যুদ্ধটা শুরু ২০০১ সাল থেকে। ছাত্র জীবনে পরিবারের অমতে নিজের পছন্দে বিয়ে তারপর ফলাফল স্বরুপ বাবা মা হতে বিতাড়িত। অনেক হাত পা ধরে যদিও শশুরালয়ে আশ্রয় মিললো কিন্তু শর্ত হলো তাদের ছেলেকে পড়ালেখার খরচ মেয়ের বাবাকে চালানো লাগবে। মেয়ের বাবা অনিচ্ছা থাকলেও মেনে নিলেন। সাথে তাকেও পড়ালেখা করার জন্য জোড় চালালেন। মেয়েটি তখন এইচ.এস.সি পরীক্ষার্থী। মেয়েটি চিন্তা করলো আমার খরচ সহ আমার স্বামীর খরচ আবার আমার ছোট দুই ভাই বোনের খরচ বাবার জন্য অনেক কষ্ট সাধ্য। তাই অবশেষে মেয়েটি তার স্বামীকে তার ভবিষ্যৎ ভেবে নিজের পড়া বন্ধ রেখে তার পড়ার খরচের ব্যবস্থা করলো। যথারীতি মেয়েটির স্বামী ডিপ্লোমা কমপ্লিট করে ইন্টার্র্নি শেষ করে চাকরীতে ঢুকলো। ২০০৬ সালে মেয়েটির ঘর আলো করে এক ফুটফুটে ছেলে জন্ম নিলো। ফুটফুটে ছেলের জন্মের আগ থেকে শিশুর ৪ মাস বয়স পর্যন্ত সকল দায়িত্ব নিল মেয়েটির বাবা। এরপর হঠাৎ মেয়েটির স্বামী ছেলেসহ নিয়ে গেল তার কর্মস্থলে। ছোট্ট ছেলেটির বয়স যখন ২ বছর হঠাৎ মেয়েটির স্বামী বি.এস.সি পড়ার কথা বলে তাদেরকে তার বাবার বাড়ী পাঠিয়ে দিল। তারপর ছয় মাস পরে ২০০৮ সালে হঠাৎ স্বামী পাঠালো ডিভোর্স লেটার। তখন মেয়েটি পাথর প্রায়। পাথর জীবন থেকে বাস্তবে ফিরতে মেয়েটির কিছু সময় লেগেছিলো। এই সময় মেয়েটির বাবা দিনরাত তার হাত ধরে সাহস, শান্তনা দিতেন আর শক্তি যোগাতেন। তারপর মেয়েটি ২০০৯ সালে একটি রেজিস্টার স্কুলে চাকরী শুরু করেন। যেখানে তাকে কোন পারিশ্রমিক দেওয়া হতো না। দীর্ঘ ২/৩বছর টিউশনি, সেলাই মেশিন ও বুটিকস এর কাজ করে মেয়েটি তার সংসার চালাতো। পাশাপাশি নিজেও উন্মুক্ত কলেজে ভর্তি হয়ে এইচ.এস.সি পড়ার খরচ চালায়। মেয়েটি যে স্কুলে চাকরী করতো সেই স্কুলটি ২০১২ সালের মাঝামাঝিতে এমপিও আর ২০১৩ সালে জাতীয়করণ লাভ করে। এর মধ্যেই মেয়েটি বি.এস.এস ও বি.এড শেষ করে। তারপরে আর মেয়েটিকে পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। এতক্ষন ধরে যে মেয়েটির কথা বললাম সেই মেয়েটি প্রাগপুর পশ্চিমপাড়া গ্রামের মৃত ফরিদ উদ্দিনের মেয়ে মোছাঃ আয়েশা ফেরদৌসী (৩৬)। তিনি বর্তমানে দৌলতপুরের ৯নং মথুরাপুর (পশ্চিম) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। নির্যাতনে বিভিষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যোমে জীবন শুরু করা নারী হিসেবে পেয়েছেন কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জয়িতা সম্মাননা-১৯। গত সোমবার বিকাল সাড়ে ৩টায় দৌলতপুর উপজেলা পরিষদ কনফারেন্স রুমে আলোচনা সভা ও সমাজে বিভিন্ন ক্ষেত্রে আবদান রাখায় তাকে জয়িতা সম্মাননা প্রদান করা হয়। দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোছাঃ শারমিন আক্তারের সভাপতিত্বে উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিনেবে উপস্থিত ছিলেন, দৌলতপুর উপজেলা চেয়ারম্যান এ্যাডঃ এজাজ আহমেদ মামুন। বিশেষ অতিথি ছিলেন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ আজগর আলী ও দৌলতপুর থানার অফিসার ইনচার্জ এস.এম.আরিফুর রহমান। উক্ত অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন, দৌলতপুর মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা রুবি আক্তার। অনুষ্ঠান শেষে নির্যাতনে বিভিষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যোমে জীবন শুরু করা নারী ক্যাটাগরীতে মোছাঃ আয়েশা ফেরদৌসীকে শ্রেষ্ঠ জয়িতা সম্মাননা তুলে দেন অনুষ্ঠানের সভাপতি সহ অন্যান্য অতিথিবৃন্দ। এব্যাপারে মোছাঃ আয়েশা ফেরদৌসী বলেন, আলহামদুলিল্লাহ এখন আমি মোটামুটি একটা পর্যায়ে অবস্থান করছি। তবে আজ আমার এ যুদ্ধে প্রধান সহযোদ্ধা ছিলেন আমার বাবা। তিনি আজ আমার এ জয় দেখার জন্য এ নির্মম পৃথিবীতে নেই। সবাই দোয়া করবেন আমার বাবার জন্য। আর আমি যেন আমার বাবার মতো দায়িত্ব নিয়ে নিজের সন্তানকে সঠিক পথে চালিত করতে পারি।









