আজ ভারতের মোদি সরকারের পাঠ্যপুস্তকে বৃটিশ বিরোধী সংগ্রামে মুসলমানদের কোনো অবদানের কথা লেখা নেই। ফলে তরুণ প্রজন্ম দাবী করছে মুসলমানরা ভারতে থাকার অধিকার নেই। কারণ তারা দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ভূমিকা রাখেনি। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের নামের তালিকা আছে দিল্লির ইন্ডিয়া গেইটে। তাতে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে মোট শহীদের সংখ্যা দেওয়া আছে ৯২৩৫৩ জন। এর মধ্যে ৬২৯৪৫ জনই হচ্ছে ভারতীয় মুসলিম। যার শতকরা নির্ণয় করলে হবে ৬৫ ভাগ। অথচ আজ স্বাধীনতার ৭০ বছর পর বলা হচ্ছে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে মুসলিমদের অবদান নেই। পাঠ্যপুস্তকে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন সংগ্রামের ভুল ইতিহাস পড়ানো হচ্ছে।
বৃটিশরা ভারতবর্ষে এসেছিল ব্যবসা করবে এই বাহানায়। ধীরে ধীরে তারা ভারতের শাসন ক্ষমতা দখল করে নিলো। ১৭৫৭ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত টানা ১৯০ বছর ( বলার সুবিধার জন্য কাছাকাছি হওয়ায় ২০০ বছর বলে) ক্ষমতা দখল করে বসে ছিলো। একের পর এক তাদের অত্যাচার অবিচার চলতে লাগলো। অসংখ্য অত্যাচারের কাহিনী ইতিহাস হয়ে আছে। বৃটিশ তাড়ানোর জন্য জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলে ঐক্যবদ্ধ হলো। ক্রমান্নয়ে হিন্দু মুসলিম শিখ জৈন এক হয়ে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়লো। কিন্তু প্রথম যারা নেতৃত্ব দিয়েছিলো তারা ছিলেন মুসলিম। ইংরেজদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে ‘ফকির বিদ্রোহ’ ‘ত্রিপুরার শমশের গাজীর বিদ্রোহ’, ‘সিরাজগঞ্জের বিদ্রোহ’, ওহাবী আন্দোলন’, ‘ফারায়েজী আন্দোলন’, সন্দ্বীপের বিদ্রোহ’, ‘১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লব’ ও ‘নীল বিদ্রোহ’ সংগঠিত হয়। সবচেয়ে আলোচিত এবং সবার কাছে জানা নীল চাষীদের প্রতি অত্যাচারের গল্প সংক্ষেপে তুলে ধরছি।
ভারত উপমহাদেশের মাটি ছিলো নীল চাষের জন্য খুব উপযোগী। বৃটিশ নীলকররা নীল চাষের জন্য বড় ধরণের পুঁজি বিনিয়োগ করে। বৃটিশ নীলকরেররা এখানে কৃষকদেরকে নীল চাষে বাধ্য করে। নীল চাষে কৃষকদের বিরাট ক্ষতি হতো। কৃষকরা নীল চাষ করতে না চাইলে বিভিন্নভাবে কৃষকদের ওপর নির্যাতন চালানো হতো। বাড়িঘর আগুনে জ্বালিয়ে দেয়া হতো। কৃষকদের মেরে গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হতো। অত্যাচারের ভয়ে যেসব কৃষক বাড়িঘর ছেড়ে পালাতেন তাদের বাড়িতে নীল চাষ করা হতো। এসব অত্যাচার চলে ৫০ বছর ধরে। কৃষকরা আন্দোলন গড়ে তোলে। একসময় ১৮৬০ সালে বৃটিশরা নীল চাষের উপর আইন পাশ করতে বাধ্য হয়। আর এই নীল চাষ বিদ্রোহের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন চাঁদপুরের হাজী মোল্লা। তিনি ঘোষণা দেন, “নীল চাষের চাইতে ভিক্ষা করা উত্তম”। ইংরেজরা ক্ষমতায় আসার ১০০ বছর পর ইংরেজদের বিরুদ্ধে ১৮৫৭ সালে সংগঠিত হয় মহাবিদ্রোহ তথা সিপাহী বিপ্লব। তখন হাজার হাজার কৃষকদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে আন্দোলনে সাহস জুগিয়েছিলেন উত্তর প্রদেশের মিরাট জেলার মুসলিম জমিদার শাহ মাল। বৃটিশ সৈনিকদের সাথে যুদ্ধে তিনি প্রাণ হারান।
বর্তমান উত্তর প্রদেশের রায়বেলির সৈয়দ আহমদের নেতৃত্বে মুজাহিদ বাহিনী ১৮২৬ সাল থেকে অর্ধশতাব্দি কাল ধরে বৃটিশের বিরুদ্ধে জিহাদ চালিয়ে ছিলেন। যা ছিলো ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা। প্রথম সারীতে ছিলেন শাহ ওয়ালী উল্লাহ। হিন্দু লেখক সত্যেন সেন কর্তৃক লিখিত “ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের ভূমিকা” বইতে দেওবন্দ মাদ্রাসা সম্পর্কে বলেন, “ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে দেওবন্দ শিক্ষা কেন্দ্র যে দেশপ্রেমিক ভুমিকা গ্রহণ করে এসেছে, সেজন্য হিন্দু – মুসলমান নির্বিশেষে সকলের কাছেই তা স্মরণীয় থাকা উচিত ছিল।”
ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসে যাদের নাম পড়ানো হয় তারা হলেন- নেতাজি সুভাষ বসু, মাহাত্মা গান্ধী, অরবিন্দ, জওহরলাল, মোতিলাল, ক্ষুদিরাম বসু, প্রীতিলতা, মাস্টার দা সূর্য সেন। তরুনদের কাছে কোনও মুসলিম সংগ্রামীর নাম, শহীদের নাম জানা নেই। তাদেরকে পড়ানো হয় না মুসলিম সংগ্রামীদের জীবনী। ফলে আজ ইতিহাসের পাতা থেকে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, মাওলানা আতা উল্লাহ বোখারী, হোসাইন আহমেদ মাদানী, মাওলানা মাহমুদুল হাসান দেওবন্দি, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, মাওলানা গোলাম হোসেন, সৈয়দ আহমেদ শহীদ বেরলভী, হাজী শরীয়ত উল্লাহ, মীর নিশার আলী তিতুমীর, হাকিম আজমল খাঁ, মাওলানা মোহাম্মদ আলী, মাওলানা শওকত আলী, খাজা আবদুল মজিদ, ব্যারিস্টার সাইফুদ্দিন কিচলু, মাওলানা রসিদ আহমদ গাঙ্গুলী, কুদরত উল্লাহ খান, মাওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধী, টিপু সুলতান, আবদুল গাফ্ফার খান,আহম্মদুল্লাহ, কবি কাজী নজরুল ইসলাম প্রমূখ সর্বজন পরিচিত ব্যক্তির নাম মুছে গেছে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এদের এক একজনের ভূমিকা এতো বিশাল যে তাদের অবদান না থাকলে ভারত কোনো দিন স্বাধীনতার মুখ দেখতো না। অথচ এরাই আজ ইতিহাসের পাতা থেকে হারিয়ে গেছেন। নতুন প্রজন্ম এদের নামও জানে না। অন্য সাধারণ অখ্যাত আন্দোলনকারীদের নাম থাকবে তো চিন্তাও করা যায় না।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস পড়লে আমরা একমাত্র নারী প্রিতিলতার সাহসী ভূমিকার কথাই পড়ি এবং জানি। কিন্তু ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে প্রথম নারী অর্থাৎ বেগম হজরত মহল এর নাম কেউ কখনও পড়িনি এমনকি শুনিওনি। তিনি ১৮৫৭ সালে চিনহাটের যুদ্ধে বৃটিশ শাসক স্যার হেনরি লরেন্সকে গুলি করেন। তিনি মুসলিম নারী হওয়ার কারণে ইতিহাসে স্থান পাননি। কিংসফোর্ডকে বোমা মেরে মারতে গিয়ে ভুল বশতঃ অন্য দুইজন নিরাপরাধ নারীকে মারার অপরাধে ক্ষুদিরামের ফাঁসি হয়, এটা সবাই জানে। অথচ বড় লাট লর্ড মেয়োকে হত্যা করায় মুসলিম বিপ্লবী শের আলীকে যে ফাঁসি দেওয়া হয় সেটা কেউ জানে না বা আলোচনা হয় না। এমনকি বৃটিশদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে প্রথম যাকে ফাঁসি দেওয়া হয় তিনি একজন মুসলিম তার নাম আশফাকুল খান।
ক্ষুদিরাম জন্মের পর বাবা মা তার আপন বড় বোনের কাছে তিন মুঠো ক্ষুদের বিনিময়ে বিক্রি করে দেন। কারণ এরআগে ক্ষুদিরামের আরো দুই ভাই মারা যায়। তাই তাকে বাঁচাতে এই নিয়ম মানতে হয়েছিল। ক্ষুদিরামকে তার সেই মায়ের পেটের বড় বোন বাড়ি থেকে একসময় তাড়িয়ে দেন। জেলখানায় একদিনের জন্যও তার আপন বোন ভগ্নিপতি দেখা করতে যায়নি। এমনকি ফাঁসির দিনও না। সবচেয়ে মজার কথা এই যে, ক্ষুদিরাম বসু ছোট বেলায় একজন মুসলিম মহিলার আশ্রয়ে ছিলেন। যাকে ক্ষুদিরাম দিদি বলে ডাকতেন। তাঁর এই রক্ত সম্পর্কহীন মুসলিম বোনটি ক্ষুদিরামকে ছোটভাই হিসেবে স্নেহ করতেন। ক্ষুদিরাম যখন কারাগারে ছিলেন তখন সেখানে তাকে দেখতে যেতেন, খাবার নিয়ে যেতেন, এমনকি মামলার খরচ পর্যন্ত দিতেন। ফাঁসির দিনও সেখানে ছিলেন। তার এই বোনটির নাম জোবেদা খাতুন। ক্ষুদিরামকে সহযোগিতা করার অপরাধে বৃটিশ সরকার তাঁকেও ফাঁসি দেয় বা মেরে ফেলে। সেই জোবেদা খাতুনের নাম ইতিহাসে নেই, তার নাম কেউ মুখে আনে না। এভাবে বর্তমান তরুণ প্রজন্মের কাছে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের অবদান মুছে দিতে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরছে না। কত বড় মিথ্যাচার চলছে ভারত জুড়ে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
লেখক ঃ কলামিস্ট ও সাংস্কৃতিক কর্মী