
‘জনাব জিয়া হায়দার স্বপন’ একজন সফল ছাত্র নেতা। জনগণের নেতা যাদের বলা হয় ভিপি স্বপন তাদেরই একজন। আজকে যারা ছাগলনাইয়ার যুবক নেতা তাদের বেশীর ভাগ তাঁর হাতে গড়া। তিনি সেই নেতা যিনি অনেক বোবাকে কথা বলা শিখিয়েছেন। কীভাবে বক্তৃতা দিতে হয়, কীভাবে অনুষ্ঠান পরিচালনা করতে হয়, সব তিনি ধরে ধরে প্রশিক্ষকের ভূমিকা নিয়ে শিখিয়েছেন। তিনি ভিপি নির্বাচিত হওয়ায় ছাগলনাইয়ায় বিএনপির শক্তিশালী ঘাঁটি হয়। বিএনপির রাজনীতির জন্য তাঁর অবদান উজ্জ্বল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তিনিই প্রথম ছাগলনাইয়া কলেজের নির্বাচিত ভিপি। বিপুল জনপ্রিয় নেতা ছিলেন ‘ভিপি স্বপন’। ১৯৮৯ সালে তিনি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের পক্ষ থেকে প্রার্থী হয়ে বিপুল ভোটে জয়ী হন। তিনি ‘ভিপি স্বপন’ নামে সর্বাধিক পরিচিত। অথচ তিনি বর্তমানে ‘মাসিক হায়দার সম্পাদক’ হিসেবে বেশী পরিচিত।
ছাত্র রাজনীতির পর্ব শেষ করে তিনি ব্যবসার কাজে মন দেন। পাশাপাশি তিনি পত্রিকা প্রকাশের কাজে হাত দেন। ছাগলনাইয়া উপজেলায় স্থানীয় সংবাদ প্রকাশের জন্য কোনো সংবাদপত্র ছিলো না। তখন ফেনী থেকে যে সব সাপ্তাহিক পত্রিকা বের হতো তার যথেষ্ট চাহিদা ছিলো। স্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ জাতীয় দৈনিকে তেমন পাওয়া যায় না। তিনি ভাবলেন কেবল ফেনীর সাপ্তাহিক পত্রিকা পড়ে ছাগলনাইয়া উপজেলার সব খবর পাওয়া যায় না। ছাগলনাইয়ার জনগণের সব খবর ধারণ করতে হলে নিজেরাই একটা সংবাদপত্র প্রকাশ করতে হবে। যদিও একটা সংবাদপত্র প্রকাশ করতে গেলে অনেক কাঠখড় পোহাতে হয়। নিয়মিত প্রকাশ করতে গেলে টাকা-পয়সারও প্রয়োজন হয়। ইত্যাদি নানা ভাবনা সামনে রেখে তিনি সাহস করে নেমে গেলেন ছাগলনাইয়া থেকে একটি মাসিক পত্রিকা বের করার কাজে। তিনি সফল হলেন। ‘মাসিক হায়দার’ নামে একটি পত্রিকা ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া থেকে প্রকাশিত হলো। যার সম্পাদক হলেন ‘জিয়া হায়দার স্বপন’। এভাবেই তিনি সাংবাদিকতার সাথে জড়িয়ে গেলেন। যে সময় তিনি সংবাদপত্র প্রকাশের চিন্তা করেন তখনকার সময় আজকের মতো মিডিয়া জগতে এতো ব্যাপক অগ্রগতি হয়নি।
মাসিক হায়দার ২০১৯ সালে ২০বছরে পদার্পন করেছে। ১৯৯৯ সালের জানুয়ারি মাস থেকে শুরু হয়ে গত ১৯ বছর নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হয়েছিলো মাসিক হায়দার পত্রিকা। মাসিক হায়দারের সরকারী রেজিঃ নং-চ-৩৫৭। প্রথম সংখ্যাতেই আমার লেখা দিয়েছিলাম। ১৯৯৯ সালের জানুয়ারি মাসেই শুরু করলেন প্রথম সংখ্যার কাজ। প্রথম সংখ্যা প্রকাশের সাথে সরাসরি স্বপন ভাইয়ার সাথে আমি যুক্ত থাকি। লেখার প্রুপ দেখাসহ অন্যান্য কাজে উনার সাথে খুব কাছ থেকে আমি জড়িত থাকি। সেই প্রথম সংখ্যা থেকেই পরবর্তীতে ২০০২ সাল পর্যন্ত আমি পত্রিকা প্রকাশের কাজে ভাইয়ার সাথে যথেষ্ট সময় পার করি। আমি ১৯৯০ সাল থেকে নিয়মিত সব জাতীয় দৈনিকে চিঠিপত্র কলামে লিখতাম। যার কারণে ভাইয়া আমাকে তার পত্রিকার কাজে ডাকতেন, লেখা চাইতেন। ছাগলনাইয়া ডাকবাংলা রোড়ে একটি কম্পিউটার দোকানে দু’জনে বসে নিউজগুলো সাজাতাম। আমি নিয়মিত হায়দারে লেখা দিই। এ পর্যন্ত মাসিক হায়দারে আমার প্রায় শতাধিক কলাম ছাপা হয়েছে। আমার লেখা ভাইয়া কখনো এডিট করতেন না। তবে সম্পূর্ণ পড়ে কিছু শব্দ পরিবর্তন করে দিতেন। উনার অভিজ্ঞতা অনেক বেশী। যে সব শব্দ বিতর্ক তৈরী করতে পারে বা রাজনৈতিক কারণে ঝামেলা হতে পারে সেটা উনি সুন্দরভাবে পরিবর্তন করে দিতেন। আমি এইসব পরিবর্তন থেকে শিখতাম। ছাগলনাইয়ার কয়েকজন সাংবাদিক যারা আজ অনেক সুপরিচিত তাদের শুরু কিন্তু মাসিক হায়দারে কাজ করেই। স্বপন ভাইয়া ছিলেন ধীরস্থির কখনো নিজেকে বেশী জান্তা ভাব নিতেন না। তিনি সবাইকে গুরুত্ব দিতেন। জুনিয়ররা কেউ কোনো পরামর্শ দিলে সেটাও তিনি স্বাভাবিক মেজাজে গ্রহণ করতেন।
উনি সম্পর্কে আমার খালাতো ভাই। শুধু বড়ভাই হিসেবে নয় উনাকে একজন ভালো মানুষ হিসেবে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করতাম। উনিও আমাকে খুব ¯েœহ করতেন-ভালোবাসতেন। আমাকে তিনি বিশ্বাস করতেন। কোনোদিন উনার সাথে আমার ক্ষুদ্র বা বৃহৎ কোনো বিষয় নিয়ে তর্ক বা মনোমালিন্য হয়নি। চাকরীর কারণে আমি কক্সবাজার অবস্থান করি দশ বছরেরও অধিককাল। ২০০৩ সাল থেকে কয়েক বছর আমি মাসিক হায়দারে লেখা পাঠাইনি। পরবর্তীতে ২০০৬ সাল থেকে ভাইয়ার অনুরোধে আবার কক্সবাজার থেকে লেখা পাঠানো শুরু করি। বেশ কয়েক বছর ডাকযোগে বা কুরিয়ার যোগে লেখা পাঠাতাম। পরে ই-মেইলে লেখা পাঠাতাম।
তিনি ছিলেন সময়ের চাইতে আধুনিক চিন্তা-ভাবনার লোক। যা অন্তত আমি তাকে কাছ থেকে দেখে জেনেছি। তিনি মাদ্রাসায় পড়ালেখা করেছেন। কিন্তু রাজনীতির বাইরেও তিনি ছিলেন একজন সাংস্কৃতিক চিন্তা-চেতনা সম্পন্ন মানুষ। তিনি নিজে কখনো গান গাইতেন না কিন্তু সংগীত অনুরাগী ছিলেন। তিনি সাহিত্য প্রেমীও ছিলেন। তার সাংস্কৃতিক মানসিকতার পরিচয় দেওয়ার জন্য দুইটা বড় ঘটনা তুলে ধরছি।
ছাগলনাইয়া কলেজে তিনি ভিপি নির্বাচিত হওয়ার পর তার জন্য এক বিশাল অভিষেক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতো বিশাল অনুষ্ঠান ছাগলনাইয়া কলেজের ইতিহাসে আর হয়নি। তখন অধ্যক্ষ ছিলেন সকলের শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক ‘অধ্যক্ষ মোহাম্মদ হোসেন খান’ স্যার। যিনি ছিলেন আরোও বেশী উদার। অনুষ্ঠানে প্রধান মেহমান করে আনা হয় বিশিষ্ট সাংবাদিক গিয়াস কামাল চৌধুরীকে। তখনকার সময়ে সাংবাদিক গিয়াস কামাল চৌধুরীর অসাধারণ জনপ্রিয়তা ছিলো। পাইলট হাইস্কুল মাঠে বিশাল প্যান্ডেলে অনুষ্ঠান হয়। কলেজের সব প্রতিভাবান ছাত্র-ছাত্রীদের দিয়েই সম্পূর্ণ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি করা হয়। ওই অনুষ্ঠানে আমিও গান পরিবেশনার সুযোগ পেয়েছিলাম।
আর একবার ছাগলনাইয়ায় বড় একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সময়টা যথাসম্ভব ১৯৯৬-৯৭ সালে। যা ছিলো খুব আলোচিত। পুরো অনুষ্ঠানটি স্বপন ভাইয়ার প্রত্যক্ষ তত্বাবধানে পরিচালিত হয়। এমন একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা নিয়ে আমি ভাইয়ার সাথে শেয়ার করি। তিনি অত্যন্ত উৎসাহের সাথে সাড়া দেন। ওই অনুষ্ঠানটির নাম দিয়েছিলাম “অভিনন্দন”। প্রায় দুই মাসব্যপী আয়োজনে উক্ত অনুষ্ঠানের সব খরচ তিনি ব্যবস্থা করেন। ছাগলনাইয়া কলেজ রোড়স্থ ‘ছাগলনাইয়া কমিউনিটি সেন্টার’-এ এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। শিল্পী জসিম জুয়েলকে ঢাকা থেকে আনা হয়।
তাকে মাসব্যপী রাখা হয় গানের রিহার্সেল করার জন্য। স্থানীয় পর্যায়ের কিশোর তরুন ছেলে-মেয়েদের মধ্যে যারা গান কবিতা অভিনয়ের জন্য আগ্রহী তাদের দিয়ে তৈরী করা হয় এই অনুষ্ঠান।
এই অনুষ্ঠান নির্মাণের সব কাজে ভাইয়ার সাথে আমি সরাসরি জড়িত ছিলাম। এই অনুষ্ঠানের সাথে আরোও জড়িত ছিলেন এবং কাজ করেছিলেন আর. কে. শামীম পাটোয়ারী। শামীম পাটোয়ারী কবিতা আবৃত্তিও করেন। এই অনুষ্ঠানটি দেখার জন্য টিকিট কাটতে হয়েছে দর্শকদের। বলা যায় অনুষ্ঠানটিকে বিটিভির ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান নির্মাণের আদলে তৈরী করা হয়েছিলো। গান কবিতা নৃত্য দর্শকপর্ব কৌতুক পরিবেশনাসহ এককথায় শিল্পমান সম্পন্ন একটা পরিপূর্ণ ‘ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান’। দর্শক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ছাগলনাইয়ার প্রশাসনের শিক্ষাঙ্গনের এবং এলাকার বিশিষ্ট সব গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। উক্ত অনুষ্ঠানে আমার সিঙ্গেল একটা গান ছিলো এবং কবিতা আবৃত্তি ছিলো। অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় ছিলেন জিয়া হায়দার স্বপন নিজে। পুরো অনুষ্ঠানটি ভিডিও করা হয়েছিলো। ভিডিওটি পরবর্তীতে এডিটিং করতে আমি ও ভাইয়া ঢাকায় সোবহানবাগ এলাকায় যাই। এডিটিং রুমে আমরা দু’জন ঘন্টার পর ঘন্টা বসে একটা পরিপূর্ণ ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের ক্যাসেট তৈরী করি। আরোও বলে রাখি হল রুমের রেকডিং ছাড়াও প্রতিটা শিল্পির গানের জন্য আউটডোরে শুটিং করা হয়। সাতবাড়ি মন্দিরে কলেজের বাগানে শিল্পীদের সর্ট দৃশ্য নেওয়া হয়। যা মূল অনুষ্ঠানের সাথে জুড়ে দেওয়া হয়। ভিডিওটি তখনকার স্থানীয় লোকেরা ভিডিও দোকান থেকে ভাড়া করে নিয়ে দেখেছে। ভিডিওটি সিডি করা হয়নি। সময়ের ব্যবধানে আমার কাছে রক্ষিত ভিডিওটির ফিতা নষ্ট হয়ে যায়। ভাইয়া নিজে কোথাও এটা সংরক্ষণ করেছিলেন কিনা আমার জানা নেই।
সবার প্রিয় জিয়া হায়দার স্বপন গত ১১ই আগস্ট সৌদি আরবে হজ্ব পালনকালে ইন্তেকাল করেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্নাইলাইহি রাজেউন। তিনি অত্যন্ত সাধাসিধা জীবন যাপন করতেন। তার রাজনৈতিক পরিচয় প্রধান হলেও কালের গর্বে তাও একদিন হয়তো হারিয়ে যাবে কিংবা মুছে ফেলা হবে। কিন্তু তার হাতে গড়া বিশ বছরের একটা পত্রিকা ‘মাসিক হায়দার’ ছাগলনাইয়ার ইতিহাসের সাথে মিশে গেছে। যা আর কোনো দিন মোছা যাবে না। তাই তিনি আগামী প্রজন্মের কাছে “মাসিক হায়দার পত্রিকার সম্পাদক” পরিচয়েই বেঁচে থাকবেন। আল্লাহপাক উনাকে জান্নাতুল ফেরদাউস নছীব করুন। আমীন ।।
লেখকঃ
হারুনুর রশিদ আরজু
কলামিস্ট ও রাজনীতি বিশ্লেষক।
মেইল- arzufeni86.com









