মা বলিতে প্রাণ করে আনচান চোখে আসে জল ভরে
-হারুনুর রশিদ আরজু
আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলের যিনি সভাপতি বা চেয়ারম্যান বা চেয়ারপার্সন তার সাথে দলের সব সাধারণ নেতা-কর্মীদের সম্পর্ক কী? আমি বোঝাতে চাইছি নেতা-কর্মীরা দলের প্রধানকে কী বলে ডাকবে অর্থাৎ সম্বোধন করবে?
এটা কি এমন, যে যার বয়স অনুযায়ী সম্পর্ক ঠিক করে নিবে? যেমন- যার বয়স 20 বছর সে 73 বছর বয়সী নেত্রীকে নানী ডাকবে। যার বয়স 40 বছর সে খালা ডাকবে। যার বয়স 60 বছর সে আপা বলে ডাকবে। সেরকম তো কাউকে নিজের বয়স চিন্তা করে সম্পর্ক মেপে নেত্রীকে ডাকতে দেখা যায় না। বরং দেখা যায় ছোট-বড় বয়ষ্ক নেতা-কর্মী সবাই এক রকমভাবে নেত্রীকে “আপা” বলে ডাকে। ধরে নিলাম “আপা” ডাকটাই উপযুক্ত যা সর্বজনীন। কিন্তু যখন আবেগপ্রবণ থাকে তখন ছোট বড় সবাই আপার বদলে “মা” বা “মাতা” বলে ডাকতে থাকে। তখন আবার সম্পর্ক উল্টে যায়। যিনি বাস্তবিকই আপা ডাকবেন তিনি ডাকছেন মা বলে। আর যে মা ডাকার কথা সে ডাকছে আপা বলে। কিংবা যে ডাকতো খালা সে ডাকছে আপা। দেখা যাচ্ছে নেত্রীকে ডাকার ক্ষেত্রে কোনো স্ট্যান্ডার্ড মানদণ্ড নেই। কোনো সঠিক মাপজোক নেই। যার যখন যা মন চায় এক এক দিন এক এক পরিবেশে কখনও মা কখনও আপা ডাকছে। এতে একধরনের সৌন্দর্যহানী ঘটে।
এটাতো নেতা কর্মীদের কান্ড যা প্রতিনিয়ত দেখা যায়, চোখে পড়ে। কিন্তু সবচেয়ে অবাক লাগে নেত্রীর সম্বোধন শুনে। তিনি সবাইকে উদ্দেশ্য করে যখন ভাষণ দেন তখন কী বলেন? তা কি আমরা জানি বা খেয়াল করি?
নেত্রী সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলেন-প্রিয় সংগ্রামী ভাই ও বোনেরা, কিংবা প্রিয় দেশবাসী “ভাই ও বোনেরা” আস্সালামুআলাইকুম।
এখন তাহলে সম্পর্ক কী দাঁড়ালো? নেত্রী নাতি থেকে সমবয়সী সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলছেন “ভাই-বোন”। তাহলে আমরা দেখছি নেতা কর্মীদের কাছে নেত্রীর পরিচয় কয়েক রকমের হয়, কিন্তু নেত্রীর কাছে সবার জন্য সম্বোধন একটাই হয় “ভাইবোন”। এটার কারণ একটাই, দলীয় প্রধান এবং নেতা কর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক হচ্ছে “রাজনৈতিক সম্পর্ক”। এখানে যিনি যে বয়সের হোন না কেনো তাতে কিছু যায় আসে না। ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা বয়স বিবেচনা করার সুযোগ নেই।এরকম অন্যান্য ক্ষেত্রেও দেখা যায়।
আমাদের দেশে পারিবারিক কিংবা সামাজিক জীবনে সম্পর্কটা হিসাব করা হয় বয়সের দিক বিবেচনা করে। যারা অনাত্মীয় তাদের ক্ষেত্রে এটা বেশী হিসাব করা হয়। আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকলে সেটা অবশ্যই ভিন্ন কথা।
কিন্তু সংগঠনের সাথে যখন মানুষ যুক্ত হয় তখন সম্পর্ক একটাই বিবেচনা করা হয়, তাহলো পরস্পর “ভাইবোন”। এখানে কোনো অবস্থাতেই বয়স বিবেচ্য নয়, আত্মীয়তা বিবেচ্য নয়। যেমন- ভোটের সময় প্রার্থীর পক্ষে পরিবারের সদস্যরাও বল,”আমার ভাই তোমার ভাই, কুদ্দুস ভাই শুক্কুর ভাই”। হয়তো ছেলে কিংবা ভাগিনা ভাই বলে শ্লোগান দিচ্ছে। এটা সংগঠনের প্রার্থী এই কারণে বলতে হচ্ছে। এমনিভাবে আমরা সাংস্কৃতিক জগতের দিকে তাকালে কিংবা চলচ্চিত্র জগতের দিকে তাকালে দেখি, সেখানে সব বয়সের শিল্পীরা জুনিয়র সিনিয়র একে অন্যকে ভাইবোন সম্বোধন করে। হোক তিনি বাবা কিংবা মার বয়সী।
সব জায়গায় বা সংগঠনে সম্বোধনের নিয়ম ঠিক থাকলেও কেবল রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে নিয়ম স্থির থাকে না। শুধু রাজনৈতিক জগতে সংগঠন করা স্বত্বেও সম্বোধন ঠিক না থাকার কারণ, এখানে তেলবাজী করতে গিয়ে সম্পর্ককে টেনে নেয় ব্যক্তিগত পর্যায়ে। এখানে দেখি নেত্রীকে একবার বলে আপা, যখন নিজের ক্ষমতার ভাব প্রকাশের প্রয়োজন হয়। তখন খুব মুড নিয়ে বলে,”আমি আপাকে বলে দিবো কাজ হয়ে যাবে”। ভাবখানা এমন দেখায় যেনো আপা(নেত্রী) ওর কথায় চলে। আবার দেখি এই বেটা নেত্রীকে মা ডাকছেন, যখন তিনি দেখেন তার পদ রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে কিংবা কোনো সুবিধা হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। তখন বলে,”আপনি আমার মমতাময়ী মা”। মুলত সুবিধা গ্রহণের জন্যই আপাকে আম্মা ডাকা হয়। আর এদের আবেগ দেখে রবীন্দ্রনাথের কবিতার লাইন মনে জাগে,”মা বলিতে প্রাণ করে আনচান চোখে আসে ভরে”!!
লেখকঃ কলামিস্ট ও আবৃত্তিকার ।
arzufeni86.@gmail.com









