, || - ||

সুন্দর ব্যবহার দিয়েই শহীদ ভাই সবার প্রিয় হন -হারুনুর রশিদ আরজু

প্রকাশিত হয়েছে-
প্রকাশ করেছেন- নয়া আলো অনলাইন ডেস্ক।

 

 

কর্মজীবনে যাওয়ার পর সবাই পরিবার আত্মীয় কিংবা ছোট বেলার বন্ধু-বান্ধব থেকে এক প্রকার বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। হয়তো ঈদে কিংবা কারো অনুষ্ঠানে বছরে এক দু’বার দেখা হওয়ার সুযোগ থাকে। আবার কারও কারও সাথে কয়েক বছরেও দেখা হয় না, যোগাযোগ হয় না। কারণ আমরা সবাই কমবেশী সবাই নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত। কারো খবর কেউ রাখার প্রয়োজন মনে করি না। কিন্তু আজ যে মানুষটির কথা স্মরণ করছি তিনি আমার আত্মীয় প্রিয়জন বড়ভাই কাজিন ব্যাংকার জনাব শহীদুল্লাহ মজুমদার। যিনি ছিলেন অন্য দশজন মানুষের চাইতে ভিন্ন মানুষ। বলা যায় প্রকৃত মানুষ। যিনি সবাইকে আপন ভাবতেন। যিনি কাউকে আঘাত দিয়ে কথা বলতেন না। যিনি সর্বদা মানুষের সহযোগিতা করতে একপায়ে খাঁড়া থাকতেন। কারো বিপদের কথা শুনলে দৌঁড়ে হাজির হতেন, অন্তত ফোনে হলেও খবর নিতেন। এভাবে হয়ে উঠেন তিনি একজন শহীদ ভাই। যাকে সব মানুষের পরিচিতির কেন্দ্রস্থল মনে করা হতো। অনেকে ঠাট্টা করে বলতেন শহীদ ভাই হলেন ফেনী জেলা ডিশ এন্টেনা। সবার যোগাযোগের নেটওয়ার্ক হলেন তিনি। এজন্য শিক্ষিত ভদ্র সমাজে তাকে চেনে না জানে না এমন ব্যক্তি খুব কম।
সম্প্রতি এই প্রিয় বড়ভাইটি শহীদুল্লাহ মজুমদার (৫৭) গত ১২ই মে তথা ১৮ই রমজান ইন্তেকাল করেন। পশ্চিম ছাগলনাইয়া গ্রামের কালাগাজি মজুমদার বাড়ির এক সম্ভ্রান্ত পরিবার তথা ডাক্তার নজির আহমেদ মজুমদারের তৃতীয় সন্তান তিনি। আত্মীয় হওয়ায় তাকে অত্যন্ত কাছ থেকে দেখার এবং জানার সুযোগ হয়েছে। তারচেয়ে বড় কথা গত সাত বছর উনার সাথে নিয়মিত যোগযোগ রয়েছে। ২০১৩ সালে তিনি বদলী হয়ে কক্সবাজার গেলেন। সেখানে আমি অনেক আগে থেকেই পোস্টিং। উনি ঢাকা থেকে সুদূর কক্সবাজার বদলী হওয়ায় মাথায় আসমান ভেঙ্গে পড়ার মতো মনে হয়েছে। ওখানে তিনি নতুন কাউকে চিনেন না। প্রথম দিন হোটেলে উঠেই আমাকে ফোন দিলেন। বললেন, ভাই তুমি ছাড়া আমার এই সাগর পাড়ে আর আপন কেউ নেই। আমার বাসার কাছাকাছি একটা মেস বাসা ঠিক করে দিলাম। আমার অফিস এবং বাসার সাথে ওনার বাসা ও অফিসের দূরত্ব মাত্র পাঁচ মিনিটের। এরপর নিয়মিত যোগাযোগ এবং দেখা হতো প্রায় প্রতিদিন। আমার বাসায় যেতেন। আস্তে আস্তে কক্সবাজারে থাকতে উনার মন বসে। কক্সবাজারে একবার শীতের সময় উনি প্রচন্ড শ্বাস কষ্টে পড়েন। তখন প্রায় মর মর অবস্থা। আল্লাহর মেহেরবানী যে তখন তার কাছে ছিলাম। আল্লাহপাক ঐ যাত্রায় তাকে সাহায্য করেন, উনি সুস্থ হন।
কিন্তু দুর্ভাগ্য ১১বছর কক্সবাজারে থাকার পর আমাকে ২০১৪সালে চট্টগ্রামে বদলী করা হয়। উনি থেকে যান কক্সবাজার। উনি বললেন, ভাই তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গেলে? আমি আবার একা হয়ে গেলাম। যাক, উনার কষ্টের দিন শেষ হয়। ২০১৫ সালে উনিও বদলী হয়ে চট্টগ্রামে আসেন। আবার নিয়মিত যোগাযোগ হতো। এখানে এসে তিনি কিছুদিন ব্যাচেলর ছিলেন। যেহেতু ফ্যামিলি ছিলো ঢাকায়। এরপর সিদ্ধান্ত নিলেন ফ্যামিলি চট্টগ্রাম নিয়ে আসবেন। বাসা দেখার দায়িত্ব দিলেন। পেয়েও গেলাম আমার পাড়াতেই। ওনার পছন্দ হলো। কাছাকাছি বাসা হওয়াতে আসা-যাওয়া যোগাযোগ নিয়মিত। মেয়েদের একটাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং একটাকে স্কুলে ভর্তি করালেন। এবার আমার বদলী হলো প্রথমে লক্ষীপুর এবং এরপর চাঁদপুর। তবে ছুটির দিনগুলিতে যোগাযোগ হতো। মোবাইলে কথা হতো। গত বছর রমজানেও একসাথে বাসায় একসাথে ইফতার করলাম। তখন কি জানতাম এবারের রমজানে তিনি দুনিয়া থেকে চলে যাবেন?
শহীদ ভাইয়ের সাথে যার একবার পরিচয় হয়েছে সেই জানে তিনি কেমন চরিত্রের অধিকারী। কোনো মানুষ বাইরের জগতে অনেক নাম পরিচিতি অর্জন করে কিংবা সুনামও অর্জন করে, কিন্তু নিজ গ্রামের বা এলাকার মানুষের কাছে তিনি হয়তো জনপ্রিয় হতে দেখা যায় না। কিন্তু শহীদ ভাইয়ের জনপ্রিয়তা তার আত্মীয় বন্ধু পরিচিতজন সবার কাছেই সমানভাবে ছিলো। কারণ একটাই, তিনি খুব সামাজিক লোক ছিলেন। তার কাছে ছোট বড় সবাই সমান গুরুত্ব পেতো। তিনি মানুষকে খুব বেশী দরদ দিয়ে ভালোবাসতেন। তিনি কারো প্রতি অসদাচারণ করতেন না। মানুষকে সম্মান করা উনার ধর্ম ছিলো। উনি কাউকেই অসম্মান করতেন না। ছোটদের ¯েœহ করা বড়দের সম্মান করা তার সামাজিকতা রক্ষার মূল মন্ত্র।
মানুষকে গুরুত্ব দেওয়া এটা একটা বড় গুণ। কারো সাথে দেখা হলে কথা বলবেন না বা তা কুশল জিজ্ঞেস করবেন না এটা শহীদ ভাইয়ের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ছিলো না। মানুষের সাথে সুসম্পর্ক রাখতে টাকা খরচ করতে হয় না। শুধু একটু মানসিকতাকে বড় করতে হয়। যা শহীদ ভাই থেকে শিখা যায়। এই মানুষটিকে ভুলা যায় না।
উনার সাথে ফোনে কথা বলা মানে লম্বা সময় নিয়েই প্রস্তুতি নিতে হতো। যখনই যার কথা মনে পড়তো উনি তাকে তাৎক্ষণিক একটা ফোন দিয়ে দিতেন। মোবাইলে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলতেন। আত্মীয় বন্ধু পাড়া প্রতিবেশী সবার খবরা খবর তিনি রাখতেন। গোটা ফেনী জেলার অনেক স্বনামধন্য ব্যক্তিদের সাথে শহীদ ভাইয়ের সুসম্পর্ক ছিলো। ঢাকাস্থ ফেনী সমিতি কিংবা চট্টগ্রাম সমিতির সদস্যও ছিলেন তিনি। দীর্ঘকাল তিনি ঢাকায় কাটিয়েছেন। এরপর বদলী জনিত কারণে ২ বছর কক্সবাজার এবং সর্বশেষ চট্টগ্রামে বসবাস করেন। এখানে বাসায় তার মৃত্যু হয়। আর এবার মৃত্যুর আগে শেষের দিনগুলোতে প্রতিদিন কথা হয়েছে। আফসোস শুধু এটাই যে, করোনা দুর্যোগের এই অসময়ে তিনি মৃত্যুবরণ করায় এই প্রিয় মানুষটির জানাজায় আমার মতো অনেকেরই অংশ গ্রহণ করার সবার সুযোগ হয়নি।
তিনি এমন কোনো ভিআইপি পারসন নন। অথচ তিনি সবার ভালোবাসার পেয়ে একজন ভিআইপি পারসন এ পরিণত হয়েছেন।। একসময় যাত্রীবাহী বাসে লেখা দেখতাম- “ব্যবহারে বংশের পরিচয়”। এটা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণী। একজন মানুষকে চেনার জন্য তার ব্যবহারই যথেষ্ট। কারো গায়ে বংশ বা লেখাপড়ার ডিগ্রী লেখা থাকে না। কিন্তু একজন মানুষ অন্য একজন মানুষের সাথে কীভাবে কথা বলেন তা দেখেই মূল্যায়ন করা যায় তার লেখাপড়া বা বংশের পরিচয়। শহীদ ভাইয়ের মানুষের প্রতি ব্যবহারই পরিচয় করিয়ে দেয় তিনি একজন বড় বংশের মানুষ, বড় মনের মানুষ। আল্লাহপাক এই ভালো মানুষটিকে জান্নাতবাসী হিসেবে কবুল করুন। আমীন।
লেখকঃ কলামিস্ট ও সাংস্কৃতিক কর্মী।

Please follow and like us: