২১শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, মঙ্গলবার, ৮ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৩রা জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

শিরোনামঃ-




সতর্কতার বিকল্প নেই-আতঙ্কের নাম হাম

নয়া আলো অনলাইন ডেস্ক।

আপডেট টাইম : এপ্রিল ০২ ২০২৬, ১০:০১ | 658 বার পঠিত | প্রিন্ট / ইপেপার প্রিন্ট / ইপেপার

::ডাঃ মোঃ মোহসেনুল মোমেন::

বাংলাদেশ আবারও এক পুরোনো কিন্তু ভয়ংকর সংক্রামক রোগের মুখোমুখি। হাম। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতি, টিকাদান কর্মসূচির বিস্তার এবং সচেতনতা বৃদ্ধির পরও এই রোগটি বারবার ফিরে আসে, বিশেষ করে যখন সমাজে অসচেতনতা, গুজব এবং অবহেলা জায়গা করে নেয়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়া এবং মৃত্যুর খবর জনমনে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে হাম সম্পর্কে সঠিক ধারণা, প্রতিরোধ এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন অত্যন্ত জরুরি।

হাম মূলত একটি ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ, যার কারণ মরবিলিভাইরাস (Morbillivirus)। এটি অত্যন্ত দ্রুত ছড়ায় এবং একে মানব ইতিহাসের অন্যতম মারাত্মক সংক্রামক রোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সংক্রমণের হার এতটাই বেশি যে, একটি আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে গড়ে ১২ থেকে ১৮ জন পর্যন্ত মানুষ আক্রান্ত হতে পারে। তুলনামূলকভাবে, সাম্প্রতিক মহামারী কোভিড-১৯ এর ভাইরাসের (SARS-CoV-2) সংক্রমণ হার ছিল অনেক কম। এই তথ্যই বোঝায়, হাম কতটা ভয়ংকর হতে পারে।

হামের সংক্রমণ প্রধানত বায়ুবাহিত। আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি বা হাঁচি দিলে ভাইরাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং সেই ভাইরাস ২ থেকে ৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বাতাসে ভেসে থাকতে পারে। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে না এলেও একই ঘরে থাকা অন্য কেউ সহজেই সংক্রমিত হতে পারেন। বিশেষ করে যারা টিকা নেয়নি বা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

আমাদের সমাজে হাম নিয়ে নানা ধরনের ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, শিশুদের গায়ে যেকোনো র‍্যাশ বা ফুসকুড়ি মানেই হাম। আবার কেউ কেউ বিশ্বাস করেন, এটি খুব সাধারণ একটি রোগ, যা চিকিৎসা ছাড়াই সেরে যায়। এই ধারণাগুলো একদিকে যেমন বিভ্রান্তিকর, অন্যদিকে বিপজ্জনকও। কারণ, হাম শুধু একটি সাধারণ জ্বর বা র‍্যাশ নয়, এটি একটি জটিল রোগ, যা সঠিকভাবে চিকিৎসা না করলে প্রাণঘাতী হতে পারে।

হামের লক্ষণ সাধারণত জ্বর দিয়ে শুরু হয়। এই জ্বর দ্রুত বাড়তে থাকে এবং অনেক সময় ১০৩ থেকে ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় তীব্র কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং চোখ লাল হয়ে যাওয়া। আলোতে চোখে অস্বস্তি বা জ্বালাপোড়াও দেখা যায়। কয়েক দিনের মধ্যে মুখের ভেতরে গালের পাশে ছোট সাদা দাগ, যাকে ‘কপলিক স্পট’ বলা হয়, তা দেখা দিতে পারে। এরপর শুরু হয় ফুসকুড়ি বা র‍্যাশ, যা প্রথমে মুখ ও কানের পেছনে দেখা দেয় এবং ধীরে ধীরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।

শিশুদের ক্ষেত্রে হাম সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে পাঁচ বছরের নিচের শিশু এবং অপুষ্টিতে ভোগা শিশুরা বেশি আক্রান্ত হয় এবং তাদের জটিলতার সম্ভাবনাও বেশি থাকে। হামের কারণে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, কানের সংক্রমণ, এমনকি দৃষ্টিহানিও হতে পারে। আরও ভয়ংকর বিষয় হলো, কিছু ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে প্রদাহ বা এনসেফালাইটিস দেখা দেয়, যা মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

হামের একটি দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা হলো SSPE (Subacute Sclerosing Panencephalitis), যা অত্যন্ত বিরল হলেও মারাত্মক। এই রোগটি সাধারণত হামে আক্রান্ত হওয়ার ৭ থেকে ১০ বছর পর দেখা দেয় এবং এটি ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

