১৫ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, শনিবার, ১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২রা শাওয়াল, ১৪৪২ হিজরি

শিরোনামঃ-
  • হোম
  • সকল সংবাদ
  • স্মৃতিচারণ কবিরাজ হোসেন মোল্লা ছিলেন সদা হাস্যজ্জল মানবতার মানুষ

স্মৃতিচারণ কবিরাজ হোসেন মোল্লা ছিলেন সদা হাস্যজ্জল মানবতার মানুষ

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, নয়া আলো।

আপডেট টাইম : এপ্রিল ২২ ২০২১, ১৯:১৩ | 636 বার পঠিত

কবিরাজ হোসেন মোল্লার নাম শুধু বৃহত্তর বরিশালেই নয়, সারাদেশের মানুষের কাছে জনপ্রিয়। তবে বরিশালবাসীর হৃদয়ের ভালবাসার অন্যতম একটি নাম কবিরাজ হোসেন মোল্লা। গত ১৪ এপ্রিল ২০২১ তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। লেখার শুরুতেই তার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। কবিরাজ হোসেন মোল্লাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গেলে অনেক কথাই লিখতে হয়। তবে সংক্ষেপেই তাকে নিয়ে আমি পাঠকের কাছে কিছু স্মৃতিচারণমূলক কথা তুলে ধরবো।
কবিরাজ হোসেন মোল্লার নাম শুনেন নাই এমন মানুষ বৃহত্তর বরিশালে খুব কমই আছে। তিনি ছিলেন নানাবিধ প্রতিভার অধিকারী। একাডেমি শিক্ষা কম থাকলেও এ মানুষটির তীক্ষè মেধা তাকে পৌঁছে দিছে সম্মানের উচ্চ শিখড়ে। কবিরাজ হোসেন মোল্লার কথা আমি শুনেছি সেই ছোটবেলা থেকেই। তার নিজ হাতে তৈরী স্বাস্থ্য সামগ্রী যেমন, দাতের মাজন, মাথা ব্যাথার রিক্তা বাম, কাটাছিড়ার মহাসংকর তৈল বরিশালসহ মুলাদীর বিভিন্ন হাটবাজারে বিক্রি হতো। ঐসব সামগ্রীর লেভেলের গায়ে তার ছবি থাকার সুবাধেই তাকে দেখা। কবিরাজ হোসেন মোল্লার তৈরী প্রতিটি সামগ্রী ব্যবহার করে মানুষ উপকার পেতো। এ কারণেই তার সামগ্রী ও তার জনপ্রিয়তা দিন দিন বেড়ে আকাশচুম্বি হয়ে গেলো খুব সহজেই। কবিরাজ হোসেন মোল্লার সেবাদানকারী সামগ্রী তৈরীর কারখানা ছিল বরিশাল জেলার উজিপুর উপজেলা শিকারপুর গ্রামে। স্থানীয় প্রতিবন্ধী যেমন অন্ধ, খোড়া, লুলা ও বাক প্রতিবন্ধিদেরকে তিনি ভিক্ষার পরিবর্তে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে ইতিবাচক ভিন্ন ধরণের একটি কর্মসূচি হাতে নেন। এসব লোকদেরকে তিনি খবর দিয়ে এনে নিজ খরচে খাওয়াতেন। তার পরেও তাদেরকে কবিরাজ হোসেন মোল্লার তৈরী সামগ্রীর সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য ভিন্ন ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতেন। কোন জিনিসের দাম কত সেটা শিখাতেন তিনি। সামগ্রীর বোতলের ধরণ ও সাইজ হাত দিয়ে ধরে যেন বুঝতে পারে প্রতিবন্ধীদের সেই কৌশলও তিনি শিখাতেন। তারপর কাপড়ের