জীবন প্রদীপ বুঝি যায় নিভে যায় তবুও আশা ফুরোয় না। নিরন্তর বেঁচে থাকার সংগ্রম আর রক্ত সংগ্রহের জন্য মানুষের হাতে পায়ে ধরে আকুতি জানানো।
এমনি দূর্বিসহ জীবনের নিভু নিভু প্রদীপ কোন মতে জালিয়ে বেঁচে থাকার অবিরাম সংগ্রম চালিয়ে যাচ্ছে রিমন। তার জীবন নামের রেলগাড়ী কোয়ায় গিয়ে থামবে তা বিধাতা ছাড়া কেউ জানে না।. এমনি করুন জীবন নিয়ে অবিরাম সংগ্রাম চালিয়ে
যাচ্ছে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র রিমন। সে রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার হলুদঘর প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে এ বছর পিএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। তবে শেষ দুটো পরীক্ষার সময় মারাত্বক অসুস্থ হয়ে পড়ায় শেষ করতে পারেনি পরীক্ষা।
উপজেলার মাড়িয়া ইউনিয়নের বড়মাড়িয়া গ্রামের এরশাদ আলীর বড় ছেলে রিমন জন্মগত ভাবেই থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত। প্রতিমাসে বেঁচে থাকার জন্য ওর এক ব্যাগ ও-পজেটিভ রক্তের প্রয়োজন হয়।
দরিদ্র পিতামাতার কাছে এই রক্ত সংগ্রহ যেন সোনার হরিণ সংগ্রহ। একমাত্র মাথা গোঁজার ঠাঁই বসতবাড়ি ছাড়া সবই বিক্রি করতে হয়েছে ছেলের চিকিৎসার জন্য। ডাক্তার বলেছে আঠারো বছর হলে এই রোগ সারার একটা সম্ভাবনা আছে।
তবে সে পর্যন্ত রিমন বাঁচবে কিনা তা বিধাতার হাত। তবে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত খাইয়ে পড়িয়ে ওকে বাঁচিয়ে রেখেছে ওর দরিদ্র পিতা মাতা। এই বাঁচার সংগ্রামে রিমনকে ধরতে হয়েছে পিতার হাল।
বাড়ি বাড়ি গিয়ে কলা সংগ্রহ করে তা হাটে নিয়ে বিক্রি করা। ছেলের চিকিৎসায় নিঃস্ব এরশাদ আলী মাস তিনেক আগে ধার দেনা করে সৌদি আরব পাড়ি জমিয়েছেন।
তবে সেখানে এখনও তার ভাল কাজ জুটেনি। কোন রকম খেয়ে পড়ে টিকে আছে প্রবাস জীবনে। হয়ত ভাল কাজ জুটবে । খেয়ে পড়ে কিছু টাকা দেশে পাঠাতে পারবে এই আশায় বুক বেঁধে আছে এরশাদ আলী। রিমনের ছোট ভাই রিফাত ২য় শ্রেণির ছাত্র। বাবা মায়ের আশা এই ছেলেকে নিয়ে।
তবে রিমনকে নিয়ে তারা আশা ছাড়েনি। ডাক্তার বলেছে ১৮ বছরের কথা। তখন হয়ত রোগ সারবে। রিমন ফিরে পাবে স্বাভাবিক জীবন। এমনি মরিচীকাময় হয়ে দুলছে রিমনের জীবন।
হলুদঘর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মহসিন আলী জানান, রিমন খুবই মেধাবী ছাত্র। ক্লাসে তার রোল দুই। থ্যালাসেমিয়ার মত দূরারোগ্য রোগে আক্রান্তের কারণে স্কুলের সকল শিক্ষকই তার প্রতি বিশেষ নজর দিয়ে থাকেন।
তবে রক্ত সংগ্রহ করতে তারাও হিমসিম খান। গ্রাম্য জনপদে কুসংস্কারের বেড়াজালে আবদ্ধ থাকায় অনেকের ও-পজিটিভ রক্ত থাকার পরেও দিতে আগ্রহী হয় না।
এভাবে প্রায় দুই মাস এক নাগাড়ে রক্ত হীন থাকায় গত পিএসসি’র ইসলাম ধর্ম পরীক্ষার দিন হলের ভিতর রিমন খুবই অসুস্থ হয়ে পড়ায় আর পরীক্ষা শেষ করতে পারেনি। পাশ্ববর্তী বান্দাইখাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আরেক প্রধান শিক্ষক জয়ন্ত কুমার জানান, রিমনের কষ্টের কথা জানার পর এবং তার রক্তের গ্রপ ও-পজিটিভ হওয়ায় তিনি দীর্ঘদিন ধরে চার মাস পর পর রিমনকে এক ব্যাগ রক্ত দিয়ে আসছেন।
বাকি তিন মাসের জন্য তার বন্ধু বান্ধব সহ অনেকের কাছে অনুয় বিনয় করে রক্ত সংগ্রহ করে দেন। কিন্তু সেখানেও সমস্যা থেকে যায়। সময় মত এই রক্ত সংগ্রহ হয়ে ওঠে না। তখন রিমনের মাকে ছুটতে হয় রাজশাহী মেডিকলে। সেখানে তার ভিন্ন রক্তের গ্রপ ম্যাচিং করে রিমনের শরীরে প্রবেশ করানো হয়। এভাবে রক্ত দিয়ে রিমনের মায়ের শরীরও এখন নাজেহাল। ভবানীগঞ্জ বাজারের কলা বিক্রেতা রহিম বক আজিবর সহ ৫/৬ জন ফল বিক্রেতারা জানান, ক্ষুদে ব্যবসায়ী এবং অসুস্থ হওয়ায় বাজারের সবাই রিমনকে করলেও রক্ত দেওয়ার ব্যাপারে তারাও অনীহা প্রকাশ করেন। বিষয়টি অবগত করিয়ে মতামত জানতে চাইলে বাগমারা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অনীল কুমার সরকার ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার শরিফ আহম্মেদ প্রায় একই অভিমত ব্যক্ত করে বলেন, বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না ।
আপনাদের(সাংবাদিকদের) মাধ্যমে জানলাম। রিমনের চিকিৎসা ও লেখাপড়ার জন্য উপজেলা পরিষদ থেকে সম্ভাব্য সহযোগিতা করা হবে। এছাড়া সরকারি মেডিকেল বা অন্য কোন সোর্স থেকে বিনামূল্যে রক্ত পাওয়ার ব্যাপারেও আমরা চেষ্টা করব।#
রাজশাহীতে স্বাধীন বাংলার পতাকা ওড়ে এই দিনে
নাজিম হাসান, রাজশাহী থেকে:
একাত্তরের ১৮ ডিসেম্বর এই দিনে রাজশাহী পাক হানাদার মুক্ত হয়েছিল। দু’দিন আগে দেশ স্বাধীন হলেও রাজশাহীতে বিজয়ের পতাকা উড়েছিল আজকের এই দিনে। অবরুদ্ধ মানুষ এদিন নেমে এসেছিল রাজশাহীর মুক্ত বাতাসে। হারানো স্বজনদের খুঁজতে তারা ছুটে গিয়েছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুজ্জোহা হলে।
সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল নির্যাতিত অনেকের মরদেহ। রাজশাহীকে হানাদার মুক্ত ঘোষণা করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধকালীন ৭ নম্বর সেক্টরের ৪ নম্বর সাব-সেক্টরের কমান্ডার মেজর গিয়াস উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী (বীরবিক্রম)।
মুক্তিযুদ্ধকালে রাজশাহী ছিল ৭ নম্বর সেক্টরের অধীন। সেক্টর কমান্ডার মেজর নাজমুল হক শহীদ হওয়ার পর এই ৭ নম্বর সেক্টরের দায়িত্ব নেন কর্নেল কাজী নুরুজ্জামান (বীর উত্তম)। মুক্তিবাহিনীর অগ্রগামী একটি দল সাদা পতাকা উড়িয়ে সাদা পাগড়ি আর আত্মসমর্পণের বার্তা নিয়ে রাজশাহী শহরের উপকণ্ঠে এসে গেল। স্বজনদের ভিড় জমে উঠল বন্দীশালার আশেপাশে। বন্দীশালা থেকে বেরিয়ে আসা বন্দীরা আবেগে আপ্লত হয়ে পড়ল।
স্বজন হারানো শোকে আর বন্দীদশা থেকে মুক্ত হয়ে আসা নির্যাতিত-অত্যাচারীদের অঝোর অশ্রতে সিক্ত হতে থাকল রাজশাহীর এই মাটি। তাদের দোসররা এখানে সেখানে লুকিয়ে যায়। খাদ্য সংকট এড়াতে বিভিন্ন পাড়া মহল্লা থেকে মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্র বাহিনীর জন্য খাবার সরবরাহ করা হয়। রাজশাহীর মানুষ আজকের দিন থেকে নতুন দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে।









