রাজশাহী মহানগরীর নিউমার্কেট এলাকায় ডিবি পুলিশের অভিযানের সময় হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ও মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মীর তারেককে ঘিরে তৈরি হয়েছে চাঞ্চল্য। পুলিশের উপস্থিতির মধ্যেই তাকে ভবন থেকে বের করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
শনিবার দিবাগত রাতে নগরীর বোয়ালিয়া থানাধীন নিউমার্কেট এলাকার একটি ছয়তলা ভবনে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও বিভিন্ন তথ্য নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
মীর তারেক গত বছরের ৭ মার্চ নগরীর দড়িখড়বোনা এলাকায় রিকশাচালক গোলাম হোসেন হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ওই মামলায় তিনি এখনো গ্রেফতার হননি এবং আদালত থেকেও জামিন নেননি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শনিবার রাত পৌনে ১১টার দিকে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও বোয়ালিয়া মডেল থানা পুলিশের একটি দল নিউমার্কেট এলাকার ওই ভবন ঘিরে ফেলে। এ সময় মীর তারেক পাশের ভবনের ছাদে যাওয়ার চেষ্টা করেন। ছাদ থেকে লাফ দেওয়ার সময় তিনি আহত হন বলে স্থানীয়রা জানান।
ঘটনার সময় মীর তারেক নিজের ফেসবুক আইডি থেকে লাইভে এসে দাবি করেন, পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে এসেছে। তিনি নেতাকর্মীদের ঘটনাস্থলে আসার আহ্বান জানান। পরে শতাধিক নেতাকর্মী সেখানে জড়ো হয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ ও রাজশাহী মহানগর পুলিশের ক্রাইসিস রেসপন্স টিম (সিআরটি) মোতায়েন করা হয়। রাত প্রায় ১২টা ৫৫ মিনিটের দিকে ডিবি পুলিশ ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। এর কিছুক্ষণ পর রাত ১টার দিকে নেতাকর্মীরা মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে এসে ভবনের তালা খুলে আহত অবস্থায় মীর তারেককে বের করে নিয়ে যান।
অভিযোগ রয়েছে, এ সময় ভবনের সিসিটিভি ক্যামেরা আড়াল করার চেষ্টা করা হয় এবং কয়েকজন সাংবাদিককে ছবি ও ভিডিও ধারণে বাধা দেওয়া হয়।
তবে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার গাজিউর রহমান জানিয়েছেন, ডিবির ওই অভিযান মীর তারেককে গ্রেফতারের জন্য ছিল না। তিনি বলেন, পুলিশ অন্য এক আসামিকে ধরতে সেখানে গিয়েছিল। মীর তারেক বিষয়টি ভুল বুঝে আত্মগোপনের চেষ্টা করেন। কাক্সিক্ষত আসামিকে না পাওয়ায় পুলিশ ফিরে আসে।
পুলিশের এই বক্তব্য নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, অভিযান যদি মীর তারেককে ঘিরে না হয়ে থাকে, তাহলে কেন নেতাকর্মীরা সেখানে জড়ো হয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে স্লোগান দিলেন এবং তাকে নিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেওয়া হলোÑএ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, হত্যা মামলার একজন এজাহারভুক্ত আসামি ঘটনাস্থলে থাকার বিষয়টি জানার পরও কেন তাকে গ্রেফতারের উদ্যোগ নেওয়া হলো না।
পুলিশ সূত্র জানায়, সম্প্রতি শাহ মখদুম থানার ছায়ানীড় এলাকায় ফয়সাল বাঁধন নামে এক যুবক গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় তদন্ত চলছে।
এদিকে রিকশাচালক গোলাম হোসেন হত্যা মামলার নথি অনুযায়ী, মীর তারেক ওই মামলার অন্যতম এজাহারভুক্ত আসামি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ওই মামলায় এখন পর্যন্ত কোনো আসামিকেই গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।
ঘটনার সময় ফেসবুক লাইভে মীর তারেক দাবি করেন, তিনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং পুলিশ ডাকলে হাজির হতেন। অযথা তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। পরে ওই লাইভ ভিডিওটি সরিয়ে নেওয়া হয়।
মধ্যরাতের এই অভিযান, পুলিশের অবস্থান, হত্যা মামলার আসামির ঘটনাস্থল ত্যাগ এবং সাংবাদিকদের বাধা দেওয়ার অভিযোগ, সব মিলিয়ে বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মহানগর বিএনপির কয়েকজন নেতা বলেন, অপরাধী যে-ই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনা পুলিশের দায়িত্ব। তবে পুলিশের কাজে বাধা দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের ঘটনা চলতে থাকলে পুলিশের কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলেও তারা মন্তব্য করেন।








