লায়লা জাবেরিনকে আগাগোড়াই ফিলিস্তনি মুসলিম পরিবারের গোত্রপ্রধানের মতো লাগছিল। সম্প্রতি এক সকালে তার সঙ্গে যখন দেখা করতে গেলাম, তাকে চারপাশে ঘিরে ধরে রেখেছে তার বংশধররা। মোট ৩৬ জন নাতি তার। চারপাশে আরবি উচ্চারণই বেশি। কিন্তু মাথায় বাদামি স্কার্ফ পরা জাবেরিন সাক্ষাতপ্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলছিলেন হিব্রুতে; আরবিতে নয়। তিনি এমন এক কাহিনী বলছিলেন, যা তার ৭ সন্তানও বড় হওয়ার আগে জানতে পারেনি।
তার আসল নাম লায়লা জাবেরিন নয়। এই জন্মের পর তার নাম ছিল হেলেন বার্শ্যাতজস্কি। তিনি মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেননি।
তিনি ছিলেন ইহুদী। ছয় দশক আগে ফিলিস্তিনি এক যুবকের প্রেমে পড়ে তিনি যে জীবন শুরু করেছিলেন আরব পাড়ায়, তার জীবনের গল্প কিন্তু সেখান থেকে শুরু হয়নি। বরং, তার জন্ম হয়েছিল নাৎসি বন্দীশালায়। এক ইহুদী পিতামাতার ঘরে তার জন্ম। শিবিরেই তাকে লুকিয়ে রেখে বড় করেছিলেন তার পিতামাতা।
জাবেরিন বলেন, ‘আমি ইহুদী ছিলাম বলে আমি নির্যাতিত হয়েছিলাম। আজ আমি নির্যাতিত হচ্ছি কারণ আমি একজন মুসলমান।’
ইহুদী থেকে মুসলিম হওয়া এই নারী বিশ্বজুড়ে ইহুদীবিদ্বেষ ও ইসলাম-বিদ্বেষ দুইয়ের উত্থান নিয়েই শঙ্কিত। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত পিটসবার্গ সিনাগগে ১১ প্রার্থণারত ইহুদীকে হত্যা, গত বছর নিউ জিল্যান্ডে মসজিদে ৫১ জন মুসল্লিকে হত্যা-উভয় ঘটনা নিয়েই কথা বলেছেন তিনি। তিনি বলেছেন, উভয় ঘটনার হত্যাকারী একই আদর্শে উজ্জীবিত। এই আদর্শ হলো ঘৃণার আদর্শ। নিজের আরব স্বামী ও পরিবারের দিকে দেখিয়ে জাবেরিন বলেন, ‘আমি যখন স্কুলে ছিলাম [ইসরাইলে], আমাদেরকে শেখানো হতো আরবদের লেজ আছে।’ অর্থাৎ, আরবরা হলো পশুর সমান। জাবেরিনের ভাষ্য, ‘ইহুদীদের সঙ্গে কী হয়েছিল তা সকলকে জানতে হবে। কারণ, ইহুদীদের সঙ্গে যা হয়েছিল তা আজ আরবদের ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে।’
১৯৬০ সালে নববধু হয়ে এই শহরে এসেছিলেন জাবেরিন। নাজারেথের দক্ষিণে ইসরাইলের অভ্যন্তরেই এই আরব অধ্যুষিত শহরে ৫৫ হাজার মানুষের বসবাস। নববধূ জাবেরিনকে সাদরে বরণ করে নিয়েছিলেন প্রতিবেশীরা। যদিও তারা জানতেন যে তিনি ছিলেন ইহুদী। কিন্তু তার স্বামী মোহাম্মেদ ছাড়া কেউই জানতো না তার হলোকাস্ট অতীতের কথা। তাদের ঘরে জন্ম নেয় সাত সন্তান। কিন্তু কয়েক দশক ধরে তারাও বুঝতো না হলোকাস্ট নিয়ে কোনো টেলিভিশন তথ্যচিত্র প্রচারিত হলে তাদের মা কেন এত আগ্রহ নিয়ে দেখতে চাইতেন। কারণ, আরব স্কুলে হলোকাস্টের বিষয়ে খুব সামান্যই পড়ানো হয়।
জাবেরিন বলেন, ‘একদিন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে এই যন্ত্রণা মাথা থেকে বের করা দরকার। কিন্তু আজও একে আমার কঠিন মনে হয়। চলচ্চিত্রের মতো সেখানকার দৃশ্য আজও আমি দেখতে পাই অবচেতন মনে।’
২০১২ সালে ইসরাইলি ইন্স্যুরেন্সভোগী পেনশনধারীদের এক বৈঠকে সরকারী এক কর্মকর্তা দেখতে পান যে জাবেরিন তার পাশের একজনকে হিব্রু অনুবাদ করে দিচ্ছেন। ওই কর্মকর্তা তাকে কিছু প্রশ্ন করেন। জাবেরিন ইহুদী হিসেবে বড় হয়েছেন, আরও বড় কথা, তিনি হলোকাস্ট থেকে বেঁচে ফিরেছেন শুনে ওই কর্তা যারপরনাই অবাক হন। তার উদ্যোগেই আমলাতন্ত্রের লালফিতা টপকে জাবেরিনের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয় ইসরাইলি হলোকাস্ট সার্ভাইভরদের তালিকায়।
এরপরই জাবেরিন তার সন্তানদের খুলে বলেন তার একান্তই ব্যক্তিগত ইতিহাস। তার ছেলে নাদের বলেন, ‘ওই গল্প শুনাটা খুবই কঠিন ছিল। আমি ওই যুদ্ধ ও হলোকাস্ট নিয়ে তাকে অসংখ্য প্রশ্ন করেছিলাম।’
জাবেরিনের মা একজন হাঙ্গেরিয়ান ইহুদী। পিতা রাশিয়ান ইহুদী। ১৯৪২-৪৩ সালে হাঙ্গেরি কিংবা অস্ট্রিয়ার নাৎসিদের কোনো এক ইহুদী বন্দীশালায় তার জন্ম। জাবেরিনার পিতামাতা নিজেদের অতীত নিয়ে কথা বলতে একদমই পছন্দ করতেন না। তাদের পারিবারিক যেই আর্কাইভ ইসরাইলি সংস্থায় সংরক্ষিত আছে, তা ওয়াশিংটন পোস্ট দেখেছে। সেখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সময়ের বর্ণনা অনুপস্থিত।
ওই বন্দীশালার ডাক্তারের অধীনে কাজ করতেন জাবেরিনের মা। জন্ম হওয়ার পর নাৎসিদের হাত থেকে বাচাতে তাকে ওই ডাক্তারের কাছে হস্তান্তর করেন তিনি। ওই ডাক্তার জাবেরিনকে নিজের বাসার নিচে লুকিয়ে রাখতেন। ১৯৪৫ সালে ওই শিবির মুক্ত করা হয়। তার আগ পর্যন্ত ডাক্তারের বাসা ছেড়ে তেমন বের হননি জাবেরিন। এরপর অন্যান্য হাজার হাজার ইহুদীদের পাশাপাশি তারা যুগোস্লাভিয়ার একটি অস্থায়ী শিবিরে ছিলেন কয়েক বছর। এরপর ১৯৪৮ সালে উঠে পড়েন ইসরাইলগামী জাহাজে।
জাবেরিনের পরিবার হাইফায় অবতরণ করে। কিন্তু তারা তেল আবিবে পাকাপোক্তভাবে থাকতে শুরু করেন। তখন তার নাম ছিল হেলেন। কিশোরী হেলেন একদিন দেখতে পান বাড়ির পাশেই কাজ করছে এক তরুণ নির্মান শ্রমিক। দেখেই ভালো লেগে যায় হেলেনের। তিনি বলেন, ‘সে খুব কঠোর পরিশ্রম করছিল। আমি তাকে অনেক পানি দিয়েছিলাম।’ তার স্বামী মোহাম্মেদ জাবেরিন, সেদিন হেলেনের দয়ার কথা আজও মনে রেখেছেন।
হেলেন যখন তার পিতাকে বললেন যে তিনি মোহাম্মেদ জাবেরিনকে বিয়ে করতে চান, তখন তার পিতা ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন। তাদের পরিবার যে খুব ধর্মকর্ম করতো, তেমন নয়। কিন্তু হেলেনের পিতা চেয়েছিলেন যে অন্তত কোনো ইহুদীর সঙ্গে তার বিয়ে হোক। তিনি হেলেনকে বলেছিলেন, ‘তুমি যদি তার কাছে যাও, তাহলে এটি হবে অনেকটা হিটলারের কাছে ফিরে যাওয়ার মতো।’ কিন্তু হেলেন টলেননি। ১৯৬০ সালে তারা বিয়ে করেন। এখন তিনি লায়লা জাবেরিন। তার ভাষ্য, ‘ভাগ্য মানুষকে যেখানেই নিয়ে যায়, সেখানেই আপনাকে যেতে হবে।’ নতুন ঘরে এসে খুব দ্রুতই তিনি মানিয়ে নিয়েছিলেন। সবাই তাকে লায়লা বলে ডাকা শুরু করলো। আগে থেকেই রাশিয়ান, হাঙ্গেরিয়ান ও হিব্রু ভাষা জানতেন তিনি। এবার শেখা শুরু করলেন আরবি। তবে পিতার অবাধ্য হলেও পরে তার সঙ্গে দুরত্ব গুছিয়েছিলেন কিছুটা। আর মায়ের সঙ্গে সবসময়ই ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখেছেন। কিন্তু আজ তিনি এক প্রকাণ্ড আরব পরিবারের জননী।
লায়লা কিন্তু বিয়ের পরও ইহুদীই রয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু সন্তানদের জন্মের পর ১৯৭৩ সালে তিনি মুসলিম হন। শুধু ধর্মীয় নয়, ধর্মান্তরের পেছনে কিছু বাস্তবিক কারণও ছিল। ইসরাইলি আইন অনুযায়ী মা ইহুদী হলে ছেলেরাও ইহুদী হিসেবে বিবেচিত হবে। আর শেষ পর্যন্ত তাদেরকেও বাধ্যতামূলকভাবে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে হবে। এসব ভেবেই মুসলিম হয়ে গেলেন তিনি। আজও তেমনি আছেন।
(ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে অনূদিত। সংক্ষেপিত। স্টিভ হেনড্রিক্স হলেন ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকার জেরুজালেম ব্যুরো প্রধান। রুথ এগল্যাশ একই পত্রিকার জেরুজালেম প্রতিনিধি।)