মুক্তিযুদ্ধ , প্রতিষ্ঠিত হোক একটাই ইতিহাস
সাহিদা সাম্য লীনা
একটি দেশের স্বীকৃতি ও নিজ দেশ বলে অধিকার দাবী তা কেবল স্বাধীন লাভের মধ্যেই ঘটে। বাংলাদেশে এমন একটি দেশ যে স্বাধীনতা লাভের জন্য নয় মাস অকুতোভয় ও নিরন্তর লড়াইয়ের পর সাফল্যের ফসল ঘরে তোলার মতোই। যদিও ঘটনা দুর্ঘটনা নিয়েই আজকের বাংলাদেশ। অনেকেই কোন আশাহত ও দুর্ঘটনায় বলে ওঠে এজন্যই কি দেশ স্বাধীন করেছিলাম! নিজ দেশেই এখন অনেকে স্বাধীন থাকতে পারছেনা।
বাক স্বাধীনতা নেই অনেকটা। মতামত প্রকাশের জায়গাতে ভয় ঢুকে গেছে। সম্প্রতি আবরার হত্যা পুরো বাংলাদেশকে হতবাক করে দিয়েছে। অথচ, নিজ অভিমত প্রকাশের ফলে একটি রাষ্ট্রের নানাবিধ সমস্যা উঠে আসতে পারে।সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিলে যে কোন উন্নয়নে সহায়ক হিসেবে দাঁড়াতে পারে। তবে, সমালোচনা ভোগ করার মতো মানসিকতার অভাবই আমাদের দিন দিন লোমহর্ষক করে তুলেছে।
জীবনের বাঁকে বাঁকে, পরীক্ষায় ভুল করে করে প্রতিটি মানুষ ও শিক্ষার্থী পরবর্তীতে নিজেকে সংশোধনের সুযোগ পায়। একটি দেশ ও সরকারেরও ভুল হতে পারে। জনগণ নিয়েই তো সরকার। যাদের জন্য সরকার আসে তাদের মতামত খুবই গুরত্বপূর্ণ! কিন্তু আমাদের দেশের যে কোন সরকার নিজের ভাল ছাড়া, মন্দ গ্রহণ করতে চায় না।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল ১৯৭১ সালে সংঘটিত তৎকালীন পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের সশস্ত্র সংগ্রাম, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ হিসাবে পৃথিবীর মানচিত্রে আত্ম প্রকাশ করে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি নিধনে ঝাঁপিয়ে পড়লে একটি জনযুদ্ধের আদলে গেরিলাযুদ্ধ তথা স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা ঘটে। সেই মার্চের কালো রাতে সামরিক বাহিনী ঢাকায় অজস্র সাধারণ নাগরিক, ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, পুলিশ ও ই.পি.আর.-কে হত্যা করে এবং ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রাপ্ত দল আওয়ামী লীগ প্রধান বাঙালিদের জনপ্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে।
এই হত্যাযজ্ঞের সাক্ষী ছিলেন পাাকিস্তানরই এক নামী সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস। যিনি লন্ডনে গিয়ে সানডে টাইমসে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন পূর্ব পাকিস্তানের উপর কেমন নির্যাতন ,দমন -পীড়ন হয়েছিল ! সেনা শাসকরাই নিজেদের কৃতিত্ব দেখাতে গিয়ে নিজ দেশের সাংবাদিকদের এনেছিলেন। যার মধ্যে এই সাহসী সাংবাদিক অ্যান্থনি ছিলেন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ৮ম পূর্ব বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ-প্রধান মেজর জিয়াউর রহমান ও চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের নেতা এম. এ. হান্নান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। প্রতিষ্ঠিত হয় বাঙালি জাতির স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো ,এই স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়েও আমাদের মধ্যে বিবাদ। কেউ কারোর টা মেনে নিতে পারে না। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় আগামী শিশুরা। তারা বইয়ে পড়ে এক , পরে শুনে আরেক । বই চেঞ্জ হয়, পরে সব তথ্যও চেঞ্জ । ব্যাপারটা অনেকটাই অদ্ভুত! ছেলে খেলার মতো চক্রাকারে ঘুরছে ইতিহাস।
যে শিশুরা এই দশ বছরে যেটা শিখেছে তারা তা আগামী দশ বছর পর যদি সরকার কোন কারণে পাল্টে যায় তাহলে সেখানেই একটা বড় সমস্যা আবার উপস্থিত হবে। তাদের প্রশ্নের জন্য কেউ প্রস্তত থাকে না। তখন হয়তো তারা কিশোর বা কিছুটা তারুণ্যে । নিজেরাই জবাব পাবে ও চেয়ে নিবে। এক সময় আমাদের মতোই বুঝে নিবে। নয় তো প্রতিবাদী হবে। তারপরেই আবরার হয়ে যাবে। ক্ষয়ে যাবে সোনালী নক্ষত্ররা। তাই মুক্তিযুদ্ধ কি আমরা যতোই চর্চ করি ,সঠিক শিক্ষাটা দেই ততোই অন্ধকার আসে ঘুরে ফিরে। তাই, প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাক না, একটা ইতিহাস!
দেশটা যে পর্যায়ে ছিল ঐ পর্যায় হতে উঠে দাঁড়ানোটাও একটা বড় ব্যাপার। গ্রামে যেখানে কোন ধ্রব সত্য যাবার পথ ছিল না একসময়, কিন্তু মুখে মুখে জনশ্রুতিতে চলে গিয়েছে অনেক ভুয়া আজব সব তথ্য। আমরা শিশু কিশোর বেলায় সেসব শুনে বড় হয়েছি। বঙ্গবন্ধু নিয়ে হাজার এলোমেলো তথ্য। তিনি যুদ্ধের সময় পাকিস্তান লুকিয়ে ছিলেন্, দ্রব্যের দাম বাড়িয়েছেন। ইন্ডিয়ার সাথে তার নানান চুক্তি । ইত্যাদি সব গল্প।
একজন মানুষ যুদ্ধবিদ্ধস্থ দেশকে কিভাবে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করবেন। কিভাবে তছনছ করা দেশকে সচল করবেন! গম্ভব্য কি?
শাসকরা যাবার আগে কেবল মানুষ খুন করেনি। দেশের সম্পদ লুন্ঠন হতে শুরু করে এদেশের সৌন্দর্য ধ্বংস .চারিদিকে হাহাকার অবস্থা এমনভাবে রেখে গিয়েছে তখনকার সময় যারা ছিলেন তারাই কেবল উপলব্ধি করতে পারেন। কিন্তু অদূরে গ্রামে যেখানে যুদ্ধ হয়নি যেমন ফেনী জেলার রাজাপুর ইউনিয়ন ও বারাহি গুণী গ্রামে শত্রুরা প্রবেশ করতে পারেনি। আমরা আমাদের স্বজনদের কাছ থেকে শোনা এসব কথা। তারা বলেছেন দূর থেকে গুলির আওয়াজ শুনতেন। ছেলেমেয়ে নিয়ে সাবাধানে ঘরের কোথাও লুকিয়ে থাকতেন। আমাদের স্বজন আত্বীয় নারীরা কমবয়সী; তখন তারাও নিরাপদ ছিল সেসব গ্রামে।
সব গ্রামে যুদ্ধ হয়নি এটাও ঠিক। ঢাকা শহরে সবচেয়ে বেশী হয়েছিল। এজন্য অনেক পরিবার তখন তাদের পরিবারকে নিয়ে গ্রামে চলে গিয়েছিলেন। সে এক দুর্বিষহ জীবন। কিন্তু কষ্টার্জিত দেশে হানাহানি আজ, দেশে লাগামহীন একের পর এক ইস্যু ,নিজেদের মধ্যে ধন্দ্ব সেখানে তো প্রশ্ন আসে ! কেন এই মুক্তি যুদ্ধ ? কেন রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা? কেন আমরা এক কাতারে দাঁড়াতে শিখিনি? কেন আমরা স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে বিভ্রান্তে পড়ি ?
সম্পাদক আঁচল
ফেনী ।







