মানুষ জন্মগত ভাবেই অসহায় আর নির্ভরশীল। মানুষের ভ্রƒণ কম উন্নত এবং দুর্বল হয়ে জন্ম নেয় বলে, সৃষ্টিকূলের অন্যান্য প্রাণীর মতো মানব শিশু জন্মের সাথে সাথেই পূর্ণতা লাভ করতে পারে না। জন্ম সময়ের দুর্বলতা কাটিয়ে অপরিপক্ক ভ্রƒণ সমৃদ্ধ মানব সন্তানকে পূর্ণতা পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় অন্যের সুনিবিড় তত্ত্বাবধানে। আর এভাবেই মানব শিশুর অভিযোজন ঘটে পরিবেশের সাথে, তৈরি হয় বন্ধন, যা রূপ নেয় শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কে। জন্মের পর থেকে এই মহৎ কাজটুকু করে থাকেন বাবা-মা ও পরিবার। তাই বাবা-মা-ই শিশুর প্রথম ও বুনিয়াদি শিক্ষক এবং রোল মডেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষক হিসেবে পিতা-মাতার এ সময়ের শিক্ষা, শিশুর পরবর্তী সারা জীবনকেই প্রভাবিত করে। অন্যান্য প্রাণী অপেক্ষা বড় মস্তিষ্ক সম্পন্ন মানব শিশু সামাজিক শিক্ষার মাধ্যমে উচ্চ মাত্রার যুক্তিখণ্ডন, ভাষার ব্যবহার, সমস্যার সমাধান, সামাজিকতা এবং সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সক্ষমতা অর্জন করে। এ প্রক্রিয়া শূন্য হতে শুরু হয়ে ছয় বছর পর্যন্ত চলতে থাকে কোন কোন ক্ষেত্রে তা বৃদ্ধিও পেতে পারে।
এ পর্যায়টি শিশুর পরবর্তী সমগ্র জীবনের জন্য অতিব গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ। জন্মের সময় মানুষের মস্তিষ্ককে কম্পিউটারের ফাঁকা হার্ডডিস্কের সাথে তুলনা করা যায়। শূন্য ডিস্কের উপর যে রকম দাগ অংকিত হবে মস্তিষ্কে সে রকম দাগ-ই পড়বে। দার্শনিক জন লক – জন্মের সময় মানুষের মস্তিষ্ককে একটা খালি শ্লেটের সাথে তুলনা করেছেন। এজন্য শিশুর প্রাথমিক গাঁথুনির উপর ভিত্তি করেই নির্মিত হয় তার পরবর্তী ইমারত। শিশুরা এ সময় খুব কৌতুহলী ও অনুকরণপ্রিয় হয়ে থাকে। তারা প্রশ্ন করতে ও নতুন কিছু জানতে ভালবাসে। এ সময় বাবা-মাকে অত্যন্ত বন্ধুসুলভ ও সহযোগী মনোভাবাপন্ন হতে হয়। শিক্ষক হিসেবে বাবা-মার জানানোর আগ্রহ ও আন্তরিকতা শিশুর মনোজগতের ব্যাপ্তি সম্প্রসারিত করতে সাহায্য করে। শিশুরা এ সময় সার্বক্ষনিক বাবা-মার সান্নিধ্য চায় এবং তাঁদের সাথে খেলতে ও ঘুরতে ভালোবাসে। শিশুর রক্তের সাথে বাবা-মার রক্তের যে প্রবাহ এবং হরমোন জনিত আসক্তি হতেই এমনটি হয়। কিন্তু প্রযুক্তি আর আধুনিক জীবন আমাদেরকে মুক্তি দিয়েছে এসব কর্তব্য পালনের দায় হতে! কর্মজীবী বাবা-মার জন্য এতদবিষয়ে সময় বের করা আকাশকুসুম ভাবনা বৈকি!
শিশুর ছোটবেলায় নিজ প্রচেষ্টায় কুড়িয়ে পাওয়া একটি আমের মূল্য পরবর্তী জীবনের টন টন আমের বিনিময়েও কী পাইয়ে দেওয়া সম্ভব? শিশুর নিজের হাতে তৈরি করা ঘুড়ি উড়ানোর যে আনন্দ তার কি কোন সমমূল্য হতে পারে কখনো? অন্যদিকে বাবা-মার শাসনের সমতা আনয়নে ও রূপকথার গল্প শুনাতে দাদা-দাদী ও নানা-নানীর ভূমিকাই বা কম কিসের! যে শিশুটি একবার তার শৈশব হারিয়েছে সে কি আর কোন দিন তা পুনরুদ্ধার করতে পারবে কোন কিছুর বিনিময়ে? তাই বাবা-মা হিসেবে শিক্ষকের এ পর্যায়ের ভূমিকা খুুবই গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল, বিষয়টি অনুধান করতে হবে। আর এভাবেই শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সঠিক অনুশীলনের মাধ্যমে রচিত হতে পারে সুলতান-উল আরেফিন বায়েজিদ বোন্তামীকে নিয়ে লেখা কালিদাস রায়ের ’মাতৃভক্তি’ এবং পিতৃস্নেহের কাছে হইয়াছে মরণের পরাজয়, গোলাম মোস্তফা রচিত- ’জীবন বিনিময়’ কবিতার মতো কবিতাগুলো।
এ সময় শিশুরা অতি সহজেই প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা, জীবের প্রতি দয়া, সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ^াস, বড়দের সম্মান, ছোটদের ভালোবাসা, কাজের প্রতি আগ্রহ, আনুগত্য ও সত্য বলার মতো সু-অভ্যাসগুলো আয়ত্ব করতে শিখে। তাই বাবা-মাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হয় শিশুদেরকে। শৈশবকালে বাবা-মার সামান্যতম অনাদর ও অবহেলায় শিশুরা হারিয়ে ফেলতে পারে তাদের বেড়ে ওঠার ছান্দিক স্বকীয়তা। অনেক ব্যস্ততার মাঝেও শিশুর জন্য সময় থাকতে হবে, এটা তাদের প্রতি ভালোবাসা নয়, অধিকার। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য যেমন পুঁজি প্রয়োজন; তেমনি জীবনের পুঁজি হলো আজকের শিশু। তাই শিক্ষক হিসেবে রাস্ট্রের এই পুঁজিটির যথাযথ নিরাপত্তা ও পরিচর্যা সুনিশ্চিত করণের মাধ্যমে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য।
লেখক:
মুহাম্মদ আব্দুল মুমীত
গবেষক ও কলামিস্ট