, || - ||

“বর্ণবাদ মানবজাতির অভিশাপ, তাই ঘৃণা করো বর্ণবাদ” : আদিল মাহমুদ

প্রকাশিত হয়েছে-
প্রকাশ করেছেন- নয়া আলো অনলাইন ডেস্ক।

“বর্ণবাদ মানবজাতির অভিশাপ, তাই ঘৃণা করো বর্ণবাদ”

 

বর্ণবাদ বা আপার্টহাইট, আফ্রিকান ভাষায় এর অর্থ দাঁড়ায় বিচ্ছিন্নতা বা বিভাজন। এটি দক্ষিণ আফ্রিকা ও দক্ষিণ পশ্চিম আফ্রিকাতে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত চলা জাতিগত বিভাজনের একটি ব্যবস্থা। তৎকালীন শ্বেতাঙ্গ শাসিত সরকার আইন করে দক্ষিণ আফ্রিকার অধিবাসীদের কৃষ্ণাঙ্গ, শ্বেতাঙ্গ, দক্ষিণ এশিয়, বর্ণসংকর ইত্যাদিতে ভাগ করেন।

 

১৯৩০ সালে প্রথম র্বণবাদ শব্দের উৎপত্তি হয়। চল্লিশের দশকের শুরু থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় পার্টি রাজনৈতিক স্লোগানে এর ব্যবহার শুরু করে। ১৬৫২ সাল থেকে আফ্রিকাতে শ্বেতাঙ্গ মানুষের বসতি স্থাপন শুরু হয়। ঐ সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী দক্ষিণ আফ্রিকায় কেপ কলোনী স্থাপন করে এবং ১৭৯৫ সালে ব্রিটিশরা কেপ কলোনি দখল করে নেয়।

 

১৮৬৭ সালে আফ্রিকার বিভিন্ন খনিতে হীরে ও ১৮৮৪ সালে স্বর্ণ পাওয়া যায়। একে কেন্দ্র করেই বহিরাগত উপস্থিতি বাড়তে থাকে। এক সময় দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ আদিবাসী, বৃটিশ শাসক শ্রেণী ও ডাচ- বুয়রদের মধ্যে ত্রিমুখি লড়াই শুরু হয়। এভাবে রাজনৈতিক দল গঠিত হতে থাকে। যেমন শ্বেতাঙ্গদের ন্যাশনাল পার্টি, আর কালোদের আফ্রিকান ন্যাশনাল পার্টি। তবে, ১৯৪৮ এর নির্বাচনে সাদারা জয়ী হওয়ার ফলে শ্বেতাঙ্গরা অশ্বেতাঙ্গদের নিয়ন্ত্রন করতে থাকে। এর মাধ্যমেই যে নীতি তৈরি হয় তাই আপার্টহাইট বা বর্ণ বৈষম্য নীতি। সমগ্র দক্ষিণ আফ্রিকাকে চার ভাগে বিভক্ত করা হয়। যথা- ১) সাদা, ২) কালো, ৩) বর্ণময় বা কালারড ও ৪। ইন্ডিয়ান। ঐ সময় শ্বেতাঙ্গ সরকার পাসপত্র নামে একটি আইন জারী করে, যাতে কৃষ্ণাঙ্গদের সার্বাক্ষনিক তাদের পরিচয়পত্র ও নথি সঙ্গে বহন করতে হয়।

 

বর্ণবাদ সর্ম্পকে বিস্তারিত জানতে আমাদেরকে আগে জানতে হবে বর্নবাদ কি ও এর ধরন কোন প্রকৃতির। কোন জনগোষ্ঠীর উপর গাত্র বর্ণের কারনে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভাবে বৈষম্য মূলক আচরনের নীতিকেই বর্ণবাদ বলে। বর্তমানে, কেমলমাত্র গাত্রবর্নের মধ্যেই বর্ণবাদ সীমাবদ্ধ নয়। এটা জাতি, শ্রেনী, দেশ ও ধর্ম বিশ্বাসের উপরও অনেকাংশে নির্ভর করে। কোন ধর্মেই বর্ণবাদের স্থান নেই। তবে ইসলাম ধর্মে এর কোন অস্তিত্বই রাখেনি। বর্ণবাদ সমাজ শোষনের একটি ভয়ংকর হাতিয়ার। ইসলাম কখনোই বর্ণবাদকে বিন্দুমাত্র প্রশ্রয় দেয়নি। তাইতো হাবশার হযরত বিলালকে (রা:) ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিনরূপে স্বীকৃতি দেয়া হয়। পবিত্র কোরআনের অসংখ্য আয়াত ও হাদিসে বর্ণবাদিতাকে নিষিদ্ধ করেছেন।

 

হযরত মোহাম্মদ (সঃ) বিদায় হজের ভাষনে স্পষ্টই বলেছেন, “ধর্ম বিশ্বাস, গাত্রবর্ণ, শক্তি ও বংশের অহংকার বশত কেহ যেন নিজেকে শ্রেষ্ঠ বলে দাবি না করে।

 

মানব জাতি খবুই সর্তকতার সাথে লক্ষ্য করছে যে, বৈষম্য ও বর্ণবাদ দূরীকরনের ব্যাপারে জোর প্রচেষ্টা চালানো সত্ত্বেও বিশ্ব থেকে এখনো বর্ণবাদের অবসান হয়নি। সৃষ্টিকর্তা পুরো মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন এবং ওনার ইচ্ছেমতো বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ ও গোত্রে বিভক্ত করেছেন। তার অর্থ এই নয়, তিনি কাহাকে কম ও কাহাকে বেশী ভালবাসেন। সকলেই স্রষ্টার সৃষ্টি ও সকলের মান মর্যাদা সমান। তাই, মানবকুলের কোন সাধ্য থাকা উচিত নয়, বর্ণবাদকে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা!

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শত শত বছর ধরে বর্ণবাদের ধরন পরিলক্ষিত হচ্ছে। কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর পর শ্বেতাঙ্গ কৃষ্ণাঙ্গ দ্বন্ধ চরম আকার ধারণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার তের শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ, যা সংখ্যালঘুদের পর্যায়ে পড়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণ বৈষম্য থাকলেও তাকে চরম বর্ণ বৈষম্যতা বলা আমার মতে সঠিক হবে না। কারণ, সাতাশি শতাংশ শ্বেতাঙ্গের দেশে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার, দুই দুইবার সফল প্রেসিডেন্টের মর্যাদা, অনেকটাই বর্ণ বৈষম্যের উর্ধ্বে। এমনও তো হতে পারে শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কর্তৃক কৃষ্ণঙ্গ হত্যা নেহায়েত- ই একটি দূর্ঘটনা যা আদৌ বর্ণ বৈষম্য ছিল না!

 

প্রবাদ আছে, মানুষ মাত্রই ভুল করে। তাইতো আইন করা হয়েছে, সারা বিশ্বে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানবাধিকার সংঘটন সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও আইন প্রনেতারা সোচ্ছার রয়েছেন। তাই, যে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে তা আইনের আওতায় এনে প্রতিকারের ব্যবস্থা করাই উত্তম। এটাকে কেন্দ্র করে সারা বিশ্বে বর্ণ বৈষম্যকে আরো বেশী করে উস্কে দেয়া আমার মতে যুক্তি সঙ্গত নয়। বর্ণ বৈষম্যকে আমরা সবাই ঘৃনা করি। এমনকি আমার ধারনা মতে শ্বেতাঙ্গদের ষাট/সত্তর শাতাংশই বর্ণ বৈষম্যকে অন্তর থেকে ঘৃনা করে।

 

বর্ণবাদ নির্মূল করার জন্য বিশেজ্ঞরা সাতটি উপায় স্থির করেছেন। ১। বাকস্বাধীনতার হামলা পরিহার, ২। উদারতায় শ্রেষ্ঠত্ব, অহংকারে নয়, ৩। অসহিষ্ণুতা ও উগ্রতা বর্জন। ৪। ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ানো, ৫। রুখে দিন সাইবার দুনিয়ার বর্ণবাদ, ৬। প্রমাণ রাখুন, কর্তৃপক্ষকে জানান ও ৭। সংঘাত নয় সর্মথন চান। (এসিবি/কেএম)।

 

এর মধ্যে, সংঘাত নয় সমর্থনই প্রধান উপায়। যেমন, কিছু মানুষের মনই অপবিত্র। তাই তারা বিভেদ সৃষ্টি করা ও বিদ্বেষ ছড়ানোকে বেশি পছন্দ করেন। তারা বর্ণ, ধর্ম, জাতপাত, সংখ্যা, ভাষা ও সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে বর্ণবাদ ছড়ায়। তাই প্রথমে তাদের কেই রুখতে হবে। প্রতিহত করতে হবে তাদের সব পরিকল্পনা।

 

যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের শার্লটসভিলের সহিংসতার ঘটনা সারা বিশ্ব জানে। জাতিসংঘ এই বিষয়ে কড়া সমালোচনা করেছিলেন। জাতিসংঘের বর্ণবৈষম্য দূরীকরণ বিষয়ক কমিটি “সার্ড” যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি নিয়ে অগ্রিম সতর্কতাও দিয়েছিল। প্রায় দেড়শত বছর পূর্বে মার্কিন গৃহযুদ্ধে দাস প্রথার সমর্থক জেনালের রবার্টলির একটি মূর্তি সরানোর সংকল্পের প্রতিবাদে শার্লটসভিলে বর্ণ বিদ্ধেষী গ্রুপগুলো সমাবেশের ডাক দেয়। এরই প্রতিবাদে স্থানীয় গীর্জা ও মানবাধিকার সংগঠন গুলো পাল্টা বিক্ষোভের আয়োজন করে। সংঘর্ষ মোকাবেলায় জরুরী অবস্থা জারীর পরও ত্রিশ জনের মতো আহত হয়। এক নয়া নাৎসি পন্থী দ্রুতগতিতে গাড়ি চালিয়ে বিক্ষোভ কারীদের উপর চড়াও হলে হিথার হেয়ার নামের বত্রিশ বছর বয়সী এক মানবাধিকার কর্মী প্রাণ হারায়। যুক্তরাষ্ট্রে জাতিগত বা ধর্মীয় বিশৃংখলার আশংকা প্রকাশ করে “সার্ড” বিবৃতি দিয়েছিল। আবার এর পূর্বেও ইরাক, আইভরিকোষ্ট, কিরগিজস্তানও নাইজেরিয়ার ক্ষেত্রেও সর্তকর্তা জনিত উপদেশ দেওয়া হয়েছিল। “সার্ড” এর চেয়ারম্যান আনাস্তাঘিয়া ক্রিকলি বলেছিলেন, “বর্ণবাদী বিক্ষোভ বিশেষ করে শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তা বাদী ও নয়া নাৎসী পন্থীদের বর্ণবাদী শ্লোগানের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা সর্তক হয়েছি”। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের প্রতি এই সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করারও আহবান জানিয়ে ছিলেন।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবাদের শুরু ষোড়শ শতকে। তখন কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকানদের দাস হিসেবে ব্যবহারের জন্য আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া শুরু হয়েছিল। তারপর, প্রায় এক কোটি বিশ লাখ কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকানদের দাস হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়েছিল। আমেরিকার ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের সাবেক অধ্যাপক রবার্ট ডেভিসের মতে, পনেরশত থেকে আঠার শতকের মধ্যে দশ লাখের বেশী মুসলমানকে ইউরোপে দাস হিসেবে ব্যবহার করা হয়। একই সময়ে উত্তর আফ্রিকা এবং তুরস্ক, মিশর ও পশ্চিম এশিয়ায় প্রায় বিশ লাখ খ্রীষ্টানকে দাস করা হয়েছিল। অধ্যাপক ডেভিস বলেছেন, এ সময়ে বিভিন্ন যুদ্ধে পরাজিতদের দাস করা হতো। আবার অষ্টম শতকে উত্তর আফ্রিকার মুররা, স্পেন ও পর্তুগালের একটি অংশ দখল করার পর শ্বেতাঙ্গ খ্রীষ্টানদেরকে দাস হিসাবে ব্যবহার করা শুরু করে। পনের শতকে ইউরোপ থেকে বিতাড়িত হওয়ার আগ পর্যন্ত তখনকার রীতি নীতি চালু ছিল।

 

এদিকে খোদ আমেরিকার জনগনও বর্ণবাদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এমনকি কিছু আমেরিকান উচ্চ পদস্থ সেনা কর্মকর্তাও বর্ণবাদের বিরুদ্ধে জোড়ালো অবস্থান নিয়েছেন। জেনারেল রবার্ট আব্রামস, বর্ণবাদ ইস্যুতে কৃষ্ণাঙ্গ সেনা সদস্যদের সঙ্গেও উন্মুক্ত আলোচনা করেছেন। সবাই বর্ণবাদের বিরুদ্ধে নতুন করে চিন্তা করতে শুরু করেছেন। তাছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে ট্রাম্পও পুলিশ বিভাগে সংস্কার সংক্রান্তে এক নির্বাহী আদেশে গত মঙ্গলবার অর্থাৎ ১৬/০৬/২০২০ তাং সই করেছেন। অতএব দেখা যায় যে, প্রেসিডেন্ট জে, ডোনাল্ড ট্রাম্প, বারাক ওবামা সহ সবাই এই ঘৃনিত বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার।

 

অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় একটি ফাস্ট ফুড রেস্তরাঁর পার্কিং লটে কৃষ্ণাঙ্গ রেইশার্ড ব্রুকসকে গুলি করে মারার ঘটনায় পুলিশের সাবেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের মাধ্যমে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। ২৫ মে আফ্রিকান-আমেরিকান জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর দুই সপ্তাহ পর ১২ জুন পুলিশের গুলিতে ব্রুকসের মৃত্যু হয়।

 

সার্বিক ভাবে দেখা যায় যে, একটি অংশের মানুষ সব সময়ই নিপীড়নের স্বীকার হয়েছিল। ভালভাবে চিন্তা করলে বুঝা যায় “বর্ণ” দিয়েই মানুষ থেকে মানুষকে আলাদা করে রাখা হয়েছে। তবে, এই বর্ণবাদ ঠেকাতে আইনকে নিজেদের হাতে তোলে নেয়া মোটেই যুক্তি সঙ্গত নয়। শান্তি বজায় রেখেই তবে এর প্রতিবাদ করতে হবে।

 

পরিশেষে বলতে চাই, এই পৃথিবীতে মানুষ বলতে আমরা যারা আছি তারা সবাই সৃষ্টিকর্তারই সৃষ্টি। কেউ আলাদা কোন জায়গা বা স্থান থেকে আসেনি। তাই, সবার অধিকার ও মর্যাদা সমান। আমাদেরকে মানতে হবে সবার আগে মানুষ। তার পর ধর্ম ও বর্ণ। ধর্ম ও বর্ণের জন্য আমরা মারামারি হানাহানী করবো তা কোন ভাবেই সভ্যতার কাতারে আসে না। আমরা সভ্য জাতি বলে পরিচিত, অথচ আমরা সভ্যতার কোন আচরন উপস্থাপন করব না তাতো হতে পারে না! শ্রদ্বেয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন, দাস প্রথার বিলুপ্ত সাধন করেছেন ঠিকই তবে এখনো কোন বর্ণবাদের বিলুপ্তি হচ্ছে না। বর্ণবাদ নামে যে শব্দটি এখনো প্রচলিত আছে আমরা সবাই তার পরিসমাপ্তি চাই। তাই, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে একবাক্যে বলতে চাই, আমরা সেরা সৃষ্টি, বর্ণবাদ চিরতরে নিপাত যাক।

Please follow and like us: