বেদনার এক মহাকাব্যের নাম শেখ রাসেল
মনোয়ার হোসেন রতন।
এক সোনালী স্বপ্নের বিমূর্তক প্রতীক শেখ রাসেল (১৮ অক্টোবর ১৯৬৪-১৫ আগষ্ট ১৯৭৫)। আজ হতে অনেকগুলো বছর আগে যে মহান নেতার নেতৃত্বে আমরা বিজয় পতাকা হাতে নিয়ে এগিয়ে এসেছিলাম রাসেল তাঁরই উত্তরাধিকার।যেখানে রোদেলা সকালে শিশির মাখা পায়ে দূরন্ত কিশোরের নকশি উঠোনে খেলা করবার কথা ছিল, যেখানে মহুয়ার মৌ মাখা চাঁদনী রাতে দূরন্ত কিশোরের নিরন্তর পথ চলবার কথা ছিল।এ কারনেই হয়তো মহান আল্লাহপাক রাসেলকে পৃথিবীর আলোয় পাঠিয়েছে হেমন্তের শিশির স্মাত রাতে।জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান এবং বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুলন্নেছার সর্ব কনিষ্ঠ সন্তান।পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি সর্ব কনিষ্ঠ।তাঁর জন্ম দিনের এ দিনটিকে ‘রাসেল দিবস’ হিসেবে গোটা জাতি পালন করছে।বাংলার রাজনৈতিক ভাগ্যাকাশে যখন এক বিশাল ঘনঘটা চলছিল, একদিকে যুদ্ধের উত্তেজনা অন্যদিকে গোটা পাকিস্তান জুড়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ডামাঢোল।প্রেসিডেন্ট প্রার্থী আইয়ূব খান অন্যদিকে সম্মিলিত বিরোধীদলের প্রার্থী কায়দে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ।এ রকম এক পরিবেশে জন্ম নিল শেখ রাসেল।
জগত বিখ্যাত দার্শনিক নোবেল জয়ী ব্যক্তিত্ব বাট্রান্ড রাসেলের নামানুসারেই তাঁর নাম করন করা হয়।উজ্জল, উচ্ছল, দূরন্ত, প্রানবন্ত এ শিশুটির জন্ম সময়ের স্মৃতিকথা লিখতে গিয়ে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘রাসেলের জন্মের আগ মূহূর্ত গুলো ছিল ভীষন উৎকন্ঠার।আমি, কামাল, জামাল, রেহানা, খোকা চাচা বাসায়।বড় ফুফু ও মেঝ ফুফু মার সাথে।একজন ডাক্তার ও নার্স এসেছেন।সময় যেন আর কাটে না।জামাল আর রেহানা কিছুক্ষন ঘুমায় আবার জেগে উঠে।আমরা ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখে জেগে আছি নতুন অতিথির আগমন বার্তা শোনার অপেক্ষায়।মেঝ ফুফু ঘর থেকে বের হয়ে এসে খবর দিলেন আমাদের ভাই হয়েছে।খুশিতে আমরা আত্মহারা।কতক্ষনে দেখবো।ফুফু বললেন, তিনি ডাকবেন, কিছুক্ষন পর ডাক এলো।মাথা ভরা ঘনকালো চুল।তুলতুলে নরম গাল।বেশ বড়সড় হয়েছিল রাসেল’।এদিকে রাসেল পৃথিবীর আলোয় আসল অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে প্রচারনায় অংশগ্রহনের জন্য চট্টগ্রামে অবস্হান করছিলেন।জন্ম সময় থেকেই এ ছোট্ট রাসেলে জীবনের একটা বড় সময় কেটেছে বাবাকে ছাড়াই।বাবার ঠিকানা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার নয়তো ক্যান্টনমেন্ট।এ ভাবেই শিশু রাসেলের দিন গুলো কাটে। কারাগারের রোজনামচায় ১৯৬৬ সালের ১৫ জুনের দিন লিপিতে বঙ্গবন্ধু রাসেলকে নিয়ে লিখেছেন, ১৮ মাসের রাসেল জেল অফিসে এসে একটুও হাসেনা, যে পর্যন্ত আমাকে না দেখে।দেখলাম দূর থেকে পূর্বের মতোই ‘আব্বা-আব্বা’ বলে চিৎকার করছে।
জেল গেট দিয়ে একটা মাল বোঝাই ট্রাক ঢুকেছিল।আমি তাই জানালায় দাঁড়াইয়া ওকে আদর করলাম।একটু পরেই ভিতর যেতেই রাসেল আমার গলাধরে হেসে দিল।ওরা বললো আমি না আসা পর্যন্ত শুধু জানালার দিকে চেয়ে থাকে, বলে ‘আব্বার বাড়ি’।এখন ধারনা হয়েছে এটা আব্বার বাড়ী।যাবার সময় এলে ওকে ফাঁকি দিতে হয়’।
মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পুরো পরিবার যখন পাক বাহিনীর দ্বারা বন্দী, তখন শিশু রাসেলও বন্দী।দীর্ঘ অপেক্ষা, আতংক, দ্বিধা দ্বন্ধের প্রহর কাটিয়ে এলো বিজয়।বাংলাদেশ স্বাধীন।মুক্ত আলো বাতাসে এসে ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর রাসেল বলে উঠলো ‘জয় বাংলা’।এক অবিনাশী স্লোগান, এক সোনালী স্বপ্নের কবিতা উচ্চারনের মধ্য দিয়ে পেল প্রথম স্বাধীনতা, মুক্ত আলো বাতাস।মাত্র ১০ বছর ১০ মাস এ শিশুটির পার্থিব জীবন।অবিনশ্বর আত্মা নিয়ে চলে গেলেন নশ্বর পৃথিবী থেকে।
১৯৭৫ সালে ১৫ আগষ্ট পৃথিবীর ইতিহাসে যে নৃশংস ঘটনা ঘটলো, সেই ঘটনা থেকেও রক্ষা পায়নি শিশু রাসেল।নরপিশাচরা পৈশাচিক হত্যাকান্ডের সময় আতঙ্কিত রাসেল কান্না জড়িতকন্ঠে বলেছিলেন, ‘আমি মায়ের কাছে যাব’ আমাকে হাসু আপা (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা)কাছে পাঠিয়ে দাও’ কিন্তু না, সেই শয়তানের দল তাঁকে বাঁচতে দিলো না।ওরা তাঁকে হত্যা করলো।কি নির্মম, কি লজ্জার, কি ঘৃনার, কি যাতনার, কি দুঃখের এ দায়ভার আমাদেরকেই বহন করতে হবে।ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরী স্কুল এন্ড কলেজের ৪র্থ শ্রেনীর এ ছাত্রটি ছিলো বঙ্গবন্ধু পরিবারের আনন্দের মধ্যমনি।আহা, আজ যদি রাসেল বেঁচে থাকতো! দেশী-বিদেশী চক্রান্তে নরঘাতকেরা হত্যা করলো বঙ্গবন্ধু পরিবারের সকল সদস্যকে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা প্রবাসে থাকার কারনে ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছেন।আসলে ওরা জাতির পিতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে বিনাশ করতে চেয়েছিল বাঙ্গালী জাতিসত্ত্বাকে।শিশু রাসেলকে হত্যার মধ্যে দিয়ে ওরা রোধ করতে চেয়েছিলো বাঙ্গালী জাতির বিকাশ।ভয়ংকর এক মৃত্যু উপত্যকা থেকে আমরা তাঁরই বড়বোন, বঙ্গবন্ধুর আদরের প্রিয়তম সন্তান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে সোনার বাংলা নির্মানের প্রত্যয় নিয়ে অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় এগিয়ে চলছি।প্রামান্য চিত্র ‘হাসিনা অ্যা ডটারস টেল’ এ ছোট্র আদরের এ ভাইকে নিয়ে তিনি বলেন, ‘রাসেল হওয়ার পরে আমরা ভাই বোনেরা খুব খুশি হই।যেন খেলর পুতুল পেলাম হাতে।ও খুব আদরের ছিল আমাদের।একটা ব্যক্তিত্ব নিয়ে চলতো।ওইটুকুএকটা মানুষ কি স্ট্রং পার্সোনালিটি’।
আকাশে সবচেয়ে দূরের যে তারাটির দীপ্তি চোখের জল কনার মত জ্বল জ্বল করে
সেই তারাটি শহীদ শেখ রাসেল।মৃত্যুর হিমশীতল বাহুকে আলিঙ্গন করে বনানী কবরস্হান থেকে এখন উর্ধ্বলোকে না ফেরার দেশ থেকে আমাদের দেখছে।কানপেতে শুনলে এখনো শুনা যায়, মৃত্যুহীন প্রানের এক আওয়াজ।আমাকে হাসু আপার কাছে পাঠিয়ে দাও!
রাসেল, তোমাকে একটা খোলা চিঠির মাধ্যমে জানিয়ে দেই, ভয়ংকর এক দুঃসময় থেকে আমরা তোমার হাসু আপার হাত ধরে এক স্বপ্নের বাংলাদেশ নির্মানের কাছে প্রায় পৌঁছে গেছি।যেমন ধর, ২০৩৫ সালে আমরা ২৫ তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশে উপনীত হব।আমাদের দারিদ্র্যের হার কমেছে প্রায় ২১.৮ শতাংশ, গড় আয়ু বৃদ্ধি হয়েছে ৭২.৩ বছর, শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার হার এখন ১৮.৬ শতাংশ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা এখন ২২,৫৬২ মেগাওয়াট, আইসিটিতে রপ্তানী থেকে আয় হচ্ছে প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছে দেশের চুরানব্বই শতাংশ জনগন, রপ্তানী আয় ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, রেমিটেন্স বাড়ছে, বিশ্বের ৫৭ তম দেশ হিসেবে আমরা মহাকাশে ‘বঙ্গবন্ধু ১’ স্যাটেলাইট পাঠিয়েছি, খাদ্য উৎপাদনের পরিমান ৪ কোটি মেট্রিকটন ছাড়িয়ে গেছে, ধান উৎপাদনে আমরা বিশ্বে চতুর্থ, মাছ উৎপাদনে তৃতীয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন ৩৩ বিলিয়ন ডলারের উপরে, বৈদেশিক বিনিয়োগ ৩৬০ কোটি ডলার, লিঙ্গ বৈষম্য, ইমাজেন্সি সার্ভিস, মাথাপিছু আয় সহ সব ক্ষেত্রেই উন্নয়ন অব্যাহত।পদ্মা বহুমুখী সেতু, সেতুতে রেল লাইন, ঢাকা মেট্রোরেল, দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু থেকে ঘুমধুম পর্যন্ত রেললাইন, রুপগঞ্জ পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎ, এলএনজি টার্মিনাল, কয়লা ভিত্তিক রামপাল থার্মাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পায়রা বন্দর নির্মান, সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মান সহ নানা উন্নয়ন উন্নতির প্রকল্প গুলোর কাজ শেষ হয়ে আসছে প্রায়।অবকাঠামোগত, প্রযুক্তিগত, ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মান থেকে শুরু করে এমন কোন ক্ষেত্র নেই যেখানে তোমার প্রিয় হাসু আপার সাফল্য নেই।তোমাকে আমরা হাসু আপার সাথে রাখতে না পারলেও আমরা আছি তোমার প্রিয় এ বড় আপার সাথে।তুমি শান্তিতে ঘুমাও।যে অপুর্নতা নিয়ে তুমি ওপারে গেলে, তোমার সাধ স্বপ্ন পূরনে আমরা জেগে আছি বাংলাদেশে।এ কারনেই তোমার খুনিদের বিচার হয়েছে, শাস্তি হয়েছে।পরিশেষে সুনিলের কবিতা ‘শিশু রক্ত’ দিয়েই এ বেদনার মহাকাব্য লেখা শেষ করছি,
‘তুই তো গল্পের বই, খেলনা নিয়ে
সবচেযে পরিচ্ছন্ন বয়সেতে ছিলি!
তবুও পৃথিবী আজ এমন পিশাচি হলো
শিশু রক্ত পানে তার গ্লানী নেই?
সর্বনাশী, আমার ধিক্কার নে!
যত নামহীন শিশু যেখানেই ঝরে যায়
আমি ক্ষমা চাই, আমি সভ্যতার নামে ক্ষমা চাই।







