অফিসের অ্যাসাইনমেন্ট ছিল সন্ত্রাসবিরোধী জনসভাটি কাভার করা। জুনিয়র ফটো সাংবাদিক হিসেবে আমার দায়িত্ব পড়ল জিরো পয়েন্ট এবং আওয়ামী লীগ অফিসের আশপাশের এলাকা। আর সিনিয়র ভাইকে দেওয়া হলো জনসভার মঞ্চ ও শেখ হাসিনার ছবি তোলার দায়িত্ব। আমরা যথাসময়ে স্পটে উপস্থিত হলাম। জনসভার মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল ট্রাক দিয়ে। মঞ্চে উপস্থিত কেন্দ্রীয় নেতারা।
জনসভা শুরু হয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতারা বক্তব্য দিচ্ছেন। আমরা যার যার অবস্থান থেকে ছবি তুলছি। এরই মধ্যে সভাস্থলে এসে হাজির হলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। ততