সুনাগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার মেঘালয় সীমান্ত ঘেষা ট্যাকেরঘাটে শহিদ বীর বিক্রম সিরাজের সমাধি পড়ে আছে অযত্নে- অবহেলায়। স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরও অযত্ন- অবহেলায় পড়ে আছে ৭১ এর পাক হানাদারদের সঙ্গে সম্মুখ সমরে নিহত মুক্তিযুদ্ধের ৫নং সাব সেক্টর তাহিরপুরের টেকেরঘাটে শহীদ বীর বিক্রম সিরাজুল ইসলামের সমাধি। ধীরে ধীরে আগাছা আর জঙ্গলের আড়ালে মুছে যেতে বসেছে শহীদ বীর বিক্রমের শেষ চিহ্নটুকুও। অনেক ঢাকঢোল বাজিয়ে সরকারিভাবে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক সাবেরুল ইসলাম শহীদ বীর বিক্রম শহীদ সিরাজুল ইসলামের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের যেন ভুলে না যায় সেই লক্ষে ট্যাকেরঘাট চুনাপাথর খনি প্রকল্পের লেককে শহীদ বীর বিক্রম শহীদ সিরাজুল ইসলামের নামে লেকের নাম করণ করা হলেও তার সমাধিস্থলের খোঁজ রাখছেন না কেউ। সমাধিস্থলটি বন জঙ্গলে ছেয়ে গেছে সেকাল থেকে এখন পর্যন্ত। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা উপজেলার ছোট ছিলানী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন দেশ প্রেমিক সিরাজুল ইসলাম। তখন তিনি তুখোড় ছাত্রনেতা। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর দেশের টানে কিশোরগঞ্জ জেলার গুরুদয়াল কলেজ থেকে কয়েকজন শিক্ষার্থী ও নিজ গ্রাম থেকে আরো কয়েকজন যুবককে সাথে নিয়ে অংশগ্রহণ করেন মুক্তিযুদ্ধে। ট্রেনিং নিতে চলে যান ভারতের মেঘালয় রাজ্যের বালাট ক্যাম্পে। সেখান থেকে আসাম রাজ্যের ইকো ওয়ানে পাঠানো হয় গেরিলা প্রশিক্ষণ নিতে। প্রশিক্ষণ শেষে মেজর মীর শওকত আলীর অধীনে যোগ দেন যুদ্ধকালীন ৫নং সাবসেক্টর সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার মেঘালয় সীমান্তবর্তী ট্যাকেরঘাটে। দক্ষতার কারণে একটি কোম্পানির সহকারী কমান্ডার হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন তিনি। সে কোম্পানির অন্যতম পৃষ্টপোষক ছিলেন প্রয়াত নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তৎকালীন সুনামগঞ্জ মহুকুমার গুরুত্বপ‚র্ণ নদীবন্দর জামালগঞ্জ উপজেলার সাচনা বাজার দিয়েই পাক হানাদার বাহিনীর রসদ সিলেট পৌঁছানো হতো। তাই এই নদীবন্দরকে মুক্ত করতে মিত্র বাহিনীর মেজর বাট ও জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার প্রত্যক্ষ তত্বাবধানে ৩৬ জন চৌকস মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে গঠন করা হয় একটি এডভান্স পার্টি। এ পার্টির নেতৃত্ব দেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম। ১৯৭১ সালের ৮ আগস্ট এডভান্স পার্টি সূর্য্যাস্তের পরপরই শুধুমাত্র ত্রি-নট থ্রি রাইফেল আর গ্রেনেড কমান্ডার সিরাজের নেতৃত্বে ট্যাকেরঘাট সাব সেক্টর হতে ২৫ মাইল দক্ষিণে সাচনা বাজার পৌঁছে পাক হানাদার বাহিনীর সুরক্ষিত ব্যাংকারে গেরিলা আক্রমণ করেন। অতর্কিত হামলায় ব্যাংকারে অবস্থানরত পাক বাহিনীদের মৃত্যু হয় এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থা সম্পুর্ণ ধ্বংস হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে কমান্ডার সিরাজুল ইসলাম আনন্দে লাফিয়ে উঠে জয় বাংলা শ্লোগান দিতে থাকেন। এমন সময় পাক বাহিনীর একটি বুলেট এসে তার চোখে বিদ্ধ হলে সঙ্গে সঙ্গে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। কিছুক্ষণ পর তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর শহীদ সিরাজুল ইসলামের মৃতদেহ টাকেরঘাট সাবসেক্টরে নিয়ে আসা হয় এবং পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় ট্যাকেরঘাট সাব সেক্টরে সমাহিত করা হয়। তার অসমান্য অবদানের জন্য শহীদ সিরাজুল ইসলামকে সরকার বীর বিক্রম উপাধিতে ভ‚ষিত করেন। ট্যাকেরঘাট সাব সেক্টরে শহীদ সিরাজের সহযোদ্ধা সাবেক উপজেলা মুক্তিযুদ্ধা কমান্ডার রৌজ আলী আক্ষেপ নিয়ে বলেন, ১৬ ডিসেম্বর ও বিজয় দিবস এলেই শহিদ সিরাজের কথা অনেকের মনে পড়ে। কিন্তু আরও বীর মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধকালীন শহীদ হয়ে আশপাশে সমাহিত হয়ে আছেন তাদের শেষ সৃতিচিহ্নটুকু কেউ সংরক্ষণ করছেন না।









