“ব্র্যান্ড ” উদ্যোক্তার সন্তানের মতো, একজন উদ্যোক্তার কাছে ব্র্যান্ড শুধু ব্যবসা নয়, সন্তানের মতো অনেক বছর পরিশ্রম, ত্যাগ ও সততার মাধ্যমে তিনি ব্র্যান্ডকে বড় করেন। সময়ের সাথে সেই ব্র্যান্ড মানুষের কাছে বিশ্বাস ও মানের প্রতীক হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে অনেক ভালো ব্র্যান্ড তৈরি হয়েছে, কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে কারণে সেগুলো ধ্বংসের মুখে পতিত হয়। গাজী পাম্প তার উদাহরণ যে ব্র্যান্ডটি বহু বছর ধরে মানুষের বিশ্বাস অর্জন করেছিল, আজ রাজনৈতিক টানাপোড়েনে হুমকিতে পড়েছে।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, গাজী মূলত চীনের তাইফুর কোম্পানির পণ্য বিক্রি করলেও নিজের ব্র্যান্ড দিয়ে মানুষের বিশ্বাস তৈরি করেছে। তাইফু কম দামে একই পণ্য বিক্রি করেও গাজীর জায়গা নিতে পারবেনা, কারণ বিশ্বাস টাকা দিয়ে কেনা যায় না, সময় লাগে। আর এই কারণেই তাইফুও আজ গাজী ব্র্যান্ডকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করছে।
গাজী টায়ার্সের কারখানা লুটপাট ও ধ্বংস হওয়ার পরের দিনই বাজারে টায়ার্সের দাম বেড়ে গেছিলো, আর এত বড় শিল্প দ্রুত আবার দাঁড় করানো প্রায় অসম্ভব। এতে দেশের কোনো লাভ হয়নি, বরং ক্ষতিই হয়েছে।
এই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে ভাবতে ঘাম মুছতে মুছতে বসুন্ধরা টিস্যুর কথাও মনে পড়ে, পুরো দিন এত ব্যবহার করি, অথচ শেয়ারহোল্ডাররা ঠিকমতো ডিভিডেন্ড পান না।
আমি ব্যক্তিগতভাবে কখনোই চাই না বসুন্ধরা গ্রুপের কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ হোক। বসুন্ধরা আজ বাংলাদেশের শক্তিশালী ব্র্যান্ড।
একইভাবে বেক্সিমকো গ্রুপ দেশের শিল্পখাতে পথপ্রদর্শক,
আর নাসা ডেনিম বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের গর্ব।
গাজী, বসুন্ধরা, বেক্সিমকো, নাসা, বিবিএস, এই প্রতিষ্ঠানগুলো যুগের পর যুগ ধরে যে ব্র্যান্ড ভ্যালু গড়ে তুলেছে, তা আর কোনো ব্যক্তির মালিকানায় সীমাবদ্ধ নেই। এগুলো এখন জাতীয় সম্পদ। একটি লোগোর পেছনেই লুকিয়ে থাকে শত শত কোটি টাকার মূল্য যা শুধু অর্থ দিয়ে তৈরি করা যায় না; প্রয়োজন সময়, সুশাসন ও মানুষের আস্থা।
এখানে একটি বাস্তব উদাহরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে ঢাকার রাস্তায় মাটির নিচ দিয়ে বিদ্যুৎ কেবল স্থাপন ও সাবস্টেশন নির্মাণে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে চীনের কোম্পানি । দুঃখজনকভাবে, এই প্রকল্পের অধিকাংশ কেবলই চীন থেকে আমদানি করা হচ্ছে, যদিও এই সক্ষমতা বাংলাদেশের নিজস্ব শিল্প বিশেষ করে BBS-এর মতো কোম্পানির মধ্যেই বিদ্যমান ছিল। সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা ও নীতিগত সহায়তা পেলে এসব পণ্য দেশে উৎপাদন করেই হাজার হাজার কোটি টাকা দেশের ভেতরেই রাখা যেত।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর অধিকাংশই পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি। অর্থাৎ এসব প্রতিষ্ঠানে দেশের সাধারণ মানুষই বিনিয়োগকারী ও অংশীদার। কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু মালিক নয়, সাধারণ হাজারো বিনিয়োগকারী নিজেদের ফুঁজি হারায়।
রাজনীতিতে মতভেদ স্বাভাবিক, কিন্তু সেই নামে শিল্প ধ্বংস করা ঠিক নয়। কিছু মানুষ রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে দেশের কারখানা ও ব্যবসা ক্ষতি করছে। এতে শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, হাজারো পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বেকারত্ব বাড়ে এবং দেশের অর্থনীতি দুর্বল হয়।
অতএব, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোরালো আবেদন দেশের স্বার্থে, মানুষের জীবিকার স্বার্থে, জাতীয় সম্পদের স্বার্থে যুগ যুগ ধরে গড়ে ওঠা এই ব্র্যান্ডগুলোকে রক্ষা করুন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে উঠে সুস্পষ্ট শিল্প সুরক্ষা নীতিমালা ও নিরাপদ ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করুন।
মালিকপক্ষকে জবাবদিহিতার আওতায় আনুন। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার আগে যখন লাভ হয়, তালিকাভুক্ত হওয়ার পর কেন লোকসান দেখানো হয় তার সঠিক জবাবদিহির ব্যবস্থা করুন। ব্যবসায়ীদের দিকে শুধু চোরের দৃষ্টিতে তাকালে হবে না তারাই দেশের জন্য নতুন ধারণা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। সৎ ব্যবসায়ীদের জন্য রাষ্ট্রীয় সম্মাননার ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
একই সঙ্গে আমদানি নির্ভর বড় কোম্পানিগুলোকে দেশে এসেম্বলি ও পূর্ণ উৎপাদনে উৎসাহিত করা জরুরি যাতে দেশীয় বাজার শক্তিশালী হয়, কর্মসংস্থান বাড়ে এবং ভবিষ্যতে বাংলাদেশ রপ্তানিমুখী শিল্পে রূপ নিতে পারে।
কারণ এই ব্র্যান্ডগুলো শুধু কোম্পানি নয়
এগুলো উদ্যোক্তাদের সন্তান, বাংলাদেশের গর্ব ও ভবিষ্যৎ।
লেখক :
প্রকৌশলী আবদুল্লাহ আল মামুন
উদ্যোক্তা
(পাওয়ার সল্যুশনস, শিল্প ও অবকাঠামো খাতে সংশ্লিষ্ট)









