বাংলাদেশের মানুষের একটা মৌলিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে হুজুগে মেতে উঠা। যাকে বলে “হুজুগে বাঙ্গালী”। কোনোকিছু ভালোভাবে যাচাই বাচাই না করে দৌঁড় দেয়। কেউ একজন বলছে লবণের দাম বেড়ে যাচ্ছে ব্যাস, কয়েক কেজি লবণ কিনে স্টক করে নিলো। পেঁয়াজ বাড়ছে কয়েক কেজি কিনে নিলো। এখন শুনছে করোনাভাইরাস বাংলাদেশে এসে গেছে। তাহলে এখন কী করতে হবে? মুখের মাস্ক কিনতে হবে, হাতের গ্লাবস কিনতে হবে। সবাই দৌঁড়াচ্ছে বিভিন্ন ফার্মেসীতে। এখন যা ঘটলো, পাঁচ-দশ টাকার মাস্ক দেড়শো দুইশো টাকা।
কী আজব দেশ! কখন কে বলেছে মূখে মাস্ক ব্যবহার করলে করোনাভাইরাস থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে! ব্যাস, সবাই মাস্ক কিনছে হুমড়ি খেয়ে। সুযোগ বুঝে এখন মুদি দোকানীও মাস্ক বিক্রি করছে। একটিবারও কেউ ভাবছে না যে কেবল মাস্ক ব্যবহার আমাকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে পারবে না। বিশেষত যারা সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী তারা কিছুতেই করোনাভাইরাস আতংকে থাকতে পারেন না। কিংবা একজন ধার্মিক এই বিশ্বাসও রাখবেন না যে, কেবল মাস্ক মুখে থাকলে আমি বেঁচে যাবো। বরং প্রত্যেক ধার্মিক এইটুকু বিশ্বাস রাখবে যে, জীবন এবং মৃত্যুর ফয়সালা আসমান থেকে হবে। সৃষ্টিকর্তা কাউকে মারতে চাইলে কোনও কারণ বা উপলক্ষ্য ছাড়া নিজের ঘরে ঘুমের মধ্যেও মারতে পারেন।
সত্যিই করোনাভাইরাস শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে এসে হানা দিয়েছে। এমন বেরসিক রোগ আসার আর সময় পেলো না। ইতিমধ্যেই তিনজন রোগী সনাক্ত হয়েছে এবং দুইজন চিকিৎসা নিয়ে ভালো হয়েছেন। এতো সুসংবাদের পরও বাংলাদেশের মানুষ এখন এমন একটা আচরণ দেখাচ্ছে, মনে হচ্ছে যেনো এদেশের মানুষ কোনও রোগে মরে না। এদেশে কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয় না। যেনো সবাই একদম আশি-নব্বই বছর পর স্বাভাবিকভাবে বেঁচে তারপর মরে। আসলে বাস্তবচিত্র কী তা বলে? কয়জন সৌভাগ্যবান আছেন যে শেষ বয়সে গিয়ে মরতে পেরেছেন?
মানুষ মাত্রই জন্মিলে একদিন মরতে হবে। কিন্তু এদেশের মানুষের ভাগ্য এমন যে জন্মের শুরুতেই মরে যেতে হয়। যদি বলি এদেশে জন্ম নিতেই মানুষ মরে যায়, তাহলে কি বেশি বলা হবে? এবার শুনুন, সবচেয়ে বেশি নবজাতকের মৃত্যু হয়— এমন ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ একটি। এটা আমার বানানো কথা নয়। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯০ সালে এদেশে ২ লাখ ৪১ হাজার নবজাতকের মৃত্যু হয়। দীর্ঘ সচেতনতার পরও ২০১৬ সালে সে সংখ্যা ৬২ হাজারে নেমে আসে। তারপরও বিশ্বের যে ১০টি দেশে সবচেয়ে বেশি নবজাতকের মৃত্যু হয়, বাংলাদেশ এখনও সেই তালিকায় রয়ে গেছে। বর্তমানে বাংলাদেশে বছরে প্রায় 70 হাজার শিশু জন্মের 28 দিনের মধ্যে মারা যায়। গর্ভজনিত জটিলতায় প্রতিদিন 20 জন মা মারা যায়। প্রসবের আগে পরে বা প্রসবকালীন সময়ে শতকরা 31 জন মা মারা যান। আর বলা লাগবে?
