দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে রাজশাহীর ছয় আসনের মধ্যে ৩টিতে ছড়িয়ে পড়ছে সহিংসতা। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নির্বাচনি অফিসে হামলা-ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে। একই সঙ্গে বাড়ছে পালটাপালটি অভিযোগ। নির্বাচনি প্রচার শুরু হওয়ার পর থেকেই সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এদিকে সহিংসতামুক্ত অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে বদ্ধপরিকর নির্বাচন কমিশন (ইসি) প্রার্থীদের আচরণবিধি লঙ্ঘন না করতে বারবার সতর্ক করছে। বিধি লঙ্ঘনজনিত শাস্তির উদ্যোগ নেওয়া হলেও সহিংসতা থামার লক্ষণ নেই। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন ভোটাররা। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে প্রার্থী ও সমর্থকদেরও। বাড়তি নিরাপত্তার দাবি তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষ করে রাজশাহী-৪ (বাগমারা) রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দূর্গাপুর) এবং রাজশাহী-৬ (বাঘা-চারঘাট) এ তিনটি আসনে বাড়ছে সহিংসতা। নির্বাচনী অফিস ভাঙচুর, পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা, অফিসে অগ্নিসংযোগ, ককটেল বিস্ফোরণ, হাতুড়িপেটা করাও হচ্ছে। যতদিন যাচ্ছে ততই উত্তেজনা বাড়ছে।
মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত রাজশাহীর উল্লেখি আসনের বিভিন্ন উপজেলায় ৩০টির মতো সহিংসতার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা অভিযোগ করেছেন নেীকার প্রার্থীর কর্মী সমর্থকরা নির্বাচনী প্রচারে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। আবার নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা অভিযোগ করছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মীরা হামলা চালাচ্ছে। নির্বাচনী সহিংসতাকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশ মামলা করেছে। তবে সবচেয়ে বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে রাজশাহী-৪ আসনে।
এই আসনে দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে কয়েক দফা সংঘাতের পর জেলার রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ডিসি শামীম আহমেদ এবং পুলিশ সুপার (এসপি) সাইফুল ইসলাম গত সোমবার বিকালে বাগমারায় গিয়ে দুই প্রার্থীর সঙ্গে বৈঠকে বসে দুই প্রার্থী হাতে হাত কোলাকুলি করে সহিংসতা করবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু তার পরদিনই স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের ওপর পৃথক তিনটি স্থানে নৌকার প্রার্থীর কর্মীদের হামলার ঘটনা ঘটেছে।
মঙ্গলবার সকাল ও সন্ধ্যায় স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাঁচি প্রতীকের পক্ষে প্রচার চালানোর সময় তিনজনকে পিটিয়ে জখম করেছে নৌকার প্রার্থীর সমর্থকরা। উপজেলার পাহাড়পুর ও বালানগর গ্রামে দুই ঘটনায় আহত তিনজনকে বাগমারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে কাঁচি প্রতীকের তিনটি নির্বাচনী ক্যাম্প।
রাজশাহী-৪ আসনে এবার আওয়ামী লীগের নৌকার প্রার্থী রাজশাহীর তাহেরপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র আবুল কালাম আজাদ। তিনবারের এমপি এনামুল হক দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করছেন কাঁচি প্রতীক নিয়ে। আহতদের দেখতে মঙ্গলবার রাতে হাসপাতালে গিয়ে এনামুল হক বলেন, “দুটো ঘটনায় থানায় অভিযোগ দেওয়া হবে। আমি এসব ঘটনার বিচার দাবি করি প্রশাসনের কাছে।”
এনামুল হক দাবি করেন, নৌকার সমর্থকরা এ পর্যন্ত কাঁচি প্রতীকের ২৬টি নির্বাচনি ক্যাম্প ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে। উপজেলার ২৭ স্থানে কাঁচির কর্মীরা হামলার শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন ৪৮ জন।
সোমবার বিকালে রিটার্নিং কর্মকর্তার উপস্থিতিতে সেই বৈঠকের প্রসঙ্গ ধরে এই স্বতন্ত্র প্রার্থী বলেন, “কালাম অঙ্গীকার করেছিলেন বাগমারায় আর কোনো সহিংসতা হবে না; কিন্তু কালাম কথা রাখেনি। রাতে আমার তিনটি নির্বাচনি অফিস আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনজন কর্মীকে পেটানো হয়েছে।”
বাগমারা থানার ওসি অরবিন্দ সরকার বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যেসব সহিংসতা ঘটেছে, সেগুলোর অভিযোগ তদন্ত করে এখন পর্যন্ত সাতটি মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। এ সব মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে পাঁচজনকে।
রাজশাহী-৫ আসনে বশেষ সোমবার রাতে বাঘার গড়গড়ি ইউনিয়নের বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (বিএনএম) আবদুস সামাদের (নোঙ্গর) নির্বাচনি অফিসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। রাজশাহী-৫ আসনের দুর্গাপুর উপজেলায় নৌকার তিন কর্মীকে হাতুড়িপেটা করায় একজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। স্বস্তন্ত্র প্রার্থী ওবায়দুর রহমানের পোস্টার কেড়ে নিয়ে তিন কর্মীকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় রাতেই দুর্গাপুর থানায় মামলা হলে নৌকা প্রতীকের তিন কর্মীকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
রাজশাহী-৬ আসনে আসনের শলুয়া ইউনিয়নের বামনদীঘি বাজারে স্বতন্ত্র প্রার্থী রাহেনুল হকের কাঁচি প্রতীকের নির্বাচনী অফিস ভাঙচুর ও একই সময়ে মালেকের মোড় এলাকায় কাঁচি প্রতীকের প্রচার গাড়ি ও মাইক ভাঙচুর করেছে নৌকার কর্মীরা বলে অভিযোগ করেছে স্বতন্ত্র প্রার্থী।
রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী চিত্রনায়িকা শারমিন আক্তার নিপাকে (মাহিয়া মাহি) নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেন মাহাবুর রহমান মাহাম নামের এক যুবক। তবে রাজশাহী সদর আসন ও রাজশাহী-৩ আসনে কোনো অপ্রীতিকর সংবাদ পাওয়া যায়নি।
রাজশাহী রির্টানিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক শামীম আহমেদ বলেন, কিছু কিছু ঘটনায় ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। নির্বাচনি অনুসন্ধান কমিটিও দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছেন। পরিস্থিতি এখন পর্যন্ত উৎসবমুখর আছে।








