, , ,

শিরোনামঃ-




পরকীয়া ও ভবিষ্যত: আদিল মাহমুদ

নয়া আলো অনলাইন ডেস্ক।

আপডেট টাইম : জুন ০৮ ২০২০, ০৮:৪৩ | 1055 বার পঠিত | প্রিন্ট / ইপেপার প্রিন্ট / ইপেপার

“পরকীয়া ও ভবিষ্যত”

 

নারী মমতাময়ী, নারী-ই সর্বজননী,

নারী দেবী,নারীই আবার মহারানী

নারী ধন্য, দু’একজন হয় বিচ্ছিন্য,

নারী হচ্ছে মঙ্গল, একজন জঘন্য।

 

বোকা সহজ সরল একটি ছেলের নাম মতি, এখন ঘুমিয়ে আছে স্বর্গে। তার আপনজন কর্তৃক প্রতারনা তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। তাই মতির কাছে মেয়ে মানুষ সারাজীবন জঘন্যতম হলেও মেয়ে মানুষ সত্যিই বাঁচার তরনী। ফলে, একজনের ভুলকে কেন্দ্র করে দশকে ভুল বুঝা সঠিক হবে না।

 

আমার এই লিখার প্রধান চরিত্র মতি। যার অকাল মৃত্যু যে কোন মানুষের মনকেই নাড়া দেবে। কারণ, ঘটনাটি সম্পূর্ন সত্য, বাস্তব ও হৃদয় বিদারক একটি দীর্ঘ্য নিশ্বাস।

** কবি শংকরের উক্তিই মতির জন্য প্রযোজ্য। কারণ, মতি যৌবনেই তার বউ, সন্তান ও নিজের প্রাণকে হারিয়েছিল।

** কবি লিখেছেন “যৌবনে যার প্রেম হল না তার জীবন বৃথা”

 

মতি, বাবা- মায়ের ছোট ছেলে, বয়স ২২ বৎসর। জন্মের পর থেকেই সে একটু বোকা স্বভাবের ছিল। সবই বুঝতো, পড়া শুনা করতো, বাজার করতো, মা- বাবার কথা শুনতো, এমন কি বিয়ে করতে হবে তাও বুঝতো। কিন্তু ফাঁকি বা ছলনা কি এটা সে বুঝতো না, সবাইকেই বিশ্বাস করতো।

 

একদিন ঘটক মতির বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এলো। মতির তেমন ইচ্ছা ছিল কিনা বুঝা না গেলেও বাবা/মার খুব ইচ্ছে মতিকে বিয়ে করানো। ঘটক বললো, মেয়ে অনেক সুন্দরী মতির সাথে বিয়ে হলে দু’জনকে ভালোই মানাবে। মতি বোকা হলে কি হবে দেখতে কিন্তু সুন্দরই ছিল! পাশের গ্রামেই মেয়ের বাড়ি। তাই, দিনক্ষন ঠিক হলো মেয়েকে দেখতে যাওয়ার। কথা মতোই কাজ হলো, ফাল্গুন মাসের ১১ তারিখ মতি, বড় ভাই আবুল, বাবা/মা ও বোনকে নিয়ে মেয়েকে দেখতে মেয়ের বাবার বাড়ি গেলো। নিয়ম মাফিক আপ্যায়ন শেষে মেয়েকে ঘোমটা পড়া অবস্থায় নিয়ে এলো। এখানে উল্লেখ্য যে, মতি কিন্তু ক্লাশ নাইন পর্যন্ত পড়ে ছিল আর পাত্রী কল্পনা এইচ.এস.সি পাস করা। ঘোমটার নীচ থেকেই কল্পনা মতিকে দেখে পছন্দ করে ফেললো। এবার মতির পালা, সবাই জোর করে পাত্রীর ঘোমটা সরিয়ে মতিকে সহ সবাইকে দেখালো। এক পলকেই কল্পনাকে মতির পছন্দ হয়ে গেলো। এই ব্যাপারটা কারো আর বুঝার বাকী রহিলনা।

 

অত:পর আগামী মাসের ২০ তারিখ বিয়ের দিন ধার্য্য হলো। সাধ্যমতো অনুষ্ঠান ও দাওয়াত করে মধ্যবিত্ত সংসারের মতো বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলো এবং বউ নিয়ে মতি বাড়ি ফিরলো। মতি ও কল্পনা দু’জনেই দুইজনকে ভালবাসতো। সুখের সংসার ছিল তাদের, এরই মাঝে তাদের একটি কন্যা সন্তান জন্ম হলো বয়স ৩ বৎসর।