আচ্ছা, এবার বলছি যারা জন্মের সময় মরেননি বেঁচে গেছে তাদের মরণের কী কী সুব্যবস্থা আছে সেকথা। তাদের জন্য সারা বছর ধরে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা এবং অপার থাকে মরার জন্য। এসব অপারের মধ্যে হচ্ছে – ভেজাল খাবার, ভেজাল ঔষধ, প্রাকৃতিক নানা দুর্যোগ যেমন -বন্যা ঘূর্ণিঝড় বজ্রপাত, মশার উপদ্রব ইত্যাদি। এছাড়া আছে রাজনৈতিক হানাহানি, হরতাল অবরোধের কঠোর কর্মসূচী, সড়ক-ট্রেন-লঞ্চ দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড ইত্যাদি। একটু ধারণা দিচ্ছি এসব মৃত্যুর ফাঁদে কী পরিমাণ জীবন ও সম্পদহানী ঘটে।
২০১৯ সালে ৪ হাজার ৭০২টি সড়ক দুর্ঘটনায় কমপক্ষে ৫ হাজার ২২৭ জন নিহত এবং ৬ হাজার ৯৫৩ জন আহত হয়েছেন। এছাড়াও, রেলপথে ১৬২টি দুর্ঘটনায় ১৯৮ জন নিহত এবং ৩৪৭ জন আহত হয়েছেন। ২০১৮ সালে ৩ হাজার ১০৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪ হাজার ৪৩৯ জন নিহত এবং ৭ হাজার ৪২৫ জন আহত হয়েছিলেন। এভাবে প্রতিবছর নিয়মিতই দুর্ঘটনায় মৃত্যু ঘটছে। গত দশ বছরে ১৬৮০১৮টি অগ্নি দুর্ঘটনায় নিহত ১৪৯৩ জন। আর্থিক ক্ষতি ৪২৮৩ কোটি টাকা। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ৩০১ জন মারা গেছেন বজ্রপাতে। এভাবে ২০১০ সালে ১২৪ জন, ২০১১ সালে ১৭৯ জন, ২০১২ সালে ৩০১ জন, ২০১৩ সালে ২৮৫ জন, ২০১৪ সালে ২১০ জন, ২০১৫ সালে ২৭৪ জন এবং ২০১৬ সালে প্রায় ৩৫০ জন বজ্রপাতে মারা গেছেন।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৩ হতে ২০১৬ পর্যন্ত সংখ্যার যথাক্রমে ১২৮ জন, ৭৯ জন, ৯১ জন ও ১৩২ জন শুধু এপ্রিল-মে মাসেই বজ্রাঘাতে মারা গেছেন। ২০১৬ সালে বজ্রপাতে মৃত্যুর এমন ঘটনার পরই ওই বছর ১৭ই মে সরকার বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করে। কেবল 2019 সালে সারাদেশে 1 লাখের অধিক মানুষ ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হন এবং সরকারি হিসাবে 148 জনের মৃত্যু খবর নিশ্চিত করা হয়। 2013 সালে রানা প্লাজা ধ্বসে একদিনেই মারা যায় 1175 জন শ্রমিক। 1970 সালের ঘূর্ণিঝড়ে এক রাতেই মারা যায় 5 লক্ষ লোক।
1991 সালের ঘূর্ণিঝড়ে এক রাতেই মারা যায় প্রায় দেড় লক্ষ লোক। এছাড়া হরতালে পেট্রাল বোমায় কত তাজা প্রাণ বিনা অপরাধে নৃশংসভাবে ঝরে গেছে তার হিসাবই নেই।
এভাবে তালিকা দিলে দেখা যাবে প্রতিদিন এদেশে গড়ে কয়েকশ মানুষ মারা যাচ্ছে। তবুও সবাই স্বাভাবিক জীবন যাপন করছে কোনো টেনশন ছাড়া। অথচ এখন কোথাকার এক ভাইরাস নিয়ে টেনশনের শেষ নেই। এর কোনও মানে আছে? এতো রকমের মৃত্যুর সুযোগ-সুবিধা এদেশে বহাল থাকা স্বত্তেও সবাই কেবল মিডিয়ার হৈচৈ দেখে করোনাভাইরাস নিয়ে ব্যস্ত। আসল বাস্তবতা হচ্ছে এই- সারাবছর যারা বিভিন্ন সমস্যায় মরে তারা গরীব শ্রেণীর মানুষ। বড়লোকদের ওইসব সমস্যা স্পর্শ করতে পারে না। তাই মিডিয়াও হৈচৈ করে না। আর এখন যে ভাইরাস এসেছে তাতে ধনী গরীব সবাই মরতে পারে, তাই মিডিয়া সারাদেশে একটা ভীতি সৃষ্টি করে রেখেছে। বাংলাদেশে কাউকে মরতে করোনাভাইরাসের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। আমাদের মিডিয়া এই সত্যটি জানাতে চায় না। এদেশের মানুষের চরিত্র বুঝা খুব মুশকিল। সত্যি সেলুকাস বড় বিচিত্র এই দেশ!
লেখকঃ কলামিস্ট ও সাংস্কৃতিক কর্মী।
arzufeni86@gmail.com









