দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে পাট চাষে আগ্রহ নেই কৃষকের,বিভিন্ন সময় কৃষিবিভাগের প্রণোদনার পরেও সোনালী আঁশ খ্যাত পাটের চাষ এখন বিলুপ্তির পথে। কৃষক নেতারা বলছেন,জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে কৃষি জমি অকৃষিতে পরিনত হওয়া,স্বল্প সময়ে জমিতে অধিক ফসল ফলানোর প্রবণতা,বর্ষা মৌসুমেও খাল,বিল নদীর পানি শুকিয়ে থাকা সেইসাথে পাট পচানো ও ছড়ানো নিয়ে সৃষ্ঠ ঝামেলার কারণে পাট চাষ যেন এখন কৃষকের অনিচ্ছা আর অবহেলার একটি বড় কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে।
এদিকে বিশ্বমানের সোনালী আঁশ খ্যাত পাটের পরিচিতি ও পাটশিল্পের শতবর্ষ পুরোনো অভিজ্ঞতা থাকলেও পাট চাষই যেন এখন কৃষকের কাছে একবিড়ম্বনা ও লোকসানের অপর নাম । তবে পাটের বিকাশের গোড়া কৃষকের হাতে,কৃষকদের প্রণোদনা দিয়ে পাট চাষে আগ্রহী করে তুলতে হলে দরকার সঠিক মূল্য ও বিক্রয় কেন্দ্রের নিশ্চয়তা এমনটিই মনে করেন তৃণমূলের কৃষক।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকের সাথে আলাপকালে জানা যায়,বিভিন্ন সময়ে পাটের দরপতন,উৎপাদন খরচ বেশী ও পাট ছড়ানো পানির অভাবে কৃষক পাট চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়,৬০ এর দশকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাটক্রয় কেন্দ্র ছিল,আবার বড় বড় জুট মিলের চাহিদা পূরণে কৃষকরা পাট চাষে ব্যাপক লাভবান হতো। অপরদিকে ক্রয় কেন্দ্রগুলো পাট সংগ্রহ করে বিদেশেও রপ্তানী করত। ফলে ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তির নিশ্চয়তা নিয়ে কৃষকরাও ঝুকে পড়তো ব্যাপকহারে পাট চাষে।
উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, এবছর ৫০ হেক্টর জমিতে পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও পাটের চাষ হয়েছে ৪৫ হেক্টর জমিতে। এই এলাকায় তোষা জাতীয় পাটের চাষ হয়েছে এবং হেক্টর প্রতি পাটের উৎপাদন ধরা হয়েছে ১১দশমিক ৮৩ বেল।
উত্তরকৃষ্ণ পুর গ্রামের কৃষক লক্ষীকান্ত রায় ও রঞ্জিত রায় জানান,বর্তমানে একজন দিনমজুরের দৈনিক হাজিরা ৩শ থেকে ৪শ টাকা। এক বিঘা জমির পাট কেটে তা জাগ দিয়ে শুকিয়ে ঘরে তুলতে যে পরিমাণ দিনমজুর লাগে তাতে পূর্বের খরচ মিলিয়ে মণপ্রতি পাটের দাম পড়ে ১ হাজার টাকার উর্দ্ধে। প্রতিমণ পাটের বাজার মূল্য ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত। এক্ষেত্রে উৎপাদন খরচ বেশী এবং বাজার মূল্য কম হওয়ায় তারা পাট চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। সময়মত পাট পচনের খালবিল গুলোতে পানি না থাকা ও মাছ চাষের পানি নষ্ট হওয়ার আশংকায় পাট জাগ দেয়া অনেক বড় সমস্যা তাই পাট চাষে তেমন আগ্রহ নেই তাদের।
এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি এটিএম হামিম আশরাফ বলেন, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে সঠিক সময়ে বৃষ্টিপাত না হওয়ায় অধিকাংশ নদী,নালা,খাল,বিল শুকিয়ে যাচ্ছে। ফলে পাট পচানো ও নিড়ানোর অনিশ্চয়তায় পাট চাষের একটা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষকদের পাট চাষে আগ্রহ বাড়াতে কৃষিবিভাগ থেকে নানাভাবে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। উপজেলার দৌলতপুর,খয়েরবাড়ী,শিবনগর,আলাদীপুর ও পৌরসভার কিছু অংশে পাট চাষ হয়েছে বলে তিনি জানান।
উল্লেখ্য গোল্ডেন ফাইবার বা সোনালী আঁশ নামে গৌরবান্বিত এক অধ্যায় ছিলো পাটের। বাংলাদেশে পাটের ভালো ফলন হওয়ায় ব্রিটিশ আমলে এ অঞ্চলে গড়ে ওঠে বড় বড় পাটকল। কিন্তু কালের বিবর্তনে পাটকলগুলো হয়ে ওঠে সরকারের গলার কাঁটা। পাট হয়ে ওঠে কৃষকের গলার ফাঁস। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০২ সালের ৩০ জুন বন্ধ করে দেয়া হয় এশিয়ার বৃহত্তম পাটকল আদমজি। বাংলাদেশে হারিয়ে যায় পাটের গৌরব। তবে পরিবেশ বান্ধব পাটজাত দ্রব্যের ব্যবহার বাড়াতে ফ্রান্সের নরম্যান্ডি শহরে নেট আপ ফাইবার নামের একটি প্রতিষ্ঠান ড্যাশ বোর্ড, দরজার প্যানেল, সীট কভার, স্পেয়ার হুইল কভার, গাড়ীর সিলিং কাভারসহ বিভিন্ন অংশ তৈরি করছে পাটের আঁশ দিয়ে।
বিভিন্নসূত্রে জানা যায়,এতকিছুই পরেও আশার আলো দেখিয়ে গাড়ি প্রস্তুতকারী আন্তর্জাতিক কোম্পানীগুলো বাংলাদেশের পাটের প্রতি ব্যাপকভাবে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। গাড়ির ভেতরের অংশ পরিবেশ বান্ধবভাবে তৈরি করতে তারা ব্যবহার করছে পাট। ফ্রান্সের নেট আপ ফাইবার নামে গাড়ির ভেতরের অংশ প্রস্তুতকারী ওই প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের সাথে যৌথ উদ্যোগে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করায়,বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশন বিজেএমসি সেই আগ্রহকে স্বাগত জানিয়েছে বলে জানা যায়।









