আহাদ তালুকদার – গ্রাম বাংলার মাঠের ঐতিহ্য হলো বাবুই পাখির বাসা। আর আজ সেই বাবুই পাখিই হারিয়ে যেতে বসেছে। তালের পাতায় নিপুণ কারুকার্য করে বাবুই পাখি তার অপরূপ সৌন্দর্যের বাসা তৈরি করে।
এক সময় প্রকৃতি দাবিয়ে বেড়ানো এ পাখিগুলো আজকালের বিবর্তনে বাংলার আবহমান চিরচেনা সবুজ প্রকৃতি থেকে একেবারেই বিলুপ্তির পথে। বাংলার এখানে ওখানে তাল গাছের পাতায় কত না মেধা শক্তি খাটিয়ে নিজেদের থাকার আবাসস্থল গড়তো বাবুই পাখি।
ছবি সম্প্রতি বরিশাল জেলার আগৈলঝাড়া উপজেলার সাহেবেরহাট ঘুরে বাবুই পাখির এমন জীবনচিত্র দেখা গেছে।
পরিবেশ বিপর্যয় জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজার, নতুন বনায়নে বাসযোগ্য পরিবেশ ও খাদ্যের অভাব, নির্বিচারে তাল ও নারিকেল গাছ কর্তনের,কারণে সামাজিক বন্ধনের প্রতিচ্ছবি বাবুই পাখি ও এর দৃষ্টিনন্দন বাসা ক্রমান্বয়ে হারিয়ে যাচ্ছে।
গ্রাম বাংলায় এক সময় উঁচু গাছের ডালে সুনিপুণভাবে বাবুই পাখি বাসা তৈরি করত। পথিক মুগ্ধ চোখে তাঁতিদের মতো সুনিপুণ শিল্পকর্মে গড়া এ পাখির বাসার দিকে চেয়ে থাকত। এ পাখিকে ভালোবেসে অনেকে নিজের ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানেরও নামও রেখেছেন।
কালের বিবর্তনে বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলা থেকে এই বাবুই পাখির বাসা আজ বিলুপ্তির পথে। এসব বাসা শুধু শৈল্পিক নিদর্শনই ছিল না, মানুষের মনে চিন্তার খোরাক জোগাত এবং আত্মনির্ভশীল হতে উৎসাহ দিত। কিন্তু পরিবেশে বিপর্যয়ের কারণে পাখিটি আমরা হারাতে বসেছি।
এখন আর আগের মত দেখা যায় না বাবুই পাখির বাসা। আর গ্রামের রাস্তায় নেই সেই সারিবন্ধ তাল ও নারিকেলগাছ। যেটা ছিলো বাবুই পাখির মুল বসবাস যোগ্য। গ্রাম-গঞ্জে নারিকেল পাতা, তালের পাতা, লম্বা শক্ত ঘাস, এসবের সমন্বয়ে একটি তাল ও নারিকেল গাছে তিন প্রকারের বাসা নির্মাণ করতো বাবুই পাখি। এর মধ্যে একটি বসবাসের জন্য, একটি ডিম পেড়ে বাচ্চা ফুটানোর জন্য, এবং একটি খাবার সংগ্রহ করে রাখার জন্য। বাসা নির্মাণের জন্য তারা সাধারণত তাল ও নারিকেল গাছকে বেশি বেছে নিতো।
এ বাসা দেখতে যেমন আকর্ষণীয় লাগে, ঠিক তেমনি অনেক মজবুত। প্রবল ঝড়েও তাদের বাসা ছিড়ে নিচে পড়ে না। পুরুষ বাবুই পাখি বাসা তৈরির কাজ শেষ হলে সঙ্গী খুঁজতে বের হয়। সঙ্গী পছন্দ হলে স্ত্রী বাবুইকে সাথী বানানোর জন্য পুরুষ বাবুই নিজেকে আকর্ষণীয় করতে খাল, বিল ও ডোবার পানিতে গোসল করে গাছের ডালে ডালে নেচে বেড়ায়। বাবুই পাখির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো- রাতের বেলায় ঘর আলোকিত করতে বাসার ভিতর এক চিমটি গোবর রেখে জোনাকি পোকা ধরে এনে তার উপর বসিয়ে দেয় এবং সকাল হলে ছেড়ে দেয়।
বিশেষজ্ঞরা জানান দেশি বাবুইকে প্রায়ই ফসলে ক্ষেতে দেখা যায়, অনেকে ধারণা করেন পাখিটি ফসল খায়। কিছু ফসল হয়তো খায়ও। কিন্তু ফসলের ক্ষতিকর পোকামাকড়ই তার প্রধান খাদ্য। তাই প্রকৃতপক্ষে কৃষকের ক্ষতির চেয়ে উপকার অনেক বেশি করে।
প্রজনন ঋতুতে একসময় পাখির কিচিরমিচির শব্দে আমাদের ঘুম ভাঙতো। কিন্তু এখন আর পাখির সেই কিচিরমিচি শব্দও শোনা যায় না। বাসস্থান সংকটের কারণে এ পাখি ধীরে ধীরে প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।
এখন আমাদের সকলের উচিত বেশি করে তাল গাছ ও খেজুর গাছ লাগানো। তাল গাছ হলে যেমন আমরা বজ্রপাত থেকে অনেকটা নিরাপদে থাকবো ঠিক তেমনি খেজুর গাছ হলে আবার আমাদের রস ও গুড়ের চাহিদাও মিটে যাবে। শুধু বাবুই পাখি না, জাতীয় পাখি দোয়েল, চড়ুই, শালিক, চিল, কাক, কোকিল প্রভৃতি সকল পাখিই আজ অস্তিত্ব সংকটে আছে, এখনোই যদি এ সব পাখি সংরক্ষণের উদ্যোগ না নেওয়া যায়, হয়তো অদূর ভবিষ্যতে এসব পাখি প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাবে।
আগৈলঝাড়া উপজেলা সহকারী বন কর্মকর্তা জনাব কালিপদ পুইস্তা জানান আসুন, আমরা সম্মিলিতভাবে এই প্রাকৃতিক শিল্পকর্মকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর ও সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করি। সময় এসেছে সরকার, পরিবেশবিদ ও সাধারণ মানুষকে একসঙ্গে কাজ করে বাবুই পাখি ও তাদের শৈল্পিক বাসাগুলোকে রক্ষা করার।










