ডুমুরিয়ার চুকনগর বাজারের পশ্চিমে নরনিয়া মাদ্রাসা, হাইস্কুল থেকে শুরু করে পূর্বে মালতিয়া, কাঁঠালতলা বাজার ও উত্তরে ভদ্রানদী কালীবাড়ি। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই অঞ্চল জুড়ে উদ্ধাস্তুরা অবস্থান করছিলেন। ১৯৭১ সালের ২০শে মে সকাল ১১টা। সাতক্ষীরা সীমান্তের পাকিস্তানি বাহিনীর সদস্যরা পাতখোলা (বর্তমান চুকনগর ডিগ্রী কলেজ এলাকা) পৌছায়। অতর্কিতে শুরু হয় বর্বর হত্যাযজ্ঞ। চার-পাঁচ ঘণ্টার মধ্যেই এলাকাটি বধ্যভূমিতে পরিণত হয়। ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষকে হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীরা।
এ ঘটনার সাক্ষী আটলিয়া ইউনিয়নের মালতিয়া গ্রামের এরশাদ আলী মোড়ল। তিনি জানান, ওই দিন গণহত্যার পর বিকেল ৪টা দিকে ভয়ে ভয়ে তিনি সেখানে যান। হাজার হাজার লাশের ভেতর তিনি হঠাৎ দেখতে পান দেড় বছরের একটি শিশু শরীরে রক্তমাখা অবস্থায় তার মায়ের লাশের ওপর শুয়ে দুধ পান করছে। ছুটে গিয়ে শিশুটিকে তিনি তুলে এনে বাড়িতে নিয়ে যান। এরপর তিনি শিশুটিকে প্রতিবেশী মান্দার দাস ও তার স্ত্রী মালঞ্চ দাসীর কাছে দত্তক দেন। তখন শিশুটির নাম রাখা হয় রাজকুমারী ওরফে সুন্দরী দাসী।
১৯৮৪ সালে সুন্দরীর বিয়ে হয় একই এলাকার বাটুল সরকারের সঙ্গে। কিন্তু ১৯৯০সালে সুন্দরীর স্বামী বাটুল সরকার মারা যান। সুন্দরীর দুটি ছেলে থাকলেও তারা তাকে খেতে পরতে না দেওয়ায় ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে ডুমুরিয়ার একটি ইটভাটায় শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। এ খবর জেনে ঢাকা শিল্পকলা একাডেমির সহকারী পরিচালক মোস্তফা আহম্মেদ এবং ডুমুরিয়া উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির সদস্য সচিব নিতায় রায় পুরো ঘটনাটি শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকিকে জানান। কিছু দিনের মধ্যেই লাকী ডুমুরিয়া শিল্পকলা একাডেমিতে অফিস সহায়ক হিসেবে সুন্দরীকে চাকুরির ব্যবস্থা করে দেন। সুন্দরী এখন স্থানীয় কাঁঠালতলা আবাসন প্রকল্পের সরকারি ঘরে বসবাস করছেন। তিনি কিডনিসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত।
প্রসঙ্গত, ডুমুরিয়া উপজেলার আটলিয়া ইউনিয়নের চুকনগর বাজার থেকে দক্ষিণে এক কিলোমিটার দূরে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত চুকনগর পাতখোলা বধ্যভূমি। শুধু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেই নয়, পৃথিবীর ইতিহাসে ঘৃণ্যতম যেসব গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে সেগুলোর একটি চুকনগর গণহত্যা। ১৯৭১ সালের ১৯শে মে রাতে বৃহত্তর খুলনা, বটিয়াঘাটা, দাকোপ, মোরেলগঞ্জ, কচুয়া, শরণখোলা, মোংলা, দাকোপ, বাগেরহাট, রামপালত, ফরিদপুরে, বরিশালসহ বিভিন্ন অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ ভারতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ট্রানজিট হিসেবে বেছে নেন খুলনার আটলিয়া ইউনিয়নের চুকনগরকে। ২০শে মে সকালে তারা সাতক্ষীরা ও যশোর জেলার কলারোয়ার বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ভারতে ঢোকার জন্য সেখানে সমাবেত হন। তারা সবাই সেখানেই রাত কাটান।
কিন্তু ২০শে মে সকালে তিনটি ট্রাকে হঠাৎ পাকিস্তানি সেনারা চুকনগর বাজারের ঝাউতলায় (তৎকালীন পাতখোলা) এসে নামে। তাদের সঙ্গে ছিল হালকা মেশিনগান ও সেমি-অটিামেটিক রাইফেল। সাদা পোশাকে মুখঢাকা লোকজনও আসে। দুপুর ৩টা পর্যন্ত পাকিস্তানি বর্বর সেনাবাহিনী সমাবেত হওয়া নিরীহ মানুষের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে ১০ থেকে ১২ হাজার শিশু, নারী, ও পুরুষকে নির্বিচারে হত্যা করে। ওই হত্যাযজ্ঞ থেকে বাঁচতে অনেকেই পার্শ্ববতী নদীতে লাফিয়ে পড়ে ডুবে মারা যান।
সুন্দরী আক্ষেপের সঙ্গে জানান, ১৫ বছর আগে সরকারের পক্ষ থেকে উপজেলার চুকনগর বাজারে এলাকায় ১১ শতাংশ সরকারি খাসজমি বরাদ্দ পান তিনি। সেখানে ডোবা থাকায় অর্থাভাবে তা ভরাট করা সম্ভব হয়নি বলে জায়গাটি সেভাবে পড়ে আছে। স¤প্রতি ডুমুরিয়ার ইউএও আবদুল ওয়াদুদ ও আটলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান শেখ হেলাল উদ্দীন উপজেলার কাঁঠালতলা নদীর পাড়ে আবাসন প্রকল্পের একটি টিনশেডের পাকা ঘর বরাদ্দ দিয়েছেন। সেখানেই বসবাস করছেন সুন্দরী। তিনি বলেন, ‘এখন আমার খবর কেউ রাখে না। আমি পুরোনো সংবাদ হয়ে গেছি। আমার দুই ছেলে সুমন দাস ও ডেবিট দাস তারাও বেকার। জানুয়ারি থেকে কিডনি, হার্টের সমস্যায় ও কোমরের হাড়ে প্রচণ্ড ব্যথায় অফিসে যেতে পরি না। তাই বদলি হয়ে অফিসে কাজ করে তার ছেলে সুমন দাস। তিনি জানান, অসুস্থতার কথা জেনে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী তাকে নিজ উদ্যোগে স¤প্রতি ঢাকার নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসায় সহযোগিতা করেছেন।
আটলিয়া (চুকনগর) ইউটি চেয়ারম্যান শেখ হেলাল উদ্দীন বলেন, পাতখোলা ও তার আশপাশ এলাকায় আজও পাওয়া যায় সেদিনের শহীদদের হাড়গোড় ও তাদের শরীরে থাকা বিভিন্ন অলংকার। ইউএনও আবদুল ওয়াদুদ বলেন, স¤প্রতি সুন্দরীকে আবাসন প্রকল্পে একটি ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। উন্নত চিকিৎসাসহ আর্থিক বিষয়ে তাকে সব ধরণের সহযোগিতা করা হবে।









