সরাইল (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)প্রতিনিধি: ফেসবুকের সহায়তায় গত প্রায় দুই বছরে ২৩ জন অসহায় নারী ও প্রতিবন্ধীকে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করেছেন এম মনসুর আলী। তিনি সরাইল ও নাসিরনগর উপজেলার হাওরাঞ্চল ও চরাঞ্চলের অসহায় নারী-পুরুষ, প্রতিবন্ধী ও গরীব ছাত্রীদের খোঁজে বের করে সেলাই মেশিন দিয়ে তাদেরকে স্বাবলম্বী করছেন।
এভাবে তিনি ২৩ মাসে ২৩ জন অসহায় নারী-পুরুষ, প্রতিবন্ধী ও গরীব ছাত্রীকে
কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন। এই ২৩
জন অসহায় নারী-পুরুষ, প্রতিবন্ধী ও গরীব ছাত্রী এখন বাড়িতে বসেই সেলাইয়ের কাজ করে সংসারের ব্যয় ভার বহন করছেন। প্রতি মাসে ৬ হাজার টাকা থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত উপার্জন করছেন। তারা সবাই এখন স্বাবলম্বী। অথৈর্নতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ায় পরিবারে তাদের গুরুত্ব বেড়েছে। তারা এখন সুন্দরভাবে জীবনযাপন করছে।
এম মনসুর আলীর লক্ষ্য তার এলাকার সুবিধাবঞ্চিত অসহায় নারী-পুরুষ ও প্রতিবন্ধীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তোলা। এ লক্ষে তিনি ২০১৭ সালের আগষ্ট মাস থেকে সরাইল ও নাসিরনগর উপজেলার হাওরাঞ্চল ও চরাঞ্চলে ঘুরে ঘুরে অসহায় নারী-পুরুষ ও প্রতিবন্ধীদের খোঁজে বের করে ফেসবুকের সহায়তায় সেলাই মেশিনের ব্যবস্থা করে এই অসহায়দের স্বাবলম্বী করে তুলেছেন। শুধু তাই নয় তিনি অনেককে ধান মাড়াইয়ের মেশিন,ছাগল,নতুন ঘর,টিউবওয়েল, স্যানিটারী টয়লেট এবং বেশ কয়েকজন জেলেকে নৌকাসহ মাছ ধরার জালের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তাছাড়া ২০ জন প্রতিবন্ধীকে ২০ টি হুইলচেয়ার, মুক্তিযোদ্ধা মন্তাজ আলীকে দুইবার অপারেশন,অনেক অসহায় মেধাবী ছাত্র/ছাত্রীর ভর্তি ফি ও বেতনের টাকা প্রদান, ২জন অসহায় নারীকে সিজারিয়ান অপারেশনসহ অর্ধশত রোগীর চিকিৎসা ও নিয়মিত ঔষধ কিনে দিচ্ছেন।
এ ব্যাপারে মানবতার ফেরিওয়ালা খ্যাত এম মনসুর আলী বলেন,অসহায় নারী-পুরুষ ও প্রতিবন্ধীরা রোজগার করতে পারে না বলে পরিবারে ও সমাজে তারা সারা জীবন অবহেলিত ও তাচ্ছিল্যের পাত্র। পরিবারে তাদের কোনো গুরুত্ব নাই। অন্যের উপর নির্ভরশীল। এক টাকার দরকার লাগলেও পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে চেয়ে নিতে হয়। মোট কথা নিজের পছন্দ অনুযায়ী কিছু করতে পারে না। অসহায় নারী ও প্রতিবন্ধীদের এই কষ্ট আমাকে পীড়া দেই। তাই তাদেরকে স্বাবলম্বী করার চেষ্টা করছি। পাশাপাশি অসহায় বিধবা নারীদেরকেও স্বাবলম্বী করার চেষ্টা করছি। আমার ইচ্ছা আছে প্রতিবন্ধী,গরীব ছাত্রী, বিধবা ও অসহায় নারী-পুরুষ মিলে মোট ১০০০ জনকে স্বাবলম্বী করে সারা জীবন তাদেরকে দেখা-শুনা করবো এবং দুঃখের দিনে পাশে থাকবো।আমি ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন নারীকে ভিক্ষাবৃত্তি ও পতিতাবৃত্তি থেকে ফিরিয়ে এনে স্বাবলম্বী করেছি।অবহেলিত নারীদের জন্য কিছু করতে পেরে আমি তৃপ্ত।
