আজ ১৭ এপ্রিল দিনাজপুরের ফুলবাড়ী আঁখিরা গণহত্যা দিবস। আজকের এই দিনে ১৯৭১ সালে
উপজেলার আলাদীপুর ইউনিয়নের বারাইহাট থেকে ১০০ গজ দূরে আঁখিরা নামক পুকুরপাড়ে খান সেনাদের
হাতে প্রাণ হারায় ভারতে আশ্রয় নিতে যাওয়া ফুলবাড়ী, নবাবগঞ্জ, পার্বতীপুর ও বদরগঞ্জ উপজেলার প্রায় ৫শ’র
অধিক নারী-পুরুষ ও শিশু। আজও সেই ঘটনার বেদনাবিধুর স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছেন অনেকে।
এদিকে আঁখিরা বধ্যভূমিটিতে স্বাধীনতার ৫০ বছর পর স্মৃতি স্তম্বের নির্মাণ কাজ শুরু
হলেও,এখনো শেষ হয়নি । তবে ৯০ ভাগ কাজ শেষ হওয়ার দাবী করেছেন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। দিনাজপুর
গণপুর্ত বিভাগের তত্বাবধায়নে গত বছরের ১৩ জানুয়ারী এই স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ কাজ শুরু করা হয়,যার
মেয়াদ ছিলো ডিসেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু কাজের ডিজাইন পরিবর্তনের কারনেই কাজ যথা সময়ে শেষ করা
সম্ভব হয়নি বলে দাবী করেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার।
সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে,মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এর অধিনে বধ্যভূমি সংরক্ষণ ও স্মৃতিস্তম্ভ
নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় দিনাজপুর গণপুর্ত বিভাগের তত্বাবধায়নে ৬৮ লাখ ৩৪ হাজার ৯৫৭ টাকা ব্যয়ে
গত বছরের ১৩ জানুয়ারী এই স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ কাজ শুরু করা হয়। এরপর বছর পেরিয়ে গেছে,কিন্ত শেষ
হয়নি কাজ।
১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন সময় ফুলবাড়ী উপজেলার পার্শ্ববর্তি নবাবগঞ্জ উপজেলার
আলদাতপুর প্রামানিক পাড়া, নাপীতপাড়া ও পুর্বপাড়া এবং খোশলামপুর গ্রামের শতাধিক নারী পুরুষ ও
তাদের শিশু সন্তানদের নিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময়, ওই দলটি ফুলবাড়ী উপজেলার বারাই আখিরা পুকুর
পাড়ে গেলে,এলাকার কুখ্যাত রাজাকার কেনান সরকার তাদেরকে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর হাতে তুলে দেয়।
এসময় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী শিশুসহ শতাধিক নারী পুরুষদের হত্যা করে এবং যুবতি নারীদের ধরে
নিয়ে যায়। এরপর থেকে এই জায়গাটি আঁখিরা বধ্যভূমি হিসেবে পরিচিত পায়।
মুক্তিযোদ্ধা ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ১৯৭১ সালে পাক হানাদার বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা পেতে
ফুলবাড়ী উপজেলার পার্শ্ববর্তি নবাবগঞ্জ উপজেলার আলদাতপুর প্রামানিক পাড়া, নাপীতপাড়া ও পুর্বপাড়া
এবং খোশলামপুর গ্রামের ৫শ’র অধিক হিন্দু ধর্মালম্বী নারী-পুরুষ ও শিশু একত্রিত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়ার
চেষ্টা করে। এসময় রামভদ্রপুর গ্রামের কুখ্যাত রাজাকার কেনান সরকার তাদেরকে ভারতে পৌছে দেয়ার কথা বলে
তাদের নিকট থেকে সোনা-চাঁদি ও নগদ অর্থ নিয়ে তাদেরকে ভারতে পৌছানের জন্য যাত্রা শুরু করে। ৫শ’র
অধিক মানুষের এই দলটি উপজেলার শিবনগর ইউনিয়নের শিবনগর গ্রামের মধ্য দিয়ে সমশের নগর গ্রাম হয়ে
বারাইহাট হাট থেকে ১০০ গজ দুরে আঁখিরা নামক একটি পুকুরপাড়ে পৌছামাত্র, রাজাকার কেনান সরকার
ও তার সঙ্গীরা ওই নিরীহ মানুষদেরকে পাক হানাদার বাহিনীর হাতে তুলে দেয়। পাক হানাদার বাহিনীর সদস্যরা
ওই ৫শ’র অধিক মানুষকে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করে। এসময় দলে থাকা অধিকাংশ
যুবতি নারীদের ধরে নিয়ে যায় তারা। এই ঘটনার কয়েকদিন পরেও মানুষের মৃতদেহ গুলি সেখানে পড়ে থাকায়,
রাতের অন্ধকারে স্থানীয় বাসীন্দারা ও মুক্তি যোদ্ধারা সেখানে খাল খনন করে পুঁতে দেয়।
ভাগ্যের জোরে বেঁচে যাওয়া ওই দলের সহযাত্রীরা জানায় কুখ্যাত রাজাকার কেনান সরকারের কথায়
বিশ্বাস করে যাত্রা শুরু করেছিল প্রায় ৫শতাধিক মানুষ। কিন্তু তাদের বিশ্বাস এভাবে ধ্বংস হয়ে যাবে তারা
বিন্দুমাত্র বুঝতে পারেনি।
এদিকে আখিঁরা গণহত্যা বর্ণনা করতে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শী ও মুক্তিযোদ্ধারা বলেন,এই হত্যাকান্ডের
পর খান সেনারা সেখান থেকে চলে গেলে,তারা সেখানে এসে দেখতে পান শত শত নারী-পুরুষ ও শিশুর গুলিবিদ্ধ
মৃত্যু দেহ। এরই মধ্যে একটি এক থেকে দেড় বছর বয়সের শিশু তার মৃত মায়ের স্তনের দুগ্ধ পান করতে দেখে ওই
শিশুটিকে উদ্ধার করে পরবর্তিতে তার আত্মীয়ের নিকট পৌছে দেয়া হয়। একই কথা বলেন,আর এক
প্রত্যক্ষদর্শী বড়গাছা গ্রামের আব্দুল খালেক, তিনি বলেন বহু দিন পর্যন্ত এই পুকুরটিতে মানুষের হাড় ও
মাথার খুলি পড়ে ছিল। সে দিনের সেই স্মৃতি তার চোখের সামনে আজও ভেসে ওঠে।
ফুলবাড়ী উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মো.লিয়াকত ও সাবেক
ডেপুটি কমান্ডার এছার উদ্দিন বলেন, ফুলবাড়ীর যে কয়টি ঘৃন্ন কু-কর্মের অধিকারী রাজাকার ছিল তাদের
মধ্যে কেনান সরকার অন্যতম। সে শুধু ওই ৫শ মানুষের প্রাণই নেয়নি, তার হাতে নিহত হয়েছে ফুলবাড়ীসহ
কয়েকটি উপজেলার কয়েক হাজার নিরীহ মানুষ। এ জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে তার মৃত্যু হয়েছে। তার অনেক
সঙ্গী এখন ফুলবাড়ী থেকে বিতাড়িত। তিনি ওই ঐতিহাসিক বধ্যভূমিটি স্মৃতি স্তম্বের নির্মাণ কাজ
শেষ না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো.রিয়াজ উদ্দিন জানান,বদ্ধভুমি নির্মাণ কাজের বিষয়টি
যেহেতু গণপুর্ত বিভাগ তত্বাবধায়ন করছেন,তাই বিষয়টি তারাই ভালো বলতে পারবেন।









