রাশিদুল ইসলাম, কুড়িগ্রাম থেকেঃ
কুড়িগ্রাম পুরাতন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে জাল সনদ, ভুয়া নিয়োগ ও প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ করে কতিপয় শিক্ষক চাকুরী করছেন। মঞ্জুরুল হকের নির্দেশে শিক্ষক কর্মচারীর নিকট জোরপূর্বক মন্ত্রণালয় ও মামলার খরচের জন্য ছয় হাজার টাকা করে চাঁদা আদায়ের গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জানা যায়, এই বিদ্যালয়ে কর্মরত এমপিও ভুক্ত ১৪ শিক্ষকের অনেকের ব্যক্তিগত ফাইলে গোজামিল, তথ্য গোপন ও জাল সনদে চাকুরী করার প্রমাণ মিলেছে। অডিটে দেয়া তথ্য অনুযায়ী মৌলভী শিক্ষক মোশারফ হোসেন মিয়ার দাখিল পাশের সনদ জাল হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে। তিনি ১৯৮১ইং বড়বাড়ি দাখিল মাদরাসা হতে মাত্র ১১ বছর বয়সে দাখিল পাশ করেন। যা নজির বিহীন। কারণ ১১ বছর বয়সে সকল শিশুই প্রাইমারী স্থরে থাকেন। দাখিল পাশের সনদ নম্বর ৬৩৯৩। এই সনদে শিক্ষাবর্ষ ও রেজিষ্ট্রেশন নম্বর উল্লেখ নেই। ১৯৮৪ইং আলিম এবং ১৯৮৬ ইং ফাজিল পাশের সকল সনদ হাতে লেখা। এছাড়াও তিনি শুধু মোঃ মোশারফ নাম ধারণ করে নাগেশ্বরী শালমারা দাখিল মাদরাসায় সুপারে চাকুরী করেন। জাল সনদের বিষয়ে স্থানীয়রা সজাগ হওয়ায় সেখান থেকে ছটকে পড়েন তিনি। তার পূর্বের মাদরাসার ইনডেক্স ৩৮০৬৩৩। এই বিদ্যালয়ে তার ইনডেক্স নং- ২৫১৫৩৬। বিধান অনুযায়ী তার ইনডেক্স নম্বর এক হওয়ার কথা। সনদ অনুযায়ী এমপিওতে তার নামের যথেষ্ট অমিল রয়েছে। অপর সহকারী শিক্ষক মোঃ আবুল কাশেম এই বিদ্যালয়ের ইনডেক্স নং- ২৫৫৪৩৫, তিনি ০৪/০৬/৯৫ইং অত্র বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। তার চাকুরী পাওয়ার কোন তথ্য প্রমাণ দিতে পারেনি অডিটে। সহকারী শিক্ষক আবু হোসেন সরকার বাংলা ও সামাজিক বিজ্ঞানে বিএ এবং এমএ পাশ করে বিএড স্কেলে চাকুরী গ্রহণ করলেও এমপিও সীটে ইংরেজি শিক্ষকের বেতন গ্রহণ করছেন। বিদ্যুৎ কুমার গোসামী কাব্যতীর্থের শিক্ষক হয়ে সামাজিক বিজ্ঞান শিক্ষকের বিল উত্তোলন করছেন। কাব্যতীর্থ শিক্ষকের ৩টি সনদ থাকা আবশ্যক থাকলেও তার সেই সনদ নেই। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শনে আসা কর্মকর্তার মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।
এদিকে বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির একজন আহ্বায়ক সদস্য জাল সনদ ও ভুয়া নিয়োগে চাকুরী করার ব্যাপারে কতিপয় শিক্ষকের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেছেন বিভিন্ন দপ্তরে। জাহাঙ্গীর ইসলাম রজব বলেন- মন্ত্রণালয় অডিটের সময় আমি উপস্থিত ছিলাম। শিক্ষকদের জাল সনদ, জাল-জালিয়াতি ও প্রতারণা প্রত্যক্ষ করেছি। দুর্নীতিগ্রস্ত শিক্ষকদের উপযুক্ত তদন্ত এবং শাস্তি জরুরী।
জাল সনদে অভিযুক্ত মোশারফ হোসেন বলেন, জাল সনদের চাকুরী করি না। ১১ বছর বয়সেই দাখিল পাশ করেছি। অন্য শিক্ষকদের মতামত নেয়া সম্ভব হয়নি।
অপরদিকে প্রধান শিক্ষক হাজেরা বেগম ছুটিকালীন সময়ে ছলচাতুরী করে কমিটির অনুপস্থিতিতে দুর্নীতিগ্রস্ত শিক্ষকরা প্রধান শিক্ষক কক্ষের তালা ভেঙ্গে চেয়ার দখল করে মঞ্জুরুল হক নামের এক সহকারী শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ঘোষণা করে চেয়ারে বসিয়ে দেয়। মঞ্জুরুল হক চেয়ারে বসে দেড় মাসে এই সুনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিকে দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছে। শিক্ষার্থীরা ক্লাসে বসে থাকলেও শিক্ষকদের দেখা মেলে না ক্লাসে। শিক্ষকরা শ্রেণি কক্ষে গল্পগুজব এবং স্কুল চলাকালীন সময় বাহিরে চা ও পানের দোকানে আড্ডা দিচ্ছে। বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়ে দেখা যায়, প্রধান শিক্ষকের নির্দেশে কাজি মইনুল হক নামের এক শিক্ষক বিদ্যালয়ের শিক্ষক কর্মচারীদের নিকট জোরপূর্বক ৬ হাজার টাকা করে চাঁদা আদায় করছে। মঞ্জুরুল হক বলেন- শিক্ষকরা আমাকে দায়িত্বে বসিয়েছেন। আমার নির্দেশে কাজি মইনুল টাকা উত্তোলন করছে। মন্ত্রণালয় ও মামলার কাজে এই টাকা ব্যবহার করা হবে।
এ বিষয়ে কথা হলে জেলা শিক্ষা অফিসার আব্দুল কাদের কাজী (ভারপ্রাপ্ত) বলেন- ভারপ্রাপ্তের ভারে আমি নুয়ে পড়েছি। এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদ নিয়ে জটিলতা চলছে। প্রধান শিক্ষক হাজরা বেগমের চাকুরী শেষ হবার পর ২ বছরের এক্সট্রেনশন অর্ডার ছিল। সেই অর্ডার সংশ্লিষ্ট দপ্তর বাতিল আদেশ দিয়েছে। হাজরা বেগম সেই বাতিল আদেশের বিপক্ষে সুপ্রিম কোর্টের রায় নিয়ে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব আবারো পেয়েছেন বলে শুনেছি। মঞ্জুরুল হকের নির্দেশে শিক্ষক কর্মচারীর নিকট ৬ হাজার টাকা করে চাঁদা আদায়ের বিষয়টি আমি অবগত নই।