কাজটা কিভাবে করেন জানতে চাইলে এম মনসুর আলী বলেন, নিজে গ্রামে গ্রামে গিয়ে ঘুরে, অনেক সময় ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে কিংবা পরিচিত জনদের সাহায্যে প্রতিবন্ধী, বিধবা ও অসহায় নারী খোঁজে বের করি। যারা কাজ জানে না তাদেরকে আমার প্রতিষ্ঠান “মাগনা সেলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ” থেকে সেলাই কাজ শেখাই। তারপর ফেসবুকে এই প্রতিবন্ধী,বিধবা ও অসহায় নারীদের কষ্টের বিবরণ লিখে সেলাই মেশিনের আবেদন করি। এগিয়ে আসেন দরদী ও মানবতাবাদীরা। এভাবে এ পর্যন্ত ২৩টি সেলাই মেশিন সংগ্রহ করে ২৩ জনকে স্বাবলম্বী করেছি। এরা সবাই এখন সুখী।
অরুয়াইল আব্দুস সাত্তার ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মুখলেছুর রহমান বলেন, এম মনসুর আলীর উদ্যোগের কারণে আমার কলেজের বেশ কয়েকজন অসহায় ছাত্রী এখন স্বাবলম্বী। তারা এখন সেলাই কাজ করে পড়াশুনার খরচ চালাতে পারে।বাবা- মার কাছে এখন আর খরচ চাইতে হয় না। তারা স্বাবলম্বী না হলে হয়তো এতো দিনে তাদের পড়াশুনা বন্ধ হয়ে যেতো।
২ সন্তানের জননী রাবেয়া (২৮) বেগম (৪৮) জানান, আমার স্বামীর চোখের সমস্যা। রোজগার করতে পারে না। আমার শ্বশুরের কোন জমি জমা ছিলো নাই।ফলে সংসারে অভাব-অনটন লেগেই থাকত। ঠিকমত খেতে-পড়তেও পারতাম না। মনসুর ভাই আমাদেরকে সেলাই কাজ শিখিয়ে সেলাই মেশিন দিয়েছেন। বর্তমানে সেলাই কাজ করে স্বামী-সন্তান নিয়ে খুব ভাল আছি।
আব্দুস সাত্তার ডিগ্রি কলেজের গরীব ছাত্রী রাবেয়া বলেন, আমার বাবার সারা বছরই অসুখ লেগে থাকে। ছোট একটা ভাই একলা রোজগার করে।অভাবের কারণে লেখা পড়া ছেড়েই দিয়েছিলাম।এই কথা শুনে মনসুর কাকা সেলাই কাজ শিখিয়ে সেলাই মেশিন দিয়েছে। এখন টেইলারিং কাজ করে লেখা পড়ার খরচ চালাতে পারি। বাবা মার কাছে এখন আর লেখা পড়ার খরচ চাইতে হয় না। তাছাড়া কলেজের বেতন মওকুফের ব্যবস্থা ও তিনি করেছেন।
রাজাপুরের বিধবা রীণা খাতুন বলেন,স্বামী মারা যারার পর বাপের বাড়িতে চলে আসি।ভাইয়েরা যার যার সংসার নিয়ে আলাদা হয়ে গেছে। তাই বাপের বাড়িতে এসেই বৃদ্ধা মায়ের বোঝা হয়ে যায়। এখন মনসুর ভাইয়ের সহযোগিতায় টেইলারিং দোকান দিয়ে বৃদ্ধা মাকে ও মেয়েকে নিয়ে খুব সুখে আছি।
মানবপ্রেমীক খ্যাত এম মনসুর আলীর বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল উপজেলার পাকশিমুল ইউনিয়নের বরইচারা গ্রামে। পেশায় তিনি একজন দন্ত চিকিৎসক।