সিরাজগঞ্জ শহরের ব্যস্ত জনজীবনের এক কোণে নিরবে, নিঃস্বার্থে পরিবেশের জন্য লড়ছেন একজন সাধারণ মানুষ নাম শহিদুল ইসলাম। তিনি পেশায় একজন নিম্নশ্রেণির কটনমিল কর্মচারী। প্রতিদিনের শ্রমের বিনিময়ে যা আয় হয়, তা দিয়েই কোনোভাবে চলে সংসার। কিন্তু সেই সীমিত আয়ের একটি অংশ বাঁচিয়ে তিনি যা করছেন, তা সত্যিই অবাক করার মতো।
সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকার ৭নং ওয়ার্ডের কোবদাস পাড়ার বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম শুধু গাছ লাগান না, তিনি একপ্রকার “সবুজ বিপ্লবের” নীরব নায়ক। জেলার বিভিন্ন স্কুল-কলেজের আঙিনা, রাস্তার ধারে কিংবা খালি জায়গায় তিনি নিজ উদ্যোগে লাগিয়েছেন অসংখ্য বৃক্ষ। নিজের হাতে গাছ লাগিয়ে পানি দিয়েছেন, আগাছা পরিষ্কার করেছেন, বড় হওয়ার অপেক্ষায় থেকেছেন এ যেন এক প্রাণের সম্পর্ক!
তাঁর কর্মযজ্ঞ এখানেই থেমে নেই। সিরাজগঞ্জ শহরের সবচেয়ে জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থান যমুনা নদীর হার্ড পয়েন্টে প্রতিনিয়ত ভিড় করে হাজারো মানুষ। সেই দর্শনার্থীদের কাছে তিনি প্রতি সপ্তাহে দুই দিন করে বিনামূল্যে বিতরণ করেন বিভিন্ন ফলজ ও বনজ গাছের চারা। যারা গাছ লাগাতে চান, উৎসাহ দেন, হাতে তুলে দেন চারা। অনেক দর্শনার্থী তার এই ব্যতিক্রমী কর্মকাণ্ডে অনুপ্রাণিত হয়ে ফিরে যান।
সবচেয়ে বিস্ময়কর কাজটি তিনি করেছেন বজ্রপাত থেকে জনসাধারণকে রক্ষার লক্ষ্যে। একান্ত প্রচেষ্টায় সিরাজগঞ্জ শহর ও আশপাশের এলাকায় ইতোমধ্যে রোপণ করেছেন ৩ হাজারের বেশি তালের বীজ। বজ্রপাত প্রতিরোধে তালগাছ যে কতটা কার্যকর, সে বিষয়ে সচেতনতা ছড়িয়ে দিয়েছেন বিভিন্ন স্থানে নিজ উদ্যোগে।
শুধু তালের বীজ নয় তিনি রোপণ করেছেন হাজার হাজার গাছ। বিতরণ করেছেন নিজ খরচে। কোনও এনজিওর সহায়তা নেই, নেই সরকারি অনুদান বা বাহবা তবুও তার নিষ্ঠা, দায়বদ্ধতা, ভালোবাসা যেন এক জীবন্ত বৃক্ষের মতোই ছড়িয়ে যাচ্ছে সমাজের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে।
পরিবেশ অধিদপ্তর কিংবা স্থানীয় প্রশাসনের চোখ এড়িয়ে গেলেও সমাজের সচেতন নাগরিকদের মতে, শহিদুল ইসলামের মতো মানুষেরা না থাকলে সবুজ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখা বোধ হয় অসম্ভব হয়ে পড়ত।
শহিদুল ইসলম বলেন, আমি বড় কোনো মানুষ না। কটনমিলে কাজ করি, যা পাই তা দিয়েই চলি। তবু মনে হয় গাছ লাগানোটা একটা সওয়াবের কাজ। এই গাছ হয়তো একদিন কারো ছায়া দিবে, কারো প্রাণ বাঁচাবে। এই চিন্তাই আমাকে শান্তি দেয়। তিনি আরও বলেন, বজ্রপাতের ভয় এখন গ্রামে গ্রামে। আমি বই পড়ে জেনেছি তালগাছ এই বিপদ ঠেকাতে পারে। তাই বীজ কুড়িয়ে এনে রোপণ করি। অনেক সময় মানুষ হাসে, কিন্তু আমি থামি না।
মো. সোলায়মান হোসেন নামের যমুনা পাড়ের এক চা দোকানি বলেন, প্রতি শুক্রবারে দেখি, শহিদুল ভাই নিজের টাকা দিয়ে চারাগাছ নিয়ে আসেন, মানুষকে দেন। অনেকে বলেন, উনি পাগল কিন্তু আমি বলি, উনি গাছের পাগল, ভালো পাগল।
নাজমুল হাসান, স্থানীয় কলেজ ছাত্র জানান, আমি ওনার কাছ থেকে পেয়ারা গাছের চারা নিয়েছি। তিনি শুধু গাছ দেন না, বুঝিয়ে দেন কিভাবে যত্ন নিতে হয়। উনি না থাকলে হয়তো অনেকেই এসব করত না।









