এম দুলাল আহাম্মেদ,গুইমারা(খাগড়াছড়ি)প্রতিনিধি:
দেশের মুল ভূখন্ডের সাথে অবিচ্ছেদ্য ৫,০৯৮ বর্গমাইল আয়তনের
৩টি জেলার সমন্বয়ে গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাসহ ১১টি
ভাষাভাষির ১১টি ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীসহ ১২টি সম্প্রদায়ের বসবাস।
এখানে বসবাসরত সকলের সম্মিলিত প্রধান উৎসব
বৈসাবিন।বৈসাবিনকে ঘিরে অন্যান্য বছরের মতো এবারো
পাহাড়ে শুরু হয়েছে উৎসবের আমেজ। চৈত্রের শেষ দুদিন এবং
পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষকে ভিন্নরুপে উদযাপন করে
পার্বত্যাঞ্চলের মানুষ।বাংলা নববর্ষ বিদায় এবং বর্ষবরণের মহান
উৎসব উপজাতীয়দের প্রাণের উৎসব এ বৈসাবি উৎসব। চাকমাদের
ভাষায় এ উৎসবকে বিঝু, ত্রিপুরাদের ভাষায় বৈসুক, মারমাদের ভাষায়
সাংগ্রাইং, তংচঙ্গাদের ভাষায় বিষু ও অহমীয়দের ভাষায় বিহু নামে
আখ্যায়িত করা হয়। এছাড়া ম্রো সম্প্রদায়রা “ক্লবং পাই”
নামে উৎসবটিকে পালন করে।পাহাড়ের চাকমা,মারমা ও
ত্রিপুরা,প্রধান তিন সম্প্রদায়ের নিজ নিজ উৎসবের নামের প্রথম
অক্ষর নিয়ে প্রাণের এ উৎসবকে বলা হয়
বৈসাবি”।“বৈসাবী”পার্বত্যাঞ্চলে এ নামটি বহুল পরিচিত ও
আলোচিত।আর কিছু বছর যাবৎ বাঙালিদের উৎসব নাববর্ষ’র
প্রথম বর্ণ যোগ করে বৈসাবি-কে “বৈসাবিন” হিসেবে
উল্লেখ করা হয়ে থাকে।তিনদিনব্যাপী এ উৎসবের প্রথম দিনকে
চাকমা ভাষায় ফুলবিঝু দ্বিতীয় দিনকে মূলবিঝু এবং তৃতীয়
দিনকে নুয়াবঝর বা গেজ্যা পেজ্যা দিন বলা হয়। এভাবেই ত্রিপুরারা
প্রথম দিনকে হারিকুইসুক দ্বিতীয় দিনকে বুইসুকমা এবং
তৃতীয় দিনকে বিসিকাতাল নামে অভিহিত করে থাকে।সেই
সাথে বাংলা নববর্ষকে বরণে ১লা বৈশাখ বাঙ্গালীরাও পান্তা-ইলিশ,
বাঙ্গালী সংস্কৃতির সাজে সজ্বিত শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে দিনকে
বরণ করতে ভুল করেন না।বৈচিত্রময় আয়োজনে বর্ষবরণে
খাগড়াছড়ির পাহাড়ি পল্লীগুলোতে নানা প্রস্তুতি চলছে।
আর এ উৎসবে সামিল হতে আগে থেকেই যাতায়াত ও থাকার
ব্যবস্থা করে রাখে পর্যটকরা।খাগড়াছড়ির হোটেল-মোটেল
কিংবা পরিবহনের সিট ইতমধ্যেই বুকিং শুরু হয়ে গেছে।
প্রতিবছর বৈসাবী আমেজ উপভোগ করতে দেশ-বিদেশের লাখ
পর্যটকের আগমন ঘটে খাগড়াছড়ির সবুজ পাহাড়ে। তবে
হোটেল-মোটেলে সিট না পেয়ে শেষ পর্যন্ত এসব পর্যটকের
আশ্রয় মিলে উপজাতীদের মাচাং ঘরে।১২ এপ্রিল ভোরে
সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে নদীতে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয়ে
তিনদিনের বৈসাবি উৎসব, চলবে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত । তবে
কোথাও কোথাও এ উৎসব আরও দুদিন চলবে।
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ ও জেলা-উপজেলা প্রশাসনের
বাইরেও স্থানীয় পাহাড়িরা নিজেদের মতো করে বৈসাবি
উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।অন্যদিকে প্রতিবারের ন্যায় এবছরও
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ সম্মিলিতভাবে বৈসাবি
উদযাপন করবে।বরাবরের মতোই এ বছরও ১১ এপ্রিল সকালে জেলা
পরিষদ প্রাঙ্গণ থেকে বৈসাবি শোভাযাত্রা শুরু হয়ে খাগড়াছড়ি
সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে গিয়ে শেষ হবে। খাগড়াছড়ি জেলা
প্রশাসন, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠি সাংস্কৃতিক ইন্সটিটিউটও
পাহাড়ে ভিন্ন আমেজের সঙ্গে নতুন বছরকে বরণের প্রস্তুতি
নিয়েছে।প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেয়া প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা
ব্যবস্থাও।বৈসাবি উৎসবের সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি
নারীদের গৌরবোজ্জল ইতিহাস জড়িয়ে আছে। তাই উৎসবের
প্রতিটি পর্বে নারীর পুর্বাপর ভূমিকার বিষয়টি মাথায় রেখে
নারীদের জন্য ঐতিহ্যবাহী খেলাধূলা ও বয়নসহ নানা
প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে বলে জানা গেছে।
বৈসাবীকে সামনে রেখে এরই মধ্যে জেলা ও উপজেলা শহরের
পাশাপাশি বিভিন্ন হাট-বাজারগুলোতে বেচাকেনার ধুম পড়েছে।
বিভিন্ন শ্রেণী-বয়সের নারী-পুরুষ পাঁচন, শুটকি এবং নতুন
কাপড় কিনতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে দোকানগুলোতে। আর বৈসাবী
উপলক্ষে ব্যস্ততা বেড়েছে ছোটবড় দোকানীদেরও। বৈসাবী উৎসব ও
বাংলা নববর্ষকে সামনে রেখে বিপণি বিতান গুলোতে এখন
পাহাড়ীদের পাশাপাশি বাঙ্গালী তরুণীদেরও উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা
যাচ্ছে।বাঙ্গালীরাও পাহাড়িদের সাথে একাকার হয়ে মিশে যাবে
প্রানের উৎসবে। পাহাড়ীদের সাথে পাল্লা দিয়ে বাঙ্গালী বধুরাও
পান্তা ইলিশ রান্নায় পিছিয়ে থাকবে না।যেন একই আলো, একই
আবেদন, একই চিন্তা চেতনায় উদ্দীপ্ত এক অনুষ্ঠানে যোগ হল
বাঙ্গালীদের (বড়–য়া, হিন্দু, মুসলিম) পহেলা বৈশাখ। শহর থেকে
প্রত্যান্ত অঞ্চলে ক্ষুদ্র- নৃগোষ্ঠী এই আনন্দটা পার্বত্য এলাকায়
এখন পাহাড়ী বাঙ্গালী মানুষের ঘরে ঘরে বর্ষবরন ও বর্ষবিদায়
উৎসবের আনন্দের বন্যা বইতে শুরু করেছে।
প্রতি বছর বৈসাবি উৎসব আসে। পাহাড়ে ছড়িয়ে পড়ে প্রাণের
ছোয়া। নব আনন্দে জাগে পাহাড়ের উপজাতীয়রা। পার্বত্যাঞ্চলজুড়ে
শুরু হয় এক মহামিলন মেলায়।যা এ অঞ্চলের পাহাড়ী-বাঙ্গালীদের নতুন
বছরের নতুন গানে সকল অন্ধকার কে ডাকা দিয়ে সকল সম্প্রদায়ের
মাঝে শান্তির বার্তা নিয়ে আসবে এবং দেশের বৈচিত্রময়
সংস্কৃতি সংরক্ষনে ও সংস্কৃতির ভান্ডারকে সমৃদ্ধকরণে এ উৎসব
আরো অধিক ভূমিকা রাখবে এমনাটাই কামনা এ অঞ্চলের
বসবাসকারী শান্তীকামি সকল মানুষের।