তৈরী সামগ্রী একটি ব্যাগে ভরে দিয়ে তাদেরকে বিভিন্ন লঞ্চঘাট, ফেরীঘাট ও বাজারে পৌঁছে দিতেন। এসব মালামালের জন্য তিনি নগদ কোন টাকা পয়সা নিতেন না। একটি পাইকারী নির্দিষ্ট দাম ধরে দিতেন। সারাদিন প্রতিবন্ধী লোকজন তার দেয়া সামগ্রী বিক্রি করে এসে হোসেন মোল্লার কাছে টাকা জমা দিতেন। হোসেন মোল্লা তার প্রাপ্য পাওনা রেখে বাকি লাভের টাকা প্রতিবন্ধীদের হাতে তুলে দিতেন। কেউ যদি বলতেন কবিরাজ আজ আমার বিক্রি কম হইছে, আমাকে কিছু টাকা বেশি দিয়েন। তখন কবিরাজ নিজের মূলধনের থেকে ঐ প্রতিবন্ধীকে বারতি টাকা দিয়ে দিতেন।
আমি নিজেও কবিরাজ হোসেন মোল্লাকে দেখেছি শিকারপুর ও দোয়ারিকা ফেরীঘাটে ঔষধ ও তার তৈরী সামগ্রী ফেরী করে বিক্রি করতে। মাওয়া ফেরীঘাট থেকে শুরু করে বরগুনা, ভোলা, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, ঝালকাঠী এমনকি খুলনা বিভাগের সবকটি জেলায় কবিরাজ হোসেন মোল্লার তৈরী স্বাস্থ্য সামগ্রীর কদর সমানতালে সমাধৃত ছিল। এছাড়াও সারাদেশেই পল্লী চিকিৎসক ও স্থানীয় কবিরাজদের মাধ্যমে তার ঔষধ পাওয়া যেত। কবিরাজ হোসেন মোল্লা নিজেও চিকিৎসক হিসেবে ছিলেন একজন জনপ্রিয় মানুষ। তিনি কবিরাজী বিদ্যায় বিভিন্ন জটিল ও কঠিন রোগের চিকিৎসা করতেন।
তিনি কবিরাজ হোসেন মোল্লা আয়ূর্বেতিক ও ইউনানী কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য অনেক চেষ্টা করে গেছেন এবং উজিরপুর উপজেলার সানুহার বাস স্ট্যান্ডে ৫ম তলা একটি ভবন নির্মাণ করে গেছেন। সেই ভবনের ২য় তলায় তিনি রোগী দেখতেন। তার সাজানো একটি চেম্বার ছিল সেখানে। চিকিৎসা ও মানবসেবায় বিশেষ অবদানের জন্য প্রাপ্ত পদক সম্মাননা, সনদ ও প্রশংসাপত্রগুলো সুসজ্জিত করে রেখেছিল সেখানে।
আমার বাড়ী মুলাদী ও কবিরাজ হোসেন মোল্লার বাড়ী পার্শ্ববর্তী উপজেলা উজিরপুরের শিকারপুর। তার বিষয় লোকমুখে অনেক শুনেছি। কিন্তু তার তৈরী স্বাস্থ্য সামগ্রী ফেরী করার সময়েও দুই একবার তাকে দেখেছি। কিন্তু তার সাথে আমার সরাসরি কথা হয়নি। তবে তার একটি সাক্ষাৎকার নেয়ার এবং কথা বলার প্রবল ইচ্ছা আমার ছিল। কিন্তু ওই সময়ে কোন সুযোগ করে উঠতে পারিনি।
২০০৯ সাল। আমি রুর‌্যাল জার্নালিস্ট ফাউন্ডেশন (আরজেএফ)’র সাংগঠনিক কাজে সারাদেশে ঘুরে বেড়াতে শুরু করলাম। সাথে সাথে দেশবরেণ্য ব্যক্তিদেরকে ঢাকায় বড় বড় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সম্মাননা দেওয়ার কর্মসূচিও বাস্তবায়ন করতে শুরু করেছি। ঐ সময় সাংগঠনিক কাজে বরিশাল যাওয়ার পথে লঞ্চে একটি স্টিকারে কবিরাজ হোসেন মোল্লার মোবাইল নম্বর পেলাম। সামনেই ছিল বারডেম মিলনায়তনে আরজেএফ হেলথ্ অ্যাওয়ার্ড