গাজীপুরের সাবেক সাংসদ ও জনপ্রিয় শ্রমিক নেতা আহসান উল্লাহ মাস্টার এমপি হত্যা মামলায় মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামি নুরুল ইসলাম দীপু ও তার ভাই একই মামলার মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত আসামি কারাবন্দি নূরুল ইসলাম শিপুর (বর্তমানে কারাগারে) বাড়িতে অগ্নিংসযোগ করা হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় টঙ্গীর গোপালপুরের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
নুরুল ইসলাম দীপু জাতীয় পার্টির নব গঠিত কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক ও তার ভাই নূরুল ইসলাম শিপু একই মামলার মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত আসামি। স্বজনদের অভিযোগ আওয়ামী লীগের লোকজন এই হামলা করেছে। এ সময় বাড়িতে ব্যাপক ভাংচুর করা হয়। বাড়িটিতে তাদের স্বজন ও ভাড়াটিয়ারা বাস করেন।
টঙ্গী ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার আতিকুর রহমান জানান, আগুনে বাড়ির দোতলার একটি ইউনিট পুড়ে গেছে এবং নিচতলাসহ অন্যান্য ইউনিট ভাংচুর করা হয়েছে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে নিয়ন্ত্রনে আনায় অন্যান্য ইউনিটে আগুন ছড়াতে পারেনি।
দিপুর স্ত্রী শরিফা খানম সুমি ও তার ভাইপো শাহরিয়ার নাজিম জানান, আওয়ামী লীগের স্লোগান দিয়ে কয়েকশ লোক লাঠিসোটা নিয়ে প্রথমে দিপুর বাড়িতে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করে। পরে পাশের শিপুর বাড়ির জানালার কাঁচ ভাংচুর করেছে এবং পেট্রোল দিয়ে দোতলায় অগ্নিসংযোগ করেছে। তারা বাড়িতে প্রবেশ করে কিছু বুঝার আগেই ঘরবাড়ি ও আসবাবপত্র ভাঙচুর করতে থাকে। বাধা দিলে হামলাকারীরা বলতে থাকে-মাস্টারের খুনির কোনো আত্নীয়-স্বজন টঙ্গীতে থাকতে পারবে না। তাদের দেওয়া আগুনে বাড়ির ৩টি কক্ষ আগুনে পুড়ে গেছে। অন্তত ২০টি কক্ষের আসবাবপত্র ভাংচুর করা হয়। পরে টঙ্গী ফায়ার সার্ভিসের দুটি গাড়ি ও পুলিশ এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ঘটনাস্থলে পুলিশ যাওয়ার পর পরিস্থিতি শান্ত হয়।
উল্লেখ্য, আহসান উল্লাহ মাস্টার এমপি হত্যা মামলায় মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি দিপুকে জাতীয় পার্টির (জাপার) যুগ্ম সম্পাদক করায় টঙ্গী থানা আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠন গত কয়েকদিন ধরে গাজীপুর মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ করে আসছিল। দিপু বর্তমানে ইউরোপে পলাতক রয়েছেন। এর আগে তিনি জাতীয় পার্টির সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। ২০০৪ সালে আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যাকান্ডের সময় দিপু জাতীয় পার্টির ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্র সমাজের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। মামলাটি বর্তমানে উচ্চ আদালতে আপিলে রয়েছে।
প্রয়াত সাংসদ আহসান উল্ল¬াহ মাস্টারের ছোট ভাই গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ও মামলার বাদী মতিউর রহমান মতি জানান, হামলাকারীরা আওয়ামী লীগের কেউ নন। আহসান উল্লাহ মাস্টারকে সর্বসাধারণ ভালো বাসতো। তার হত্যা মামলার আসামিকে জাতীয় পর্টির (জাপার) মহাসচিব করায় এলাকার সাধারনর মানুষের মনে ক্ষোভ-বিক্ষোভ চলছিল। এরই জেরে এলাকার ক্ষিপ্ত জনতা ওই ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে।
তিনি বলেন, জনপ্রিয় নেতা সংসদ সদস্য আহসান উল্ল¬াহ মাস্টার ২০০৪ সালে ৭ মে গাজীপুরের টঙ্গীর নোয়াগাঁও মজিদ মিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে স্বেচ্ছাসেবকলীগের সম্মেলন চলাকালে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন। এসময় গুলিতে ওমর ফারুক রতন নামের আরও একজন কিশোর নিহত হন। ঘটনার পরদিন নিহতের ছোট ভাই মতিউর রহমান বাদী হয়ে ১৭জনের নামোল্লেখ করে অজ্ঞাত আরো ১০-১২জনের বিরুদ্ধে টঙ্গী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। এ মামলার তদন্ত শেষে ওই বছরের ১০ জুলাই ৩০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ পত্র দেয় পুলিশ। একই বছরের ২৮ অক্টোবর ৩০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষে ৩৪ এবং আসামিপক্ষে দুজন সাক্ষ্য দেন। এ মামলায় ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন ২০০৫ সালের ১৬ এপ্রিল রায় ঘোষণা করেন। ওই রায়ে প্রধান আসামী বিএনপি নেতা নুরুল ইসলাম সরকারসহ ২২ আসামিকে মৃত্যুদন্ড, ছয় আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড এবং দুইজনকে খালাস দেয়া হয়। পরবর্তীতে কয়েক আসামী তাদের দন্ডাদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপীল করেন। শুনানী শেষে সর্বশেষ ২০১৬ সালের জুন মাসে উচ্চ আদালতের রায়ে ছয়জনের মৃত্যুদন্ড, ৮জনের যাবজ্জীবন দন্ডাদেশ দেন। রায়ে দ্রুত বিচার আদালতে মৃত্যুদন্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয়েছিল এমন ১১জন আসামিকে খালাস দেয়া হয়। দন্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত বিএনপি নেতা নুরুল ইসলাম সরকার, মাহবুবুর রহমান ও সোহাগ এবং যাবজ্জীবন কারাদন্ড প্রাপ্ত মোহাম্মদ আলী ও নুরুল আমিনসহ ৮জন বিভিন্ন কারাগারে বন্দী রয়েছে। নুরুল ইসলাম দীপুসহ বাকি দন্ডপ্রাপ্তরা ভারত, ইতালি, বেলজিয়া, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশে পলাতক রয়েছে।
উল্লেখ্য, আহসান উল্লাহ মাষ্টার ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে গাজীপুর-২ (গাজীপুর সদর-টঙ্গী) আসন হতে দু’বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি ১৯৯০ সালে গাজীপুর সদর উপজেলা চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৩ ও ১৯৮৭ সালে দ’ুদফা পূবাইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৯২ সালে উপজেলা পরিষদ বিলোপের পর চেয়ারম্যান সমিতির আহবায়ক হিসেবে উপজেলা পরিষদের পক্ষে মামলা করেন ও দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে তোলেন। এক পর্যাযে তিনি গ্রেফতার হন ও কারাভোগ করেন। আহসান উল্লাহ মাষ্টার শ্রমিক লীগের কার্যকরী সভাপতি ও সাধারণ সস্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তিনি আওয়ামী লীগের জাতীয় কমিটির সদস্য, শিক্ষক সমিতিসহ বিভিন্ন সমাজ সেবামূলক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
টঙ্গী পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামাল হোসেন জানান, দুষ্কৃতকারীরা শিপু-দিপুর বাড়িতে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যাওয়ার আগেই তারা চলে গেছে।









