রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার প্রেমতলীর ঐতিহ্যবাহী খেতুরধামে শুরু হয়েছে বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম বৃহৎ উৎসব, শ্রী নরোত্তম দাস ঠাকুরের তিরোভাব মহোৎসব।
শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া এই উৎসবে দেশ-বিদেশ থেকে আসা লাখো ভক্তের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে খেতুরিধাম। উৎসবকে কেন্দ্র করে নেওয়া হয়েছে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা, মোতায়েন করা হয়েছে ৫০০ পুলিশ সদস্য।
বাংলা কার্তিক মাসের প্রথম তিন দিন ধরে চলা এই মহোৎসবের মূল আকর্ষণ ভক্তদের নাম প্রার্থনা, অষ্টপ্রহর কীর্তন, এবং প্রসাদ গ্রহণ। বৈষ্ণব ধর্মাচারে বিশ্বাসী সন্ন্যাসভক্তরা এই সময়ে নরোত্তম দাস ঠাকুরের জীবন ও আদর্শ স্মরণ করেন। উৎসবের তৃতীয় দিন অর্থাৎ ৩ তারিখে ভক্তরা গঙ্গাস্নান এবং দীর্ঘ প্রার্থনার মধ্য দিয়ে মহোৎসবের সমাপ্তি টানবেন।
তিরোভাব উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরের মতো এবারও বসেছে এক বিশাল মেলা। এই মেলায় ধর্মীয় উপকরণ থেকে শুরু করে সৌখিন ও বাহারী খাদ্য সামগ্রী, পোশাক, ব্যবহার্য, গৃহস্থালি, কারু-চারু, কামার-কুমারের তৈরি পণ্যসহ সব ধরনের সমাহার রয়েছে। খেতুুরি মেলা মূলত সন্ন্যাসীদের মেলা হলেও, এখানে অহিংসা ও মানবপ্রেমে বিশ্বাসী অন্য ধর্মের অনুসারীরাও ভিড় জমান।
খেতুরিধামের ট্রাস্টি বোর্ডের সম্পাদক শ্যামাপদ সান্যাল বলেন, শত শত বছর ধরে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ উৎসব হয়ে আসছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ছাড়াও সুসলিমসহ অন্যান্য ধর্মের মানুষও এখানে আসেন। এবারও বর্তমান ট্রাস্টি বোর্ডের ব্যবস্থাপনায় এবং প্রশাসনের সর্বাত্মক সহযোগিতায় সুষ্ঠুভাবে তিরোভাব মহোৎসব সম্পন্ন হবে বলে আশা করছি।
গোদাগাড়ীর ইউএনও ফয়সাল আহমেদ জানান, ঐতিহ্যবাহী এ উৎসবটি যেন যথাযথ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে এবং সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয় সেজন্য গোদাগাড়ী উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুুতি রয়েছে। এছাড়া জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশের সার্বিক নির্দেশনা ও সর্বাত্মক সহযোগিতাও রয়েছে আমাদের সাথে।
নরোত্তম দাস ঠাকুর ছিলেন অহিংসার একজন মহান সাধক। ১৫৩১ খ্রিস্টাব্দে রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার প্রেমতলী পদ্মাতীরের গোপালপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। সনাতন হিন্দু বৈষ্ণব ধর্ম প্রচার করতে গিয়ে সমাজে সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা ও মানবসেবার কাজ করেছেন তিনি। ১৬১১ খ্রিস্টাব্দে প্রেমতলী খেতুরধামে তিনি দেহত্যাগ করেন।
নরোত্তম দাস ঠাকুরের বাবা ছিলেন জমিদার কৃষ্ণনন্দ দাস মজুমদার। ধনী বাবার একমাত্র সন্তান হওয়া সত্ত্বেও ঐশ্বর্য তার জীবনে বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলতে পারেনি। তিনি ছোটবেলা থেকেই ধর্মপরায়ণ, সংসার বৈরাগী ও উদাসীন প্রকৃতির ছিলেন। ঠাকুর নরোত্তম দাসের বৈষ্ণব ধর্ম প্রচার, সমাজ সংস্কার ও মানবসেবার কাছে সমাজের ধনী, ভূ-স্বামী, দুর্দান্ত নরঘাতক, ডাকাত সবাই তার পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়েছিলেন। জীবদ্দশায় নরোত্তম দাস নিজ গ্রাম গোপালপুরের সন্নিকটে খেতুরীতে আশ্রম নির্মাণ করে ধর্মসাধনায় নিয়োজিত ছিলেন। এখানে তিনি প্রায় সাধারণ বেশে অবস্থান করেছিলেন। বাবার অনুরোধ উপেক্ষা করে, বিলাস পরিত্যাগ করে তিনি স্থানীয় কৃষ্ণমন্দিরে প্রায় সন্ন্যাসীর জীবনযাপন করেছিলেন।









