রাজশাহী অঞ্চলে অপার সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে ভিনদেশি ‘ড্রাগন ফল’। কৃষকদের আশা জাগাচ্ছে এই ফলটি। ড্রাগন ফল চাষ করে ভাগ্যবদল হয়েছে বরেন্দ্র অঞ্চলের বহু কৃষকের। ফলটি দেখতে অনেক সুন্দর। সুস্বাদু। মানে ভালো। বাজারে চাহিদাও প্রচুর। বেশি দামে বিক্রি হওয়ায় বরেন্দ্র অঞ্চলের চাষিরা এখন ড্রাগন চাষে ঝুঁকে পড়েছেন। পানি কম ও সেচ খরচ না থাকায় ড্রাগন চাষে চাষিদের আগ্রহ বাড়ছে এই অঞ্চলে। সময় বেশি লাগলেও কৃষকরা অল্প পুঁজি বিনিয়োগ করে অধিক লাভবান হচ্ছে ড্রাগন ফল চাষে। এতে তাদের অভাব মোচন হওয়ায় জনপ্রিয় এই ফলটি বাণিজ্যিকভাবে চাষে আগ্রহ বেড়েছে।
২০০৫ ও ২০০৬ সালে ড্রাগন ফল প্রথম আমদানি করা হয়। সে সময় চড়া দামে বিক্রি হতো এই ফল। এই ফল থাইল্যান্ড, ফ্লোরিডা ও ভিয়েতনাম থেকে নিয়ে আসা হতো। কিন্তু এর এক দশক পর থেকে দেশেই চাষ হচ্ছে এই ফল। এখন বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বাজারে সহজলভ্য এই ফল।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, ড্রাগন হলো ক্যাম্প প্লান্ট জাতীয় ফসল। আর ক্যাম্প প্লান্টের বৈশিষ্ট্য হলো- এই জাতীয় ফসল মরুভূমির মধ্যেও বেঁচে থাকে। পানির তেমন প্রয়োজন হয় না। ড্রাগন ফল প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করে বেঁচে থাকে। তাই বরেন্দ্র অঞ্চলের শুষ্ক জমিতে দিন দিন ড্রাগন ফল চাষ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। রাজশাহী জেলার কমবেশি সব উপজেলাতেই ড্রাগন ফল চাষ হচ্ছে। বর্তমানে রাজশাহীর নগরীর বাসিন্দারা সখের বসে অনেকে ছাঁদে ড্রাগন ফল চাষ করেছেন।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, ড্রাগন গাছের কোনো পাতা নেই। এটা এক ধরনের ক্যাকটাস জাতীয় গাছ। তবে এই গাছে ফুল ধরে। ফুল থেকেই হয় ড্রাগন ফল। ফলের গাছ সাধারণত দেড় থেকে আড়াই মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। একটি ফলের ওজন কমপক্ষে ১৫০ থেকে ৬০০ গ্রাম পর্যন্ত হয়। এর বীজগুলো খুবই ছোট, কালো ও নরম।
রাজশাহী বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর থেকে জানা যায়, প্রতি বছরে এর চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২২-২৩ অর্থ বছরে রাজশাহী জেলায় ২১৪ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছিল ড্রাগন। এর উৎপাদন হয়েছে ৪ হাজার ৪১৮ মেট্রিক টন। নাটোর জেলায় ১৩৪ হেক্টর জমিতে চাষ হয়ে উৎপাদন হয়েছে ১ হাজার ৫৪৫ মেট্রিক টন। নওগাঁ জেলায় ৪৫ হেক্টর জমিতে চাষ হয়ে উৎপাদন হয়েছে ৩৬০ মেট্রিক টন। চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৭ দশমিক ৫ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েঠে উৎপাদন হয়েছে ৩২৫ মেট্রিক টন।
২০২১-২২ অর্থ বছরে রাজশাহী জেলায় ৫৭ হেক্টর জমিতে চাষ হয়ে ড্রাগন ফল উৎপাদন হয়েছে ৬৮৮ মেট্রিক টন। নাটোর জেলায় ৬৫ হেক্টর জমিতে চাষ হয়ে উৎপাদন হয়েছে ৫৫২ মেট্রিক টন। নওগাঁ জেলায় ২৬ হেক্টর জমিতে চাষ হয়ে উৎপাদন হয়েছে ২২০ মেট্রিক টন। চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১৩ হেক্টর জমিতে চাষ হয়ে উৎপাদন হয়েছে ২৩৪ মেট্রিক টন।
২০২০-২১ অর্থ বছরে রাজশাহী জেলায় ২৭ হেক্টর জমিতে চাষ হয়ে ড্রাগন ফল উৎপাদন হয়েছে ৩২৪ মেট্রিক টন। নাটোর জেলায় ৪০ হেক্টর জমিতে চাষ হয়ে উৎপাদন হয়েছে ৬৪০ মেট্রিক টন। নওগাঁ জেলায় ২২ হেক্টর জমিতে চাষ হয়ে উৎপাদন হয়েছে ১০৮ মেট্রিক টন। চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১৪ হেক্টর জমিতে চাষ হয়ে উৎপাদন হয়েছে ২ মেট্রিক টন।
গোদাগাড়ী উপজেলার ড্রাগনচাষি শরিফুল ইসলাম বলেন, বেশ কয়েক বছর থেকে এই ফল চাষ করে আসছি। এবছরে আবারও শুরু হয়েছে চাষ করা। এবার ২৭ একর জমিতে ড্রাগনের চাষ করা হবে। এর চাষ প্রতিবছর বাড়ানো হচ্ছে। স্বল্প খরচে অধিক লাভের কারণে এর চাষ বাড়ছে। ড্রাগন যেন দ্রুত ফল দেয় এজন্য তাদের আলোর প্রয়োজন হয়। তাদের ২০ ঘণ্টায় একদিন বোঝানো হয়।
রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণের অধিদফতরের উপ-পরিচালক মোজদার হোসেন বলেন, রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে সবচেয়ে বেশি চাষ হচ্ছে ড্রাগন ফলের। এ এলাকাকে পোড়ামাটির অঞ্চল বলা হয়। এ উপজেলায় এই মৌসুমে ড্রাগন চাষ হয়েছে ১৯০ হেক্টর জমিতে। এ অঞ্চলের আবহাওয়া ও মাটির ধরন ড্রাগন চাষের জন্য বেশ উপযোগী। উৎপাদন বেশি ও চাষাবাদে খরচ কম হওয়ায় এর চাষ বাড়ছে।
রাজশাহী বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক শামসুল ওয়াদুদ বলেন, বরেন্দ্রভূমিতে ড্রাগন চাষ বেশ লাভজনক। ড্রাগন হচ্ছে মরুভূমি এলাকার ফল। এদিক থেকে রাজশাহী অঞ্চলের মাটি অধিকাংশ সময় খরায় শুষ্ক থাকে। ড্রাগন চাষ সহজসাধ্য ও চাষে খরচও কম হয়। এর ফলে পোকামাকড় কম আক্রমণ করে আবার অতি বৃষ্টিতেও এর ক্ষতি হয় না। একারণে আগের চেয়ে বর্তমানে এই ফলটির চাষ বেড়েছে। কাজেই এ অঞ্চলে ড্রাগন চাষ লাভজনক।









