মাননীয় মহাপরিচালক
ইসলামিক ফাউন্ডেশন,ঢাকা।
মুহতারাম আস্সালামুআলাইকুম।
আপনি অবশ্যই অবগত আছেন ১৪ই শাবান দিবাগত রাতকে বাংলাদেশে পবিত্র শবে বরাত হিসেবে পালন করা হয়। এই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার ১৫ই শাবান দিনটিকে সরকারী ছুটি ঘোষণা করে। কারণ এই পবিত্র রাতে এদেশের সিংহভাগ মুসলিম রাত জেগে এবাদতে ব্যস্ত থাকে। তারা যেহেতু রাত্রি জাগরণ করে সেহেতু ঘুমের সমস্যা হয়। এছাড়া অনেকে ১৫ই শাবান রোজাও রাখে। এসব কারণে ইসলামিক ফাউন্ডেশন যুগ যুগ ধরে এই রাতের মর্যাদা জনগণের বিশ্বাস এবং পবিত্রতাকে সম্মান জানিয়ে ১৫ই শাবান শবে বরাত জনিত ছুটি ঘোষণা করে। যা বাংলাদেশ সৃষ্টির পর থেকেই হয়ে আসছে।
শবে বরাত পালন এদেশের জন্য হঠাৎ কোনো ঘটনা নয়। এটা শত শত বছর যাবত এই দিবস পালিত হয়ে আসছে। এটা বাংলাদেশের নিজস্ব কোনো কালচারাল অনুষ্ঠান নয়। এটা একটা ধর্মীয় অনুষ্ঠান যা পালনের সাথে ধর্মীয় নির্দেশ জড়িত। যেহেতু এটা একটা ধর্মীয় বিশ্বাস আকিদার প্রশ্ন সেহেতু কোনো ব্যক্তির মনগড়া সিদ্ধান্তে এটা চালু হয়নি। তাই ধর্মপ্রাণ জনগণ আন্তরিক বিশ্বাস নিয়ে প্রতিবছর এই রাতে মসজিদে গিয়ে কিংবা বাড়িতে বসে সারারাত নফল নামাজ কোরআন তেলাওয়াত জিকির কবর জিয়ারত গরীব লোকজনকে খাওয়ানো ইত্যাদি আমল করে থাকে। কিন্তু ইদানিং শুরু হয়েছে এই শবে বরাত পালন নিয়ে একশ্রেণীর আলেমের আপত্তিকর বক্তব্য।
বাংলাদেশে এই পবিত্র শবে বরাত নিয়ে স্বাধীনতার পর থেকে গত ৪৫ বছরও কোনো বিতর্ক করতে আলেম সমাজকে দেখা যায়নি। কিন্তু গত কয়েকবছর বিশেষত ইউটিউব চ্যানেল জনপ্রিয় হওয়ার পর থেকে এখন এক শ্রেণীর আলেম বা হুজুর হঠাৎ বিতর্ক সৃষ্টি করছেন যে, শবে বরাত বলে কিছু নেই। এটা সম্পূর্ণ বেদায়াত। এ সম্পর্কিত যত হাদিস আছে সব জাল। অনেকে শবে বরাত বেদায়াত হওয়ার পক্ষে নিজেদের মনগড়া যুক্তি পেশ করেন। এসব হুজুরদের বক্তব্যকে বিশ্বাস করে তাদের অনুসারী অসংখ্য ভক্ত শ্রেণী ফেসবুকে তা প্রচার চালায়। কিছু কিছু বেসরকারী টিভি চ্যানেলও শবে বরাতকে বেদায়াত বলে প্রচার চালাতে দেখা যায়। এসব বক্তব্য বিবৃতি ওয়াজ আজ মুসলিম সমাজকে দুইভাগে ভাগ করে ফেলছে। ফলে দেখা দিয়েছে সামাজিকভাবে ভাইয়ে ভাইয়ে ঝগড়া বিবাদ অশান্তি। কেউ চলে যাচ্ছে শবে বরাতের পক্ষে কেউ চলে যাচ্ছে শবে বরাতের বিপক্ষে।
আমার মতো লক্ষ কোটি সাধারণ মুসলমান যারা শত শত বছর ধরে শবে বরাত জন্মের পর থেকেই পালন করে আসছে তাদের বিশ্বাসের মূলে এসব বক্তব্য আঘাত করছে। আমিও শিশুকাল থেকে শবে বরাত পালনকারী একজন মুসলিম। এসব হুজুরদের বক্তব্য আমার দীর্ঘদিনের বিশ্বাসকেও আঘাত করছে। আমার মতো লক্ষকোটি মুসলিম আজ এসব হুজুরদের বক্তব্যে বিভ্রান্ত। একদিকে কিছু আলেম এবং সরকার রাষ্ট্রীয়ভাবে বলবে শবে বরাত পালন করার জন্য। অন্যদিকে এক শ্রেণীর মতলববাজ আলেম বলবে এসব বেদায়াত, এটাতো সরাসরি রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা ছাড়া আর কিছু নয়।
আলেম সমাজ যে যা বক্তব্য দিচ্ছেন তা বিচ্ছিন্নভাবে দিচ্ছেন, কখনোও এক টেবিলে বসে নয়। যার কাছে যত তথ্য এবং যুক্তি আছে সব নিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে না বলে পক্ষ বিপক্ষ উভয় শ্রেণীর আলেম এক টেবিলে বসে একটা বাহাসতো করতে পারে। কিন্তু আজ পর্যন্তু কেউ কাউকে কোনো বাহাছে তর্কে বসতে বলেছে শুনিনি কিংবা উদ্যোগ গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। যেহেতু বিষয়টা আজ সামাজিক এবং ধর্মীয় বিতর্কের মধ্যে শামিল হয়েছে তাই সবচেয়ে ভালো হয় যদি এক্ষেত্রে ইসলামিক ফাউন্ডেশন নিজ উদ্যোগে হস্তক্ষেপ করে বিষয়টির একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান করে।
যদি শবে বরাতকে বেদায়াত প্রমাণ করার জন্য কতিপয় আলেমের হাতে যথেষ্ট যুক্তি বা তথ্য থাকে তা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কাছে উপস্থাপন করুক। ইসলামিক ফাউন্ডেশন দেশের সমস্ত বিশিষ্ট আলেমদের চিঠি দিয়ে ডেকে শবে বরাতের পক্ষে বিপক্ষে যুক্তি তথ্য উপাত্ত বক্তব্য শুনবে। এতে অন্তত ১০০জন বিশিষ্ট আলেমকে দাওয়াত দেওয়া যেতে পারে। সেখান থেকে ধর্ম মন্ত্রণালয় আলেমদের গ্রহণযোগ্য মতামতের ভিত্তিতে যে রায় গ্রহণ করবে তা বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রচার করবে। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে শবে বরাত এ দেশে পালিত হবে কি হবে না তা জনগনের কাছে জানিয়ে দেওয়া হবে। জনগণ শুধু শুধু তাদের দীর্ঘদিনের বিশ্বাসকে আমলকে কিছু মতলববাজ আলেমের কথায় ছাড়তে পারে না। বিষয়টি অতীব গুরুত্বের সাথে বিবেচনার জন্য আপনার সদয় মর্জি কামনা করছি।
লেখকঃ কলামিস্ট ও সাংস্কৃতিক কর্মী।
arzufeni86@gmail.com