না। যদি স্ত্ররি অনুমতি ছাড়া কোথাও যান বা টাকা পয়সা খরচ করেন তো ঘরে এলে স্ত্রীটি লংকা কান্ড বাঁধিয়ে বসেন। অনেক ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন পুরুষও একসময় ব্যক্তিত্বহীন অসহায় হয়ে পড়েন ঐ স্ত্রীটির  কারনেই।
মানুষের মধ্যে আজকাল ধৈর্য্য, সহিষ্ণুতার প্রচন্ড অভাব।
কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজী নয়। কি নারী আর কি পুরুষ। বাড়ছে দ্বন্দ্ব, বাড়ছে ডিভোর্স, বাড়ছে পরকীয়া আর তার জেরে বাড়ছে খুন। পত্রিকা খুললেই এসব যেন সকাল বেলার এক কাপ চা।
ভাবছেন আমি ব্যালেন্স রক্ষা করছি? ঠিক তা নয়। নারীর প্রসঙ্গ এলেই সে যাবে পুরুষের প্রসঙ্গ। উল্টো ভাবে বলতে গেলেও তা ই। সব পুরুষ যেমন এক নয়, সব নারীও তেমনি এক নয়। তবে যতোই তর্ক বিতর্ক করে যুক্তি উপস্থাপন করুন না কেন, নারীই বেশি ভুক্তভোগী। কর্মজীবি নারী বলেন আর বেকার নারী বলেন, আমার মনে হয় শতকরা ৮০ ভাগ নারীই কোন না কোনভাবে নির্যাতিত। সেই তুলনায় পুরুষ নির্যাতনের ভাগ ৫%- ১০% হতে পারে বলে আমার ধারণা।
সহিংস কিংবা মানসিক নির্যাতনের পাশাপাশি আরেকটি প্রসঙ্গ বাদ পড়ে যাচ্ছে। সেটা হল যৌন নির্যাতন। একজন নারীকে শৈশব থেকেই যৌন নির্যাতনের ভয়ে ভীত থাকতে হয়। হয়ত শৈশবে সে বুঝতে পারে না। তাকে আগলে রাখেন পরিবারের বয়ো:জৈষ্ঠ সদস্যরা। কিন্তু কৈশোর থেকে শুরু করে বৃদ্ধ হওয়া পর্যন্ত বেশির ভাগ নারীকে কোন না কোন ভাবে যৌন হয়রানীর শিকার হতে হয়। কেউ কেউ শেষ পর্যন্ত নিজেজে রক্ষা করতে পারে না। ফলশ্র“তিতে আজীবন তিনি প্রথমে শারীরিক এবং পরে একটা মানসিক যন্ত্রনা নেয়ে বেঁচে থাকেন।
নারী নির্যাতন বিষয়ক আইনের সংস্কার হয়েছে, কিন্তু প্রয়োগ হচ্ছে কউ? বিচার বিভাগীয় দীর্ঘ কারণে কেউ কেউ আদালতের শরনাপন্ন ও হতে চান না। ফলে ধর্ষক পার পেয়ে যায় এবং উত্তরোত্তর ধর্ষণে উদ্বুদ্ধ হয়। সমাজে অভাগীদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। একটা ব্যাপার ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। প্রায়ই শোনা যাচ্ছে কন্যা শিশু ধর্ষণের খবর। বিষয়টা আঁতকে উঠার মতো।
যে মেয়েটির এখনও নারী অংগই ভালোভাবে তৈরি হয়নি, তার এই অংগ ভবিষ্যতে কোন কাজে ব্যবহৃত হবে সেটা নিজে বুঝে উঠবার আগেই তার জীবনে যদি ভয়াবহ এই কান্ড ঘটে যায় তাহলে আগামী দিনে আমরা কী আশা করতে পারি? ধর্মান্ধ কেউ কেউ নারীর প্রতি নিষ্ঠুর ধর্ষনের ঘটনায় নারীর বেপর্দাকে দায়ী করেন। আমার কথা হচ্ছে যারা ধর্ষনের শিকার হয়েছেন তাদের সবাই কি বেপর্দায় চলাফেরা করেছিল? বেপর্দায় চললে পরকালে শাস্তি পাবে ঐ নারীই, আপনি নন। তাহলে আপনার এত মাথা ব্যথা কেন?
নারী বেপর্দায় চললে আল¬াহ্ পাক কি আপনাকে ধর্ষণের অনুমতি দিয়েছেন? তাছাড়া একটা শিশু পর্দার কী বোঝে? অযথা জ্ঞান দিতে আসবেন না। আপনি আপনার আখলাক ঠিক রাখেন, ঠিক আছে?
অবশ্য এখানে ও একটা কথা থেকে যায়। আইনের প্রয়োগ যেমন ঠিকমতো হচ্ছে না, তেমনি আইনের অপপ্রয়োগ ক্ষেত্র বিশেষে বেড়ে যাচ্ছে। যেমন কেউ কেউ পূর্ব শত্রুতাবশত: কোন পুরুষের বিরুদ্ধে অযথা যৌন হয়রানী কিংবা ধর্ষণের অভিযোগ আনছেন। আইনের মারপ্যাঁচে বাঁধা বলে পুলিশ গ্রেফতার করে নিয়ে আসছে। নিরাপরাধ ব্যাক্তিকে, দিনের পর দিন তাকে কারাগারে থাকতে হচ্ছে। অন্যদিকে প্রেম করে বিয়ে করেও দেখা যাচ্ছে সেখানে বিয়ে ভেঙ্গে যাচ্ছে এবং সরল প্রেমিকাটি প্রেমিককে ‘সম্মান’ দেখাতে গিয়ে কাবিনে মোটা অংকের যে মোহরানার টাকা বসিয়ে ছিলেন, তার খেসারত ও দিচ্ছেন।
কাজেই দেখা যাচ্ছে নারীরা নির্যাতিত হচ্ছে ঠিকই, পাশাপশি পুরষরাও ক্ষেত্র বিশেষে নির্যাতিত হচ্ছে।
আমি কখনোই চাইব না পুরুষ নির্যাতনের হারটা বেড়ে গিয়ে একটা সমতায় আসুক। আমি ভিন্ন প্রেক্ষাপট নিয়ে আরেকটি ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাস পড়তে চাই না, চাই না দেখতে। আমি নারী পুরুষ উভয়কে মানুষ রুপে দেখতে চাই। সবাইকে বলতে চাই, একটু ধৈর্য ধরে একে অপরকে বুঝুন, সম্মান দিন। সহিষ্ণু হোন। সহিংসতা কিংবা যৌন হয়রানী করলে বিধাতা একজন আছেন, তিনি সবই দেখছেন।
নিশ্চই আপনাকে একদিন বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। আপনার পরিবারের সদস্যরা এবং আপনার আশপাশের মানুষগুলো মিলেই সমাজ আপনি একাই একটি সমাজ নন। আজ আপনি একটি অপরাধ করে গোপনে পার পেয়ে গেলেও মনে রাখবেন যার প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করেছেন সে আপনার সমাজেরই একজন। তাছাড়া দেখা যাবে একদিন আরেকজন দ্বারা আপনার বোনটি কিংবা আদরের মেয়েটির প্রতিও অন্য কেউ এমন আচরণ করতে পারে। কাজেই এসব বাদ দিতে। নিজেকে শুধরে নিতে হবে। আসুন কবি নজরুলের ভাষায় বলি-
বিশ্বের যা কিছু মহান চির কল্যানকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।
লেখক : প্রধান শিক্ষিকা, চেওরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
ফেনী সদর, ফেনী।
Please follow and like us:

পাঠক গনন যন্ত্র

  • 4657878আজকের পাঠক সংখ্যা::
  • 6এখন আমাদের সাথে আছেন::

সর্বশেষ খবর

এ বিভাগের আরও খবর

প্রধান সম্পাদক- খোরশেদ আলম চৌধুরী, সম্পাদক- আশরাফুল ইসলাম জয়,  উপদেষ্টা সম্পাদক- নজরুল ইসলাম চৌধুরী।

প্রধান সম্পাদক কর্তৃক  প্রচারিত ও প্রকাশিত

ঢাকা অফিস : রোড # ১৩, নিকুঞ্জ - ২, খিলক্ষেত, ঢাকা-১২২৯,

সম্পাদক - ০১৫২১৩৬৯৭২৭,০১৮৮০৯২০৭১৩

Email-dailynayaalo@gmail.com নিউজ রুম।

Email-Cvnayaalo@gmail.com সিভি জমা।

 

 

সাইট উন্নয়নেঃ ICTSYLHET