প্রদানের অনুষ্ঠান। সেই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন ঐ সময়ের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শেখ ফজলুল করিম সেলিম। বিশেষ অতিথি ছিলেন ভাষাসৈনিক ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির তৎকালীন সভাপতি প্রয়াত এম এ মান্নান এমপি ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য ডা. শরফুদ্দিন আহমেদ। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম এই অনুষ্ঠানে কবিরাজ হোসেন মোল্লাকে স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষ অবদানের জন্য একটি সম্মাননা দিব।
সাহস করে ফোন দিয়ে আমার বিস্তারিত পরিচয় দিলাম। উজিরপুরের বামরাইলে আমার নানা শশুর বাড়ী। সেই পরিচয়ও তাকে দিলাম। অনেক প্রশ্ন ও জবাবের পর সে ঢাকায় এসে সম্মাননা নিতে রাজি হলো।
অনুষ্ঠানের আগের দিনও ফোন দিয়ে তার আসার বিষয়টি নিশ্চিত হলাম। অনুষ্ঠানের দিন আমি বারডেমের সামনে যেতেই একটি ভ্যানের ওপর কবিরাজ হোসেন মোল্লাকে আবিস্কার করলাম। সাথে একজন সফরসঙ্গীও আছে। দেখতে সেই সাধারণ মানুষ, সাধারণ পোষাক। ঢাকায় এতবড় একটি অনুষ্ঠানে আসবে বলেও পোষাকে তার কোন পরিবর্তন ছিল না। অনেকদিন আগে দেখলেও বোতলের লেভেল ও স্টিকারের ছবি দেখে বুঝে নিলা উনিই কবিরাজ হোসেন মোল্লা। কাছে গিয়ে আমার পরিচয় দিয়ে বললাম আমি আপনাকে ফোন দিয়েছিলাম। আপনি এসেছেন আমি খুশি হয়েছি। তিনি কৌতুহল ভরে আমকে জিজ্ঞেস করলে আসলেই কি অনুষ্ঠান হবে? আর আমকে কি কিছু দেয়া হবে।
আমি হা সুচক জবাব দিয়ে তাকে বারডেম মিলনায়তনে নিয়ে একটি আসনে বসিয়ে দিলাম। লাল গালিচা বিছানো সুসজ্জিত হলটি বার বার চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছিলেন তিনি। সব অতিথিদের উপস্থিতিতে মনোনীত সকলের সাথে যথা সময়ে তাকেও যথাযথভাবে সম্মাননা প্রদান করা হলো। কবিরাজ যখন অতিথিদের হাত থেকে সম্মাননা গ্রহণ করেছিলেন তখন তার চোখে আনন্দ অশ্রুতে ছল ছল করছিল। যাওয়ার সময় আমার কানে কানে বললো আসলে বিশ্বাসই করছিলাম না, আজ এতবড় সম্মান আমি পাবো। আরজেএফ’র তৎকালীন মহাসচিব মুহাম্মদ রেজাউল হক টিটু তাকে যথাযথভাবেই উপস্থাপন করছিল মিলনায়তন ভর্তি দর্শকদের কাছে।
যেহেতু তার বাড়ীর এলাকায় আমার নানা শশুর বাড়ী তাদের দুই পরিবারের মধ্যে অনেক ভালো সম্পর্ক তাই পরবর্তীতে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কবিরাজ হোসেন মোল্লা আমাকে জামাই বলেই সম্ভোধন করতো। অনুষ্ঠান থেকে যাওয়ার সময় তার ওখানে যাওয়ার জন্য আমাকে বিশেষ অনুরোধ করে গেলো। তারপর প্রায় ফোনে আমার খোঁজ খবর নিতেন। যেমনটি কেউ তার আপন জামাইর খোঁজ খবর নেয়। কবিরাজ হোসেন মোল্লার আমন্ত্রনে তার ছোট মেয়ের বিয়েতেও তার বাড়ীতে আমি স্ব-পরিবারে যোগদান করেছিলাম।
একদিন ফোনে তার একটি জীবনীভিত্তিক সাক্ষাৎকার নেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে তিনি রাজি হলেন। দিনক্ষন ঠিক করে ঢাকা থেকে গিয়ে তার সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করি। সাক্ষাৎকারে মূল তথ্য ছিল কবিরাজী বিদ্যায় তার কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নাই। সেই ছোট বেলায় কাজের সন্ধানে চট্টগ্রাম গিয়ে একটি দাওয়া খানায় তিনি সহকারী হিসেবে কাজ করছিলেন। সেখান থেকেই মূল শিক্ষা। তারপর বিভিন্ন বই পত্র পড়ে সে হয়েছিল বাংলাদেশের একজন নাম করা কবিরাজ। তার চিকিৎসা সেবায় বেশিরভাগ রোগীই আরোগ্য লাভ করেছিল। দেশের বিভিন্ন আঞ্চলিক ও জাতীয় পত্রিকায় তাকে নিয়ে বিশেষ ফিউচারধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। ভয়েস অব অ্যামেরিকাও তাকে নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। কবিরাজ হোসেন মোল্লা তার সন্তানদের কবিরাজী বিদ্যায় উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে গেছেন। তার জীবনে শেষ ইচ্ছা ছিল কবিরাজ হোসেন মোল্লা ইউনানী ও আয়ূর্বেত কলেজ প্রতিষ্ঠা করা। দাপ্তরিকভাবে এগিয়েও গিয়েছিলেন অনেক দূর। আমাকেও সম্পৃক্ত করতে চেয়েছিলেন সেই কলেজ পরিচালনার সাথে। কবিরাজ হোসেন মোল্লা ছিলেন সদালাপী, হাস্য উজ্জল একজন মানবিক মানুষ। অতিথি আপ্যায়নে তিনি ছিলেন সেরা। বরিশাল আসা যাওয়ার পথে তার সাথে দেখা করতে গেলে তিনি নিজ হাতেই আপ্যায়ন করতেন নিজের মতো করে। হাজারও যশখ্যাতী লক্ষ মানুষেল ভালবাসা রেখে তিনি চলে গেছেন পরপারে। তিনি বলে গেছেন মৃত্যুর পরেও যদি মানুষের উপকার করা যায়, কবর না দিয়ে মোরে পাঠিয়ে দিও চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়। তিনি চলে গেলেও থাকবেন আমাদের হৃদয় জুড়ে। তার কর্ম ও পথ চলা আগামী প্রজন্মের জন্য হবে একটি শিক্ষনীয় অধ্যায়।
Please follow and like us:

পাঠক গনন যন্ত্র

  • 4527640আজকের পাঠক সংখ্যা::
  • 1এখন আমাদের সাথে আছেন::

সর্বশেষ খবর

এ বিভাগের আরও খবর

প্রধান সম্পাদক- খোরশেদ আলম চৌধুরী, সম্পাদক- আশরাফুল ইসলাম জয়,  উপদেষ্টা সম্পাদক- নজরুল ইসলাম চৌধুরী।

প্রধান সম্পাদক কর্তৃক  প্রচারিত ও প্রকাশিত

ঢাকা অফিস : রোড # ১৩, নিকুঞ্জ - ২, খিলক্ষেত, ঢাকা-১২২৯,

সম্পাদক - ০১৫২১৩৬৯৭২৭,০১৮৮০৯২০৭১৩

Email-dailynayaalo@gmail.com নিউজ রুম।

Email-Cvnayaalo@gmail.com সিভি জমা।

 

 

সাইট উন্নয়নেঃ ICTSYLHET