একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন গৌরাঙ্গ রায়। এ সময় সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার সাচনা বাজার ইউনিয়নের হরিহরপুর গ্রামের এই বাসিন্দাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। একই গ্রামের রাজাকার সহযোগী আনিস উল্লাহ ও তার ছেলে আরফান উল্লাহদের সহযোগিতায় রাজাকার সত্তার মিয়া ও সুন্দর আলী গৌরাঙ্গকে সাচনা বাজারস্থ পাক বাহিনীর ক্যাম্পে নিয়ে হানাদারদের হাতে তুলে দেয় এবং পরে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
হরিহরপুর গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠদের সাথে কথা বলে জানা যায়, গৌরাঙ্গ রায় যুদ্ধ শুরু হলে পরিবার-পরিজন নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। পুরো পরিবারকে সেখানে রেখে ছোট্ট একটি নৌকায় করে বাড়িতে আসেন তিনি। এ সময় সাচনা গ্রামের চিহ্নিত রাজাকার সুন্দর আলী ও রামপুর গ্রামের সত্তার মিয়া হরিহরপুরে আসে এবং গৌরাঙ্গ রায়কে পাকড়াও করে ধরে নিয়ে যায়। বাড়ির পার্শ্ববর্তী ডোবায় ঝাঁপ দিয়ে বাঁচার চেষ্টা করেও রাজাকারদের নির্দয় নিশানা থেকে বাঁচতে পারেননি গৌরাঙ্গ রায়।
জানা যায়, গৌরাঙ্গ প্রাণভয়ে আমাদের সামনে দিয়ে দৌঁড়ে আরফান উল্লাহদের বাড়িতে গিয়ে উঠে। পরে তাদের বাড়ির পার্শ্ববর্তী একটি ডোবায় ঝাঁপ দেয় এবং কচুরিপানার নীচে নাক জাগিয়ে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করে। ততক্ষণে তার পেছনে ছুটে আসা দুই রাজাকার আমাকে জিজ্ঞেস করে ‘এইদিকে একটা মানুষ আইছে, কোনদিকে গেছে দেখছসনি?’ না, দেখিনি বললে, তারা ঐ ডোবার পারে গিয়ে দাঁড়ায় এবং পানি ঘোলা দেখে ছলের সুরে বলে ওঠে ‘ঐ গৌরাঙ্গ তরে দেইখ্যালাইছি, উইঠ্যা আয়, না হইলে গুল্লি কইরা দিমু।’ গৌরাঙ্গ তাদের ছলচাতুরি বুঝতে না পেরে বাঁচার আশায় উঠে দাঁড়ায়। টেনেহেছড়ে তৎক্ষণাৎ তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় আনিস উল্লাহর বাড়িতে। সেখান থেকে তাকে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে যায় রাজাকারেরা। কিন্তু ঐ বাড়ির কেউ তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেনি। ঐ রাজাকাররা এদের বাড়িতে প্রায় সময়ই আসত। তারা ইচ্ছা করলেই গৌরাঙ্গকে বাঁচাতে পারত। কিন্তু তারা তা করেনি। পরবর্তীতে আনিস উল্লাহর পক্ষ থেকে গৌরাঙ্গ রায়ের স্ত্রীকে দুই কিয়ার জমিও দেওয়া হয়। কিন্তু পরে এই জমি জোরপূর্বক আবার দখলে নিয়ে নেয় তারা।’
রাজাকার সহযোগী আনিস উল্লাহর ছেলে জয়নাল আবেদীন তাদের বাড়ি থেকে গৌরাঙ্গকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে স্বীকার করে বলেন, ‘স্বাধীনের পরে আমার আব্বারে ডাইক্যা নিয়া কয়জনে কইতাছে এই বেডিডা (গৌরাঙ্গের স্ত্রী মাতঙ্গিনী) অসহায় হইয়া পড়ছে দু’এক কিয়ার জমিন দিলাইন, তারা চলুক খাউক। ঐ আরকি আব্বায় দুই কিয়ার জমিন দিছে।’
এই জমি এখন কোথায়? প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এইডা সঠিক জানি না। আমরার দখলেই আছে না বিকি হইয়া গেছে, এইডা কইতা পারতাম না।’
গৌরাঙ্গ রায়ের স্ত্রী মাতঙ্গিনী রায় কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘রাজাকার সত্তার মিয়া ও সুন্দর আলী আমার স্বামীরে ধইরা আনিস উল্লাহর বাড়িত লইয়া গেছে। পরে তারা আনিস উল্লাহর কাছে দুই’শ টেকা চাইছে, তারা টেকা দিছে না। তখন আমার স্বামী বাঁচবার লাইগ্যা কইছে আরফান ভাই (আনিস উল্লাহর ছেলে) এরার বাড়িত আমরার ধান-চাল সবকিছু আছে, আমারে বাঁচাও ভাই। কিন্তু তারা বাঁচাইছে না। পরে রাজাকাররা আমার স্বামীরে টাইন্যা নৌকাত তুলছে। এরপরে সাচনা বাজারের মাথাত নিয়া গুলি কইরা মারছে।’
আক্ষেপ করে তিনি আরও বলেন, ‘স্বাধীনের পরে বাড়িত আইলে অখলের চাপে আমারে দুই কিয়ার জমিন দিছিল। আনিস উল্লাহ মরার পরে তার ছেলেরা আমারে আর এই জমি করবার লাগি দিছে না। তারা জোরেজাপ্পরে এই জমি আবার দখল কইরা নিছে। তাদের হুমকি-ধামকিতে এলাকা ছাইড়া আমি এখন মেয়ের বাড়িতে আছি। মেয়ে দুইডারে ছোট ছোট তইয়া আমার স্বামীরে এরা হত্যা করছে। এইখানে ঐখানে থাইক্যা কোন রকম মেয়েডিরে বিয়া দিছি।’
স্বামীর শোক বুকে চেপে এখনও নিরবে কেঁদে চলেছেন স্ত্রী মাতঙ্গিনী রায়। রাজাকার ও প্রতিবেশী শত্রুদের নির্মমতায় প্রাণহারা স্বামীর রেখে যাওয়া দুই শিশুকন্যাকে নিয়ে খেয়ে না খেয়ে দিন কেটেছে শহীদ স্ত্রী মাতঙ্গিনী রায়ের। গৌরাঙ্গ রায়ের আত্মীয়-স্বজনেরা যুদ্ধ পরবর্তী স্বাধীন দেশে ফিরলে এলাকায় আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তখন এলাকাবাসীর চাপে প্রতিবেশী রাজাকার সহযোগী আনিস উল্লাহ মাতঙ্গিনী রায়কে দুই কিয়ার জমি দেন। পরবর্তীতে আনিস উল্লাহর মৃত্যু হলে তার ছেলে-নাতিরা জোরপূর্বক সেই জমিটি দখলে নিয়ে নেয়। তাদের হুমকি-ধামকিতে এলাকা ছেড়ে মেয়ের বাড়িতে অবস্থান নেন মাতঙ্গিনী রায়। এখন শোকে-দুঃখে সেখানেই আছেন শহীদ পরিবারের এই হতভাগা নারী।
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে রাজাকার ও প্রতিবেশী সহযোগীদের নির্মমতায় স্বামী হারালেও এখন পর্যন্ত কারও পক্ষ থেকে কোন সাহায্য-সহযোগিতা পাননি শহীদ গৌরাঙ্গের স্ত্রী মাতঙ্গিনী রায়। দেশ স্বাধীন হয়েছে ঠিকই, তবে এই স্বাধীন দেশে রাজাকার ও রাজাকার সহযোগী পরিবারের লোকদের দুর্দ- প্রতাপ অব্যাহত থাকলেও শহীদ পরিবারের হতভাগা এই নারী দুই শিশু কন্যাকে নিয়ে এলাকা ছেড়েছেন। একজন শহীদ স্ত্রীর জন্য স্বাধীনতার এমন সুফল কি প্রাপ্য ছিল?( নিউজ সম্পাদনায় হাফিজা আক্তার)
জানা যায়, গৌরাঙ্গ প্রাণভয়ে আমাদের সামনে দিয়ে দৌঁড়ে আরফান উল্লাহদের বাড়িতে গিয়ে উঠে। পরে তাদের বাড়ির পার্শ্ববর্তী একটি ডোবায় ঝাঁপ দেয় এবং কচুরিপানার নীচে নাক জাগিয়ে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করে। ততক্ষণে তার পেছনে ছুটে আসা দুই রাজাকার আমাকে জিজ্ঞেস করে ‘এইদিকে একটা মানুষ আইছে, কোনদিকে গেছে দেখছসনি?’ না, দেখিনি বললে, তারা ঐ ডোবার পারে গিয়ে দাঁড়ায় এবং পানি ঘোলা দেখে ছলের সুরে বলে ওঠে ‘ঐ গৌরাঙ্গ তরে দেইখ্যালাইছি, উইঠ্যা আয়, না হইলে গুল্লি কইরা দিমু।’ গৌরাঙ্গ তাদের ছলচাতুরি বুঝতে না পেরে বাঁচার আশায় উঠে দাঁড়ায়। টেনেহেছড়ে তৎক্ষণাৎ তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় আনিস উল্লাহর বাড়িতে। সেখান থেকে তাকে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে যায় রাজাকারেরা। কিন্তু ঐ বাড়ির কেউ তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেনি। ঐ রাজাকাররা এদের বাড়িতে প্রায় সময়ই আসত। তারা ইচ্ছা করলেই গৌরাঙ্গকে বাঁচাতে পারত। কিন্তু তারা তা করেনি। পরবর্তীতে আনিস উল্লাহর পক্ষ থেকে গৌরাঙ্গ রায়ের স্ত্রীকে দুই কিয়ার জমিও দেওয়া হয়। কিন্তু পরে এই জমি জোরপূর্বক আবার দখলে নিয়ে নেয় তারা।’
রাজাকার সহযোগী আনিস উল্লাহর ছেলে জয়নাল আবেদীন তাদের বাড়ি থেকে গৌরাঙ্গকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে স্বীকার করে বলেন, ‘স্বাধীনের পরে আমার আব্বারে ডাইক্যা নিয়া কয়জনে কইতাছে এই বেডিডা (গৌরাঙ্গের স্ত্রী মাতঙ্গিনী) অসহায় হইয়া পড়ছে দু’এক কিয়ার জমিন দিলাইন, তারা চলুক খাউক। ঐ আরকি আব্বায় দুই কিয়ার জমিন দিছে।’
এই জমি এখন কোথায়? প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এইডা সঠিক জানি না। আমরার দখলেই আছে না বিকি হইয়া গেছে, এইডা কইতা পারতাম না।’
গৌরাঙ্গ রায়ের স্ত্রী মাতঙ্গিনী রায় কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘রাজাকার সত্তার মিয়া ও সুন্দর আলী আমার স্বামীরে ধইরা আনিস উল্লাহর বাড়িত লইয়া গেছে। পরে তারা আনিস উল্লাহর কাছে দুই’শ টেকা চাইছে, তারা টেকা দিছে না। তখন আমার স্বামী বাঁচবার লাইগ্যা কইছে আরফান ভাই (আনিস উল্লাহর ছেলে) এরার বাড়িত আমরার ধান-চাল সবকিছু আছে, আমারে বাঁচাও ভাই। কিন্তু তারা বাঁচাইছে না। পরে রাজাকাররা আমার স্বামীরে টাইন্যা নৌকাত তুলছে। এরপরে সাচনা বাজারের মাথাত নিয়া গুলি কইরা মারছে।’
আক্ষেপ করে তিনি আরও বলেন, ‘স্বাধীনের পরে বাড়িত আইলে অখলের চাপে আমারে দুই কিয়ার জমিন দিছিল। আনিস উল্লাহ মরার পরে তার ছেলেরা আমারে আর এই জমি করবার লাগি দিছে না। তারা জোরেজাপ্পরে এই জমি আবার দখল কইরা নিছে। তাদের হুমকি-ধামকিতে এলাকা ছাইড়া আমি এখন মেয়ের বাড়িতে আছি। মেয়ে দুইডারে ছোট ছোট তইয়া আমার স্বামীরে এরা হত্যা করছে। এইখানে ঐখানে থাইক্যা কোন রকম মেয়েডিরে বিয়া দিছি।’
স্বামীর শোক বুকে চেপে এখনও নিরবে কেঁদে চলেছেন স্ত্রী মাতঙ্গিনী রায়। রাজাকার ও প্রতিবেশী শত্রুদের নির্মমতায় প্রাণহারা স্বামীর রেখে যাওয়া দুই শিশুকন্যাকে নিয়ে খেয়ে না খেয়ে দিন কেটেছে শহীদ স্ত্রী মাতঙ্গিনী রায়ের। গৌরাঙ্গ রায়ের আত্মীয়-স্বজনেরা যুদ্ধ পরবর্তী স্বাধীন দেশে ফিরলে এলাকায় আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তখন এলাকাবাসীর চাপে প্রতিবেশী রাজাকার সহযোগী আনিস উল্লাহ মাতঙ্গিনী রায়কে দুই কিয়ার জমি দেন। পরবর্তীতে আনিস উল্লাহর মৃত্যু হলে তার ছেলে-নাতিরা জোরপূর্বক সেই জমিটি দখলে নিয়ে নেয়। তাদের হুমকি-ধামকিতে এলাকা ছেড়ে মেয়ের বাড়িতে অবস্থান নেন মাতঙ্গিনী রায়। এখন শোকে-দুঃখে সেখানেই আছেন শহীদ পরিবারের এই হতভাগা নারী।
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে রাজাকার ও প্রতিবেশী সহযোগীদের নির্মমতায় স্বামী হারালেও এখন পর্যন্ত কারও পক্ষ থেকে কোন সাহায্য-সহযোগিতা পাননি শহীদ গৌরাঙ্গের স্ত্রী মাতঙ্গিনী রায়। দেশ স্বাধীন হয়েছে ঠিকই, তবে এই স্বাধীন দেশে রাজাকার ও রাজাকার সহযোগী পরিবারের লোকদের দুর্দ- প্রতাপ অব্যাহত থাকলেও শহীদ পরিবারের হতভাগা এই নারী দুই শিশু কন্যাকে নিয়ে এলাকা ছেড়েছেন। একজন শহীদ স্ত্রীর জন্য স্বাধীনতার এমন সুফল কি প্রাপ্য ছিল?( নিউজ সম্পাদনায় হাফিজা আক্তার)
Please follow and like us:









