বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে মনে পড়ে। আমরা যখন জীবন সংগ্রামে চলতে গিয়ে হোঁচট খাই তখন রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য সংগীত ও কবিতা নানাভাবে দিক নির্দেশনা দেয়। আমাদের প্রেম দুঃখ আনন্দ এবং হতাশার মুহুর্তে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকে ধারণ করলে মনে শক্তি সঞ্চয় হয়। ঠিক এই সময় মনে পড়ছে রবীন্দ্রনাথের ‘জুতা আবিষ্কার’ কবিতাটির কথা। যখন মানুষের পায়ে জুতা ছিলো না তখন মানুষ কত চিন্তা গবেষণা করে ‘জুতা আবিষ্কার’ করে তার একটি রম্য উপস্থাপন হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের “জুতা আবিষ্কার” কবিতা। এই কবিতাটির মূল চরিত্র “হবু রাজার” সাথে আজকের বিশ্বের অনেক মন্ত্রীর বা রাষ্ট্র প্রধানের নির্বুদ্ধিতার মিল খুঁজে পাওয়া যায়। যদি রাষ্ট্রের যারা পরিচালক তারা ভুল কথা বলেন এবং ভুল কাজ করেন কিংবা ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তাহলে সমাজে বা রাষ্ট্রে যে কী রকম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে, কবি তা এই কবিতায় হাস্যরসের মাধ্যমে বুঝিয়ে দিয়েছেন। শত বছর আগে রচিত কবিতা আজও কতটা প্রাসঙ্গিক তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এবার কীভাবে ‘জুতা আবিষ্কার’ হয়েছে তার বর্ণনা শুনি কবিতায় । ‘হবু রাজা’ তার পারিষদের গবু মন্ত্রীকে’ উদ্দেশ্য করে বলছেন-
“কহিলা হবু শুন গো গোবুরায়
কালিকে আমি ভেবেছি সারা রাত্র-
মলিন ধুলা লাগিবে কেন পায়
ধরনী-মাঝে চরণ-ফেলা মাত্র!”
‘হবু রাজা’ সারারাত ভাবলেন তার পায়ে কেনো ধূলা লাগবে? রাজার রাজ্যের ধুলা-মাটি রাজার পায়ে লাগে এটা কিছুতেই মানা যায় না। রাজা বললেন-
“শীঘ্র এর করিবে প্রতিকার,
নহিলে কারো রক্ষা নাহি আর।”
রাজার এই কঠোর নির্দেশ জারি হওয়ার পর গোটা রাজ্যে হৈচৈ লেগে গেলো। মন্ত্রীদের আর কারো চোখে ঘুম থাকলো না। রাজ্যের পন্ডিতরা চিন্তায় পড়ে গেলেন। বাড়িতে কারো রান্না চড়ে না। সবার কান্নাকাটি। অনেক চিন্তা করে একজন তেলবাজ রাজাকে বললো-
“যদি না ধুলা রাগিবে তব পায়ে,
পায়ের ধুলা পাইব কী উপায়ে!”
রাজার নির্দেশ একটাই, এসব পদধুলির তত্ত্ব বাদ দিয়ে পায়ের ধুলা দূর করার উপায় বের করতেই হবে। রাজ্যের যত বৈজ্ঞানিক যত জ্ঞানীগুণী পন্ডিত বড় বড় উপাধীধারী মন্ত্রী আমলা সবার চিন্তা একটাই রাজার পায়ে ধুলা না লাগার উপায় বের করতে হবে। সবাই বিবিধ তত্ত্ব খুঁজে উপস্থাপন করে। তারমধ্যে একটা হচ্ছে ঝাঁটা দিয়ে সব ধুলা দূর করা। এবার রাজ্যের সব জ্ঞানী গুণী মন্ত্রী পন্ডিতরা বুদ্ধি বের করলেন। তারা সবাই সিদ্ধান্ত নিলেন রাজ্যের ধুলা সব ঝাঁট দিয়ে দিলে আর রাজা মশায়ের পায়ে ধুলা লাগবে না।
সকলে মিলি যক্তি করি শেষে
কিনিল ঝাঁটা সাড়ে-সতের লক্ষ,
ঝাঁটের চোটে পথের ধুলা এসে
ভরিয়া দিল রাজার মুখ বক্ষ।
ঝাঁটা দিয়ে গিয়ে যা সর্বনাশ হলো- গোটা রাজ্য ধুলার মেঘে ঢেকে যায়। লোকজনের হাঁচি কাশি অসুখ লেগে গেলো। এবার রাজা বললেন-
কহিল রাজা, ‘করিতে ধুলা দূর,
জগৎ হলো ধুলায় ভরপুর!’
এবার ধুলা দূর করার উপায় বের করা হলো। রাজ্যের সব পুকুর খালবিল নদী থেকে পানি তুলে ধুলায় মারা শুরু করলো। এবার দেখা দিলো দিলো পানি সংকট। মাছ সব মরে যাচ্ছে পানির অভাবে নদীতে নৌকা চলে না। এসব কান্ডে এবার রাজা আরোও বিরক্ত হলেন।
কহিল রাজা, ‘এমনি সব গাধা
ধুলারে মারি করিয়া দিল কাদা!’
কোনো কিছুতেই পরামর্শকদল ধুলা দূর করার উপায় খুঁজে পাচ্ছে না। আবার পরামর্শ সভায় বসে। কেউ বলেন গোটা রাজ্য মাদুর পাটি দিয়ে ঢেকে ফেলো। এটাও পছন্দ হয় না। এবার সুন্দর একটা চিন্তা মাথায় আসে। রাজাকেই ঘরে আটকে রাখতে হবে।
কহিল কেহ, ‘রাজারে ঘরে রাখো,
কোথাও যেনো থাকে না কোনো রন্ধ্র!
ধুলার মাঝে না যদি দেন পা
তা হলে পায়ে ধুলা তো লাগে না।’
এই প্রস্তাবও রাজার পছন্দ হলো না। কারণ ধুলা মাটির ভয়ে তিনি সারাদিন ঘরে আটক থাকলে রাজ্য চলবে কীভাবে? আরেকটা নতুন চিন্তা মাথায় এলো। চামড়া দিয়ে গোটা রাজ্য ঢেকে দিতে হবে। তবে যোগ্য মত চামার খুঁজে বের করতে হবে। আবার এতো চামড়া কীভাবে জোগাড় হবে সেই চিন্তাও করতে হচ্ছে। যাক, শেষ পর্যন্ত একজন বৃদ্ধ চামার পাওয়া গেলো। কীভাবে রাজামশায় ধুলা থেকে রক্ষা পাবে তাকে সেই উপায় বের করতে বলা হলো। একথায় বৃদ্ধ কিঞ্চিত হাসি দেয়। অনুমোতি নিয়ে সহজ উপায় বলে দেয়।
‘নিজের দুটি চরণ ঢাকো, তবে
ধরণী আর ঢাকিতে নাহি হবে।’
শেষ পর্যন্ত বৃদ্ধ চামারের বুদ্ধিতে রাজার পা দুটি চামড়া দিয়ে ঢেকে দিলো। এভাবে হলো ‘জুতা আবিষ্কার’। এটা শুধু হাসির কবিতা নয়। মানুষের কিছু বোকামীর চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বর্তমান বিশ্বের প্রায় ২০০টিরও বেশী দেশ আজ ‘করোনাভাইরাসে আক্রান্ত’। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশেও এসে হানা দিয়েছে এই ‘করোনাভাইরাস’। বিশ্ব আজ লগডাউন। সবাই ঘরে বন্দি জীবন যাপন করছে। কেউ রাস্তায় বের হচ্ছে না। সবার মুখে মাস্ক। কিছু বোকামীর কারণে আজ আমরা গৃহবন্দি। যারা বিদেশ থেকে রোগ নিয়ে এসেছেন কেবল তারাই গৃহে বন্দি থাকার কথা ছিলো। যারা আক্রান্ত তারাই মাস্ক ব্যবহার এবং আইসোলেশনে থাকার কথা ছিলো। কিন্তু আজ গোটা জাতি চরম মাশুল দিতে হচ্ছে। আজ আমরা সবাই “করোনারোগী” হয়ে বন্দি আছি। রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকলে হয়তো আজকের এই পরিস্থিতিতে “করোনারোগী আবিষ্কার” নিয়ে অবশ্যই কবিতা লিখতেন এবং জাতি করোনারোগী চিহ্নিত করার উপায় খুঁজে পেতো।
লেখকঃ কলামিস্ট ও সাংস্কৃতিক কর্মী।
arzufeni86@gmail.com