 

এভাবে সুখের সংসার চলা অবস্থায় পাশের বাড়ির মতির জ্যাঠাতো ভাই কালামের সাথে মতির বউয়ের পরিচয় হয়। কালাম আত্মীয়তার সুবাদে প্রায়শ:ই মতির বাড়িতে আসতো। কালাম ছিল বিবাহিত, তার দুই ছেলে ও ২ মেয়ে। কালামের বউ সম্পা ও অনেক লক্ষী ছিল। স্বামীর সেবা যত্নে তার কোন অবহেলা ছিল না। ওদেরও সুখের পরিবার ছিলো। সম্পাও মতিদের বাড়িতে আসা-যাওয়া করতো। কোন দিক দিয়েই দুই সংসারে কোন অসহযোগিতা ছিলো না। তাই, কালামের মতির বাড়িতে আসা নিয়ে সম্পা কোনো কিছুই মনে করতো না। কিন্তু মানুষের মন বলে কথা, এ আসা- যাওয়ার মধ্যেই কালামের কু-দৃষ্টি পড়লো মতির বউ কল্পনার উপর। কল্পনা প্রথম প্রথম কিছু বঝতে পারে নাই। আর, মতি বোকার তো বুঝার ক্ষমতা-ই নাই! একদিন দু’দিন করে কালাম বিভিন্ন অজুহাতে কল্পনাকে পছন্দ করে মর্মে এটা সেটা উপহার দিতো। মাঝে মধ্যে বাজার থেকে ফুল, কানের দুল ইত্যাদি এনে দিতো। কল্পনাও প্রথম প্রথম সরল বিশ্বাসে নিতো। পরবর্তীতে যখন কল্পনা পুরো পুরি বুঝতে পারলো তখন স্বামীর কথা ভেবে কালামকে এ ধরনের কাজ আর না করতে বললো। কিন্তু কালাম কিছুইতে বারণ মানলো না। কল্পনাও, স্বামী মতি বোকা ভেবে সব গোপন রাখলো। এ ভাবে বছর খানেক চলার পর কালাম এর অনুনয়- বিনয়ে কল্পনা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। কল্পনার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই আস্তে আস্তে ওদের মধ্যে সখ্যতা গড়ে উঠতে লাগলো। কল্পনাও কালামের ছলনায় নিজেকে সমর্পন করে ফেললো। এক পর্যায়ে এসে, কল্পনা ও কালামের পরকীয়া গভীর হতে লাগলো। মতি যতোই বোকা হউক না কেন সেও আস্তে আস্তে কালামকে অসহ্য করতে লাগলো। মাঝে মাঝে মতি ঘরে থাকাবস্থায় কালাম আসলে, কল্পনা মতিকে নাস্তার অজুহাতে বাজারে পাঠিয়ে দিতো। বোকা মতি, বউ বলেছে ভেবে দৌঁড়ে গিয়ে বাজার থেকে নাস্তা আনতো। একদিন মতি, বাহির থেকে এসে কালাম ও কল্পনাকে পাশাপাশি বসা দেখে বিরক্ত হয়ে বলেছিলো, দূরে গিয়া বসা ভালো। কিন্তু বোকা মতি এতো কিছু হয়ে যাচ্ছে তার কিছুই বুঝতে পারলো না। কর্মের ফল, এদিকে কল্পনা আবারও ৫ মাসের অন্ত:সত্ত্বা হয়ে পড়লো। এই অন্ত;সত্ত্বায় মতির খুশি আর ধরে না। নিজের বউকে অনেক আদর করতে লাগলো। কিন্তু এই বারের অন্ত:সত্ত্বার কারন কল্পনা ও কালাম ছাড়া আর কেউ জানতো না।

 

পাশা পাশি কালামের আনাগোনা আগের চেয়েও বেড়ে গেলো। বোকা মতি এখন আর কালামকে সহ্য করতে পারছিলো না। তাই, প্রায়-ই কালামকে নিজের বউয়ের কাছে থাকতে দেখলে রাগ করতো। ওদের সম্পর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মতিই এখন প্রধান বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ালো। মতিও এখন শক্ত হয়ে গেলো। বিধায়, ওদের প্রনয়ে ভাটা পড়তে লাগলো। এমতাবস্থায়, মতিই এখন কালামের চক্ষুশূল হয়ে দাড়ালো।

 

ফলে, সে বিভিন্ন ভাবে কল্পনাকে বুঝাতে লাগলো যে, মতিকে ডিভোর্স দিতে। কিন্তু কল্পনা জানতো এটা কেহই মেনে নেবে না। তাছাড়া, মতি যতোই বোকা হউক না কেন, একটু পাগলা স্বভাবের ছিলো। তাই, কালামকে বললো, ডিভোর্স দেয়া কোন ভাবেই সম্ভব নহে। চিন্তায় পড়লো কালাম, এই পরিস্থিতে কি করা যায়! কল্পনাকে ভন্ড কালাম বুঝাতে থাকলো, তার সমস্ত ভালবাসা কল্পনার জন্য। কল্পনাকে ছাড়া সে বাঁচবে না। কল্পনা মেয়ে মানুষ, পুরুষদের ছলনা সে ভালোভাবে বুঝতে পারলো না। ফলশ্রুতিতে, কালামের প্রতিই তার সমস্ত ভালোবাসা জমতে লাগলো। কিন্তু, দুই জনে মিলে কোন ভাবেই কোন কুল কিনারা করতে পারলো না। এ দিকে মতিও কঠিন হতে থাকলো। এখন মতির মায়া বউয়ের প্রতি আরো বেড়ে গেলো। বউ পোয়াতি, তাই বউয়ের প্রতি মতির এখন তার মায়ার শেষ নাই। এখন আর মতি কালামকে সহ্যই করতে পারছিল না। কিন্তু মতির এমন ব্যবহার কল্পনারও এখন আর ভালো লাগতো না। সেও চাইতো কালাম আসুক ও বসুক। কিন্তু বউ বলে কথা, মতি বোকা ঠিকই তবে কালামের চোখ যে তার বউয়ের উপর পড়েছে তা সে অনেকটা আঁচ করতে পেরে ছিলো।

 

তারপরেও, তার বুদ্ধি ও শক্তি সামর্থ্য কমছিলো। এদিকে কালাম মতির বাঁধার মুখে অস্থির হয়ে পড়লো, আর কল্পনার কথা নাই বললাম! মতিকে নিয়ে কালাম ফন্দি আটতে শুরু করলো। কল্পনাকে একদিন আদরের সুরে বললো, মতি যে ভাবে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, আমি যে আর পারছিনা। একসময় কল্পনাকে কাছে বসিয়ে আদরের সহিত বললো, মতি বেঁচে থাকলে তোমাকে আমার হারাতে হবে। এ কথার মর্ম কল্পনা ভালোভাবে বুঝতে পারলো না! কল্পনা বললো, তোমার কথার অর্থ আমি বুঝতে পারলাম না। তখন, কালাম সুন্দরভাবে বললো মতিকে মেরে ফেলতে হবে! এ কথা শুনে কল্পনা হতচকিত হয়ে পড়লো। যতো অপরাধই সে করুক না কেনো কিন্তু মতির মৃত্যু সে কোন ভাবেই মেনে নিতে পারলো না। কিন্তু পিছু ছাড়ার মতো লোক কালাম নহে! তাই, সে কল্পনাকে দিনের পর দিন বুঝাতে লাগলো। বুঝাতে বুঝাতে একসময় কল্পনাকে রাজি করাতে ধূর্ত কালাম সফল হলো।

 

অবশেষে, কালাম একদিন তার দুই বন্ধু জাকির ও তাহের এর সাথে মতির ব্যাপারে পরামর্শ করলো। মতিকে মেরে ফেলতে হবে এ-ই চূড়ান্ত হলো এবং জাকির ও তাহের এর সাথে মাত্র তিন হাজার টাকায় চুক্তি হলো। অগ্রিম পনেরশ টাকা দিলো, এতো কিছু হয়ে যাচ্ছে অথচ বোকা মতি ও বাড়ির লোকজন কেহই কিছু বুঝতে পারলো না! জানতো শুধু কালাম, জাকির, তাহের ও কল্পনা। তবে, কল্পনা মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়েছিল। যতো কিছুই হউক শতো হলেও স্বামী, তার উপর বোকা, আবার নিজের মেয়ের বাবা। কিন্তু তারপরও কল্পনা কালামের প্রতারনা ও ভণ্ডতায় রাজি না হয়ে পারলো না!

 

একদিন রাতে মতি বাড়িতে গভীর নিদ্রায় মগ্ন। শুধু জেগে আছে কল্পনা, সারা মুখে তার ভয় আর যন্ত্রণা কাজ করছিল। রাত অনুমান দুইটার দিকে ঘরের কাঠের দরজায় মৃদু টোকা পড়লো। কল্পনা তো আগেই জানতো তাই অপেক্ষায় ছিলো। গভীর ঘুমে থাকা মতির পাশ থেকে সংগোপনে উঠে এসে আস্তে করে কাঠের দরজা খুলে দিলো। মতি তখন ছোট মেয়েকে পাশে নিয়ে নিদ্রায় অচেতন। কালাম, জাকির, ও তাহের আস্তে করে ঘরে প্রবেশ করলো। পূর্ব থেকেই তারা প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিলো। তারা তিনজনে, ঘুমে আচ্ছন্ন মতিকে মুখ চেপে ধরে আলগি দিয়ে আধা কিঃমিঃ দূরে নদীর পাড়ে নিয়ে গেলো। এদিকে কল্পনা দরজা বন্ধ করে বিছানায় ছটপট করতে থাকলো।

 

নদীর পাড় পৌঁছার আগেই মতি টানা হেচড়া করতে লাগলো। নদীর পাড়েই ছিল আখ ক্ষেতের বাগান। তারা তিনজনে জোড় পূর্বক মতিকে আখ ক্ষেতের ভিতর নিয়ে গেলো। ধৃর্ত কালাম পূর্ব থেকেই নাইলনের সুতা পাকিয়ে রেখেছিলো। অনেক ঝাপটা ঝাপটির পর তিন শয়তান মিলে মতিকে আখ ক্ষেতের ভিতর শুয়াইলো। বিধাতার লিখন নাহি করা যায় খন্ডন। তিন ধূর্ত শয়তানের সাথে কি মতির মতো বোকার পক্ষে লড়াই করা সম্ভব! তাও নিজের আপনজন কর্তক এই অবিশ্বাস্য হৃদয় বিদারক ঘটনা কোন সভ্য সমাজে সম্ভবপর নহে। অত:পর কালাম মতির বুকে চেপে বসলো, তাহের ও জাকির হাত পা ধরলো। তারপরে কালাম নাইলনের সুতা মতির গলায় পেচিয় দুই দিক থেকে টানতে লাগলো। অনেকক্ষন জীবন-পন লড়াইয়ের পর মতির রুহ কিছু বুঝার আগেই উর্ধ্ব আকশে চলে গেলো!

 

প্রিয় পাঠক, এ কাহিনী পঞ্চাশ পাতায়ও লিখা সম্ভব নয় তবে পরবর্তীতে উপন্যাস আকারে লিখার চেষ্টা করবো শুধু এটুকু বলি, এই ঘটনাটি ধ্রুব সত্য একটি মর্মভেদী ঘটনা। মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর থানায় এ হৃদয় বিদারক ঘটনাটি সংঘটিত হয়। আপনাদের সদয় অবগতির জন্য সংক্ষেপে বলছি যে, উক্ত কালামের ২০০৫ সালে ফাঁসি কার্যকর হয়। স্ত্রী অন্ত:সত্ত্বা থাকায় বাচ্চা প্রসবের জন্য ছয় মাসের অর্ন্তবর্তীকালীন জামিন পেয়েছিল। তারপর আবার জেল। কল্পনা, তাহের ও জাকিরকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেন মানিকগঞ্জ জেলার বিজ্ঞ জর্জ আদালত। পরবর্তীতে, হাইকোর্টও বিজ্ঞ জর্জ আদালতের রায় বহাল রাখেন। কালামের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর তার লাশ তার দেশের বাড়িতেই কবরস্থ করা হয়।

 

শুধু একটাই দুঃখ, বোকা মতি কিছুই জানতে পারলোনা, না পারলো কিভাবে তার মৃত্যু হলো, না জানলো কারা তাকে মারলো! তারপরও সে তার বউকে ঠিকই ভাল বাসতো!!

Please follow and like us:

সর্বশেষ খবর

এ বিভাগের আরও খবর

প্রধান সম্পাদক- খোরশেদ আলম চৌধুরী, সম্পাদক- আশরাফুল ইসলাম জয়,  উপদেষ্টা সম্পাদক- নজরুল ইসলাম চৌধুরী।

 

ঢাকা অফিস : রোড # ১৩, নিকুঞ্জ - ২, খিলক্ষেত, ঢাকা-১২২৯,

সম্পাদক - ০১৫২১৩৬৯৭২৭,০১৬০১৯২০৭১৩

Email-dailynayaalo@gmail.com নিউজ রুম।

Email-Cvnayaalo@gmail.com সিভি জমা।

প্রধান সম্পাদক কর্তৃক  প্রচারিত ও প্রকাশিত।

 

সাইট উন্নয়নেঃ ICTSYLHET