ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে খাগড়াছড়ি-২৯৮ আসনে প্রার্থী মনোনয়ন পাওয়ার পর তাঁর সমর্থকদের মধ্যে এখন আনন্দের উচ্ছ্বাস বইছে।পাহাড়ের যুবরাজ খ্যাত কিংবদন্তি জননেতাকে খাগড়াছড়ি আসনে বিএনপির প্রাথী মানোনিত করায় আনন্দের বাসছে খাগড়াছড়ির বিএনপির সমর্থকেরা।
১৯৬৫ সালের ৫ জানুয়ারি রামগড়ের এক শিক্ষানুরাগী ও সচ্ছল পরিবারে জন্ম ওয়াদুদ ভূইয়ার। পিতা সালেহ আহমদ ভূইয়া, মাতা বিয়া ছালেহ। শৈশব থেকেই সমাজসেবার প্রতি ছিল তাঁর আগ্রহ।
রামগড় সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি (১৯৮০),পরবর্তীতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগ থেকে বিএসএস (অনার্স) ও এমএসএস ডিগ্রি অর্জন করেন।চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তচিন্তা ও রাজনৈতিক উত্তাপপূর্ণ পরিবেশ তাকে গড়ে তোলে এক সমাজমনস্ক, যুক্তিবাদী ও মানবিক নেতৃত্বে।ছাত্রাবস্থায়ই তিনি বুঝেছিলেন,রাজনীতি মানে জনগণের সেবা।বিশ্লেষণধর্মী দৃষ্টিভঙ্গিই পরবর্তীতে তার রাজনীতির ভিত্তি হয়ে ওঠে।ছাত্রজীবনে যে নেতৃত্বের বীজ বপন করেছিলেন,তা সময়ের সাথে পরিণত হয় পাহাড়ের রাজনীতির এক বিশাল বৃক্ষে।
ওয়াদুদ ভূইয়ার রাজনৈতিক জীবন শুরু ছাত্রদলের মাধ্যমে।১৯৮০ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত তিনি রামগড় উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি,পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক ও সভাপতি ছিলেন।
এ সময় পার্বত্য এলাকায় শান্তিবাহিনীর সন্ত্রাস ও সংঘাত চলছিল।ওয়াদুদ ভূইয়া নিরস্ত্র বাঙালিদের পাশে দাঁড়িয়ে সাহসিকতার সঙ্গে মানবিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন।তাঁর নেতৃত্বে তরুণরা এগিয়ে আসে ঐক্যের পতাকাতলে।তখনই মানুষ তাকে চিনেছিল এমন এক তরুণ নেতা হিসেবে।
পরে তাঁর সাক্ষাৎ ঘটে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে, যা তাঁর রাজনৈতিক জীবনে মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্বের ধারণা ও কৌশল অর্জনে সহায়তা করে।
১৯৯৩ সালে খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন ওয়াদুদ ভূইয়া।
তারপর থেকেই শুরুহয় তার দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা।যেখানে নেতৃত্ব মানে ছিল উন্নয়ন, আর উন্নয়ন মানেই জনগণের মুখে হাসি ফোটানো।১৯৮৯ সালে তিনি খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন।১৯৯৬ ও ২০০১ সালে খাগড়াছড়ি-২৯৮ আসন থেকে টানা দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।২০০২ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পান।তার দায়িত্বকাল ছিল প্রকৃত অর্থে পাহাড়ের“উন্নয়নের যুগ।তিনি বিশ্বাস করতেন,অঞ্চলের স্থিতিশীলতা আসবে উন্নয়নের মাধ্যমে,বঞ্চনা নয়।উন্নয়ন ও অর্থনীতির পুনর্জাগরণ
তার নেতৃত্বে পাহাড়ে রাস্তাঘাট,সেতু, স্কুল, হাসপাতাল ও বিদ্যুৎ সুবিধার বিস্তার ঘটে।পুরো জেলায় তার উন্নয়নের স্পর্শ।তিনি কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করেন,পাহাড়ে আম,লিচু,কাজুবাদাম,আনারস ও মিশ্র ফলের বাগান গড়ে তুলতে।তার অনুপ্রেরণায় পাহাড়ি কৃষি আজ স্বপ্নের নতুন পথে।যেখানে আত্মনির্ভর কৃষক সমাজ গড়ে উঠেছে,আর কোটি কোটি টাকার অর্থনীতি গতি পেয়েছে। আজ সেই অনুরেণায় পাহাড়ের অর্থনীতি দাঁড়িয়েছে আত্মনির্ভর কৃষিভিত্তিক মডেলে যা কোটি টাকার উৎপাদনশীল বাজারে রূপ নিয়েছে।
ওয়াদুদ ভূইয়া শুধু রাজনৈতিক নেতা নন,তিনি ছিলেন এক উন্নয়ন স্থপতি।খাগড়াছড়ির অবকাঠামো, শিক্ষা,যোগাযোগ,স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির প্রতিটি খাতে তাঁর ভূমিকা অনন্য।তাঁর উদ্যোগেই প্রতিষ্ঠিত হয় খাগড়াছড়ি চেম্বার অব কমার্স, যা পার্বত্য ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।স্থানীয় উদ্যোক্তাদের উৎসাহ, যুবকদের কর্মসংস্থান,পাহাড়ি-পাহাড়ি এবং বাঙালি-বাঙালি মেলবন্ধন।সব কিছুতেই তাঁর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য।
ওয়াদুদ ভূইয়া দৃঢভাবে বিশ্বাস করেন,ধর্ম মানুষকে বিভক্ত নয়,বরং ঐক্যবদ্ধ করে।তাঁর নেতৃত্বে খাগড়াছড়িতে গড়ে ওঠে অসংখ্য ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।মসজিদ, মন্দির, কেয়াং, পেগোডা, স্কুল, মাদ্রাসা,যা আজও পাহাড়ে ধর্মীয় সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে টিকে আছে।তিনি নিজেই এসব প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা ও তত্ত্বাবধান করতেন, যাতে সকল সম্প্রদায় শান্তিপূর্ণভাবে নিজ নিজ ধর্মাচার পালন করতে পারে।
৯০-এর দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তিনি ছিলেন সামনের সারির কর্মী।১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য শান্তিচুক্তির বিরোধিতায় বিএনপির লংমার্চে নেতৃত্ব দেন তিনি।তিনি প্রতিষ্ঠা করেন,পার্বত্য চট্টগ্রাম সম-অধিকার আন্দোলন,যা পাহাড়ি-বাঙালি উভয় সম্প্রদায়ের ন্যায় ও সমতার দাবিকে একত্র করেছিল।তার নেতৃত্বেই পাহাড়ে বাঙালি অধিকার রক্ষার আন্দোলন নতুন গতি পায়।তিনি প্রমাণ করেন,শান্তি কোনো পক্ষের একক সম্পত্তি নয়; এটি সকলের অধিকার।
২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতার হলেও জনগণের আস্থা হারাননি ওয়াদুদ ভূইয়া।দীর্ঘ কারাবাস শেষে ফিরে এসে তিনি আরও দৃঢ় মনোবল নিয়ে মাঠে নামেন। বর্তমানে তিনি খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির নেতৃত্বে ৩১ দফা জনকল্যাণমূলক কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছেন।তাঁর ঘোষণা,ক্ষমতায় গেলে আমি কাজ করব সকলের জন্য, ফিরিয়ে আনব ন্যায়, অধিকার ও সম্প্রীতি।
রাজনীতির পাশাপাশি ওয়াদুদ ভূইয়া কাজ করে যাচ্ছেন ওয়াদুদ ভূইয়া ফাউন্ডেশন এর মাধ্যমে।এই ফাউন্ডেশন পাহাড়ে শিক্ষা, চিকিৎসা, দুস্থ সহায়তা, যুব প্রশিক্ষণ ও সামাজিক উন্নয়নে কাজ করছে।
বিশেষত খাগড়াছড়ির প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিনামূল্যে চিকিৎসা ক্যাম্প,দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বৃত্তি এবং দুর্যোগকালীন ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে এই ফাউন্ডেশন।এ যেন রাজনীতির বাইরে আরেক ওয়াদুদ ভূইয়া।এক মানবিক নেতা,এক মানবিক নেতার আসনে অধিষ্ঠিত করে।
ওয়াদুদ ভূইয়ার জনপ্রিয়তা কেবল তার দলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়,তিনি পাহাড়ি-বাঙালি নির্বিশেষে মানুষের ভালোবাসা অর্জন করেছেন।বৃদ্ধ থেকে তরুণ,কৃষক থেকে শিক্ষক,সবার মুখে একটাই কথা,ওয়াদুদ ভাই থাকলে পাহাড়ে শান্তি থাকে।
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ওয়াদুদ ভূইয়ার মনোনয়ন পাহাড়ের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ সৃষ্টি করেছে।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে,ওয়াদুদ ভূইয়া,পাহাড়ের রাজনীতির সেই ব্যালান্সিং ফ্যাক্টর,যিনি পাহাড়ি ও বাঙালির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খাগড়াছড়ি ২৯৮ নং আসনে দল থেকে তাকে মনোনীত করায় তিনি দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া,বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং জাতীয় স্থাীয়ী কমিটির সদস্যদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন তিনি। পাশাপাশি খাগড়াছড়ির সর্বস্থরের নেতাকর্মী এবং শ্রভানুধ্যায়ী ও মাঠে যারা কাজ করছেন সকলকে ধন্যবাদ জানান তিনি।