তবে আশার কথা হলো, হাম প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ। টিকাদানের মাধ্যমে এই রোগ থেকে প্রায় সম্পূর্ণ সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব। বাংলাদেশ সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI)-এর আওতায় হাম ও রুবেলা প্রতিরোধে এমআর (MR) টিকা দেওয়া হয়। শিশুর ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হলে প্রায় ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়।

দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক অভিভাবক এখনও টিকা নিয়ে দ্বিধায় ভোগেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো ভুয়া তথ্য, গুজব এবং অজ্ঞতার কারণে অনেকেই তাদের সন্তানকে টিকা দিতে অনীহা প্রকাশ করেন। এর ফলাফল ভয়াবহ একদিকে শিশুর জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে, অন্যদিকে সমাজে রোগের বিস্তার ঘটে।

হামের চিকিৎসা মূলত উপসর্গভিত্তিক। অর্থাৎ ভাইরাসকে সরাসরি নির্মূল করার মতো নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই। তাই চিকিৎসার মূল লক্ষ্য থাকে রোগীর জ্বর নিয়ন্ত্রণ, পানিশূন্যতা রোধ এবং জটিলতা প্রতিরোধ করা। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হলে জটিলতা কমে এবং সুস্থতার সম্ভাবনা বাড়ে।

হামে আক্রান্ত রোগীকে অবশ্যই আলাদা করে রাখতে হবে, যাতে অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ না ছড়ায়। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাবার এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। রোগীর অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া উচিত। বিশেষ করে শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি, তীব্র ডায়রিয়া বা চেতনা হারানোর মতো লক্ষণ দেখা দিলে বিলম্ব না করে চিকিৎসা নিতে হবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সচেতনতা। পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র সব পর্যায়ে সম্মিলিতভাবে কাজ না করলে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। গণমাধ্যম, স্বাস্থ্যকর্মী এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে সঠিক তথ্য প্রচারের জন্য। একই সঙ্গে গুজব ও ভুল ধারণা দূর করতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

বাংলাদেশ অতীতে টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে অনেক সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে সফলতা অর্জন করেছে। পোলিও নির্মূল তার অন্যতম উদাহরণ। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে হাম প্রতিরোধেও সফল হওয়া সম্ভব। তবে এর জন্য প্রয়োজন সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা, সচেতনতা এবং দায়িত্ববোধ।

একটি বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে হাম কোনো সাধারণ রোগ নয়, এটি একটি মারাত্মক জনস্বাস্থ্য সমস্যা। একে অবহেলা করার সুযোগ নেই। একটি শিশুর জীবন বাঁচানো মানে একটি পরিবারের স্বপ্ন বাঁচানো, একটি দেশের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা।

অতএব, এখনই সময় সতর্ক হওয়ার। টিকাদান নিশ্চিত করা, লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া এবং সামাজিকভাবে সচেতনতা বৃদ্ধি এই তিনটি পদক্ষেপই পারে আমাদের এই ভয়ংকর রোগ থেকে রক্ষা করতে।

সর্বোপরি, আতঙ্ক নয় সচেতনতা হোক আমাদের শক্তি। নিয়ম মেনে চলি, গুজব থেকে দূরে থাকি এবং সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিই। কারণ, সত্যিই সতর্কতার কোনো বিকল্প নেই।

লেখক:

নবজাতক রোগ, শিশু স্বাস্থ্য ও শিশু পুষ্টি বিশেষজ্ঞ
সহযোগী অধ্যাপক, কমিউনিটি মেডিসিন ও পাবলিক হেলথ বিভাগ
শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ, সিরাজগঞ্জ।

Please follow and like us:

সর্বশেষ খবর

এ বিভাগের আরও খবর

সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি- আলহাজ্ব আবদুল গফুর ভূঁইয়া,সাবেক সংসদ সদস্য, প্রধান সম্পাদক- খোরশেদ আলম চৌধুরী, সম্পাদক- আশরাফুল ইসলাম জয়,  উপদেষ্টা সম্পাদক- নজরুল ইসলাম চৌধুরী।

 

ঢাকা অফিস : রোড # ১৩, নিকুঞ্জ - ২, খিলক্ষেত, ঢাকা-১২২৯,

সম্পাদক - ০১৫২১৩৬৯৭২৭,০১৬০১৯২০৭১৩

Email-dailynayaalo@gmail.com নিউজ রুম।

Email-Cvnayaalo@gmail.com সিভি জমা।

প্রধান সম্পাদক কর্তৃক  প্রচারিত ও প্রকাশিত।

 

সাইট উন্নয়নেঃ ICTSYLHET