শুক্রবার , ৮ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ২৫শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ - গ্রীষ্মকাল || ২০শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

লিবিয়ায় অপহৃত আগৈলঝাড়ার যুবক ৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি, দুই দিনের মধ্যে টাকা না দিলে হত্যার হুমকি

প্রকাশিত হয়েছে-
প্রকাশ করেছেন- স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, নয়া আলো।
আহাদ তালুকদার- লিবিয়ায় মাফিয়া চক্রের হাতে অপহরণ ও অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার এক যুবক। অপহৃত ওই যুবকের নাম আসাদুল বক্তিয়ার (৩২)। তিনি উপজেলার চাত্রিশিরা গ্রামের আবু বক্তিয়ারের ছেলে। দুই মাস ধরে মাফিয়াদের বন্দিদশায় থাকা আসাদুলকে নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে পরিবারের কাছে ৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে সুদে ও ধারদেনা করে ৪ লাখ টাকা পরিশোধ করলেও বাকি টাকা দুই দিনের মধ্যে না দিলে তাকে হত্যা করে মরুভূমিতে লাশ ফেলে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে অপহরণকারীরা।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সংসারের স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে ২০২২ সালের ১১ অক্টোবর বৈধভাবে ভিজিট ভিসায় লিবিয়ায় যান আসাদুল। তার পাসপোর্ট নম্বর অ০৪৮০২৯৯৯। আত্মীয় এরফান সরদারের মাধ্যমে তিনি লিবিয়ার আনজারা শহরে গিয়ে একটি টেইলার্স দোকানে কাজ শুরু করেন। সেখানে কাজ করে প্রতি মাসে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা দেশে পাঠাতেন।
ভুক্তভোগী পরিবার জানায়, গত রমজানের ৯ তারিখ সেহরির পর ভোর রাতে একই এলাকার বাসা থেকে ৫-৬ জনের একটি সশস্ত্র মাফিয়া দল আসাদুলকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। পরে একটি গোপন আস্তানায় নিয়ে হাত-পা বেঁধে উল্টো করে ঝুলিয়ে মারধর করা হয়। নির্যাতনের সময় ধারালো অস্ত্র দিয়ে শরীর ক্ষতবিক্ষত করা হয় বলেও অভিযোগ পরিবারের।
অপহরণকারীরা সেই নির্যাতনের ভিডিও মোবাইল ফোনে আসাদুলের বাবা-মা, স্ত্রী ও সন্তানদের দেখিয়ে ৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। টাকা দিতে না পারায় তার ওপর আরও নির্মম নির্যাতন চালানো হয় বলে জানান স্বজনরা।
এদিকে, লিবিয়ায় অবস্থানরত আসাদুলের শ্যালক এরফান সরদার স্থানীয় দুটি থানায় অভিযোগ করলে মাফিয়া সদস্যরা তাকেও খুঁজতে শুরু করে। পরে জীবনের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তিনি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ফেলে দেশে ফিরে আসেন। গত ৩০ মার্চ তিনি তার বোন নিপা বেগমকে সঙ্গে নিয়ে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, নির্যাতনের এক ভিডিওতে আসাদুল নিজেই পরিবারের কাছে কাঁদতে কাঁদতে জীবন বাঁচানোর আকুতি জানান। পরে বাধ্য হয়ে সুদে ৩ লাখ টাকা এবং শ্বশুরবাড়ি থেকে ১ লাখ টাকা সংগ্রহ করে দুই দফায় ৪ লাখ টাকা পাঠানো হয়। রোববার ডাচ-বাংলা ব্যাংকের মাধ্যমে ২ লাখ এবং সোমবার ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে আরও ২ লাখ টাকা দেওয়া হয়। তবে টাকা পাওয়ার পরও অপহরণকারীরা জানিয়ে দেয়, বাকি টাকা দুই দিনের মধ্যে না দিলে আসাদুলকে হত্যা করা হবে।
আসাদুলের বাবা আবু বক্তিয়ার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,
“মাফিয়ারা আমার ছেলেকে ঝুলিয়ে নির্যাতন করছে। শরীর থেকে রক্ত ঝরছে। সম্পত্তি থাকলে বিক্রি করে হলেও টাকা দিতাম। একজন বাবা হয়ে ছেলের এমন অবস্থা কিভাবে সহ্য করি? সরকারের কাছে আকুতি, আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দিন। মা বকুল বেগম বলেন,
“টাকার জন্য আমার ছেলেকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করছে। একজন মা হয়ে এসব দেখে বেঁচে থাকা কঠিন। আমাদের কোনো সহায়-সম্বল নেই। দুই মাস ধরে ঘুম-খাওয়া সব হারাম হয়ে গেছে। স্ত্রী নিপা বেগম বলেন,
সংসারের স্বপ্ন নিয়ে স্বামী লিবিয়ায় গিয়েছিল। এখন ওকে বাঁচানোর জন্য চার লাখ টাকা জোগাড় করে দিয়েছি। এখনও ৩০ লাখ টাকা দাবি করছে। স্বামী ফোনে শুধু বলে আমাকে বাঁচাও।’ আমি এখন কী করব?”
আসাদুলের দুই সন্তান ৭ম শ্রেণির ছাত্র হামিম ও মাদরাসার ছাত্র শামিমবাবার ফিরে আসার অপেক্ষায় দিন গুনছে। বাবার এমন অবস্থার কথা শুনে তারা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছে।
এ বিষয়ে আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিখন বনিক বলেন,
লিবিয়ায় এক যুবক অপহরণের বিষয়টি গণমাধ্যমের মাধ্যমে জেনেছি। পরিবার লিখিত আবেদন দিলে তা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।
Please follow and like us: