শীতের আগমনের সাথে সাথে অতিথি পাখির আগম ছিলো প্রকৃতির একটি স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু গত এক যুগের ব্যবধানে বরিশালে আশংকাজনক হারে কমেছে অতিথি পাখির আগম। চলতি মৌসুমে অতিথি পাখি আসেনি বলল্যেই চলে।
এর কারন হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তন ও খাদের অভাব, শব্দ দূষন এবং পাখি শিকারকেই দায়ি করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, নিরাপদ আশ্রয়স্থল না থাকার কারনেই অতিথি পাখিদের আগমন দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শীতকালীন ঋতুতে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশ বরফে ঢাকা পড়ে। তাই অতিথি পাখিগুলো বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের দেশেও বালুহাঁস, বিদেশী পানকৌড়ি, গাঙ্গচিল, টিয়া, বক, শালিকসহ বিভিন্ন অতিথি পাখি শীত মৌসুমেই এসে থাকে।
যেসব অঞ্চলে হাওর-বাওর, বিল-ঝিল, দীঘি, বড় পুকুর, সমুদ্র-সৈকত থাকে সেসব অঞ্চল অতিথি পাখি তাদের আবাসস্থল হিসেবে বেছে নেয়। তবে বরিশালে পরিবেশের অভাবসহ বিভিন্ন কারণে এবার অতিথি পাখিদের তেমন দেখা মিলছে না।
বরিশালে অতিথি পাখির আবাস স্থল হিসেবে বেছে নিচ্ছে দূর্গাসাগর, সারসী দীঘি, তালতলী, পদ্মা দীঘি, দপদপিয়া, লহারহাটসহ বিভিন্ন স্থান। এসব স্থানে অতিথি পাখির অবাধ বিচারণের জন্য নেই কোন সুব্যবস্থা। খাবার (মাছ) এর সল্পতার কারণে এবার শীতে কিছু পাখি আসলেও তা আবার চলে গেছে।
বরিশালের অন্যতম পর্যটন এলাকা হচ্ছে দূর্গাসাগর। বরিশাল নগরী থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে বাবুগঞ্জ উপজেলার মাধবপাশা এলাকায় অবস্থিত এই দূর্গাসাগর। মাধবপাশা ছিল চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের সর্বশেষ রাজধানী। ১৭৮০ সালে চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের তৎকালীন রাজা শিব নারায়ণ তার স্ত্রী দুর্গা রাণীর নামে খনন করেন বিশাল জলাধার।
যার নাম দেয়া হয় দুর্গাসাগর। ১৯৯৬ সালে প্রায় ৪৬ একরের এই দীঘিকে দুর্গাসাগর দীঘি উন্নয়ন ও পাখির অভয়ারণ্য প্রকল্পের আওতায় নিয়ে পরিণত করা হয় অন্যতম পর্যটন কেন্দ্রে। যার তত্ত্বাবধায়নে রয়েছে বরিশাল জেলা প্রশাসন।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, মাত্র এক দশক আগেও পুরো শীত মৌসুম জুড়েই দুর্গাসাগর দীঘি মুখরিত থাকত হাজারো অতিথি পাখির কল কাকলিতে। কিন্তু ২০০৭ সালে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডরের পর থেকেই দুর্গাসাগরে অতিথি পাখির আগমন কমে যায়।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, জানুয়ারী মাসের প্রথম ২ কি ৩ তারিখে পাঁচ শতাধিক অতিথি পাখি ঝাঁক বেঁধে দুর্গাসাগরে নেমে ছিলো। কিন্তু মাত্র এক থেকে দেড় ঘন্টার পরই পাখিগুলো উড়ে চলে যায়। এর পর মাঝে মধ্যে ৪/৫টি করে পাখি আসলেও তা বেশিক্ষন থাকছে না।
সাগর পারে ঘুরতে আসা রফিকুল ইসলাম বলেন, আমি ঢাকা থেকে বরিশালে ঘুতে এসেছি। শুনেছি বরিশালের দূর্গা সাগর অনেক মনোরম পরিবেশ আর শীতে এখানে অতিথি পাখিরা আসে। তাই সন্তানদের নিয়ে এসেছি। কিন্তু এখানে অতিথি পাখি নেই বললেই চলে।
বিভিন্ন স্থানে ঘুরে পর্যটকরা জানালেন, অনেক আগে একবার এসেছিলাম এখানে। তখন অতিথি পাখির সমারহ ছিলো। এখানের পরিবেশটাও ভালো। কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে পুনরায় এসেছি দূর্গাসাগর ভ্রমনে। এখানে মনোরম পরিবেশ আছি ঠিকই কিন্তু নেই অতিথি পাখি।
অতিথি পাখি না আসা প্রসঙ্গে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. হাসিনুর রহমান বলেন, ‘এক দশক ধরেই দুর্গাসাগর সহ বরিশালের আশপাশে অতিথি পাখিদের আসা যাওয়া নেই। এর প্রধান কারন জলবায়ু পরিবর্তন। সাইব্রেরীয় এই অতিথি পাখি স্বাচ্ছন্দ্যে থাকার পরিবেশ না পাওয়ায় হয়তো এসেও চলে যাচ্ছে। আবার শব্দদূষণ ও খাদ্য সংকটও পাখিদের না আসার কারন হতে পারে।
অপরদিকে পরিবেশ অধিদপ্তর বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক মো. আব্দুল হালিমও অতিথি পাখি’র আগমন কমে যাওয়া এবং আসলেও না থাকার কারন হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তন ও দূষনমুক্ত পরিবেশ না থাকাকেই দায়ি করেছেন। তবে তদন্ত করে এর সঠিক কারন উদঘাটন করা দরকার বলে মনে করেন এই কর্মকর্তা।









