নদীই ছিল তাদের ঘর, আর নৌকাই ছিল স্থায়ী ঠিকানা। কিন্তু কালের আবর্তে এবং আধুনিকতার ছোঁয়ায় লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ থেকে হারিয়ে গেছে ঐতিহ্যবাহী ভাসমান বেদেপল্লি। একসময় উপজেলার বিভিন্ন নদী ও খালের ঘাটে নোঙর করে থাকা সারি সারি বেদে বহর দেখা গেলেও, বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির বিকাশ আর নদী-নাব্যতা সংকটে এই চেনা দৃশ্যপট এখন অতীত।
নদী ও নৌকার মায়াজাল ছিন্ন: শত বছর ধরে যাযাবর এই জনগোষ্ঠীর মানুষেরা নৌকার ওপরই সংসার সাজাতেন। জন্ম, বিয়ে থেকে শুরু করে জীবনের শেষ বিদায়—সবই সম্পন্ন হতো বহর বেঁধে থাকা নৌকার ছোট কামরায়। রামগঞ্জের প্রধান খাল ও নদীগুলোর তীরে বেদেদের এই নৌকার বহর গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অনন্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে নদী ও খালের নাব্য হ্রাস এবং পানির প্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে নৌকার চলাচল যেমন সীমিত হয়েছে, তেমনি কমে গেছে তাদের চিরাচরিত জীবনধারণের সুযোগ।
পেশা বদল ও জীবিকার সংকট: একসময় বেদেপল্লির নারীরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে সাপ খেলা দেখানো, সাপের বিষ নামানো, সিঙা লাগানো এবং বিভিন্ন ভেষজ শিকড়-বাকড় ও তাবিজ-কবচ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রসার এবং অন্ধবিশ্বাস দূর হওয়ার ফলে সাধারণ মানুষের কাছে তাদের এসব বিদ্যার কদর কমে গেছে। জীবিকার তাগিদে এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষেরা বাধ্য হয়ে পূর্বপুরুষের পেশা ছেড়ে অন্য কাজের দিকে ঝুঁকছেন।
স্থায়ী আবাসন ও মূলধারায় ফেরা: নৌকায় জীবনযাপনের তীব্র সংকট এবং সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এই ভাসমান বেদে পরিবারের অনেকেই এখন যাযাবর জীবন ছেড়ে ডাঙায় স্থায়ী বসতি গড়ছেন। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে তাদের মূলধারার সমাজে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া চলায় অনেকেই এখন রিকশা চালানো, দিনমজুরি কিংবা ছোটখাটো ব্যবসার সাথে যুক্ত হচ্ছেন। বেদে শিশুদের শিক্ষা ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বার্থে এই পরিবর্তন ইতিবাচক হলেও, এর মাধ্যমে হারিয়ে গেল নদীমাতৃক বাংলার এক প্রাচীন রঙিন ঐতিহ্য।
একসময় রামগঞ্জের সোনাপুর খালসহ বিভিন্ন নদী ও জলাশয়ের ঘাটে তাবু টাঙিয়ে কিংবা দলবদ্ধ নৌকায় থাকা বেদে পরিবারের দেখা মিলত বছরের একটা বড় সময়। কিন্তু জীবিকার তীব্র সংকট আর সন্তানদের অন্ধকারের জীবন থেকে আলোর পথে আনার ব্যাকুলতায় এই যাযাবর জনগোষ্ঠী এখন ছাড়ছে নদীর মায়া।
প্রশাসনের ভাবনা ও পুনর্বাসনের আশ্বাসঃ রামগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা অফিসার আনোয়ার হোসেন এ বিষয়ে বলেন, “বেদে জনগোষ্ঠী আমাদের সমাজেরই একটি অংশ। সরকার তাদের জীবনমান উন্নয়নে অত্যন্ত আন্তরিক। তারা যদি যাযাবর জীবন ছেড়ে স্থায়ীভাবে রামগঞ্জে বসবাস শুরু করে, তবে তাদের সমাজসেবা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কর্মমুখী প্রশিক্ষণ, বিশেষ ভাতা এবং ক্ষুদ্র ঋণের আওতায় এনে পুনর্বাসনের জন্য সব ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা প্রদান করা হবে।
রামগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) কাজী আতিকুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, “বেদে সম্প্রদায় এবং তাদের ভাসমান জীবনযাত্রা আবহমান গ্রামবাংলার সংস্কৃতিরই একটি বৈচিত্র্যময় অংশ। কালের বিবর্তনে “গ্রামীণ সংস্কৃতির এই ঐতিহ্যবাহী অংশটি হারিয়ে যাওয়া দুঃখজনক হলেও, তাদের স্থায়ী আবাস গড়ে তোলার সিদ্ধান্তকে আমরা সাধুবাদ জানাই। যাযাবর জীবনের কারণে তাদের সন্তানরা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হচ্ছিল। সমাজে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।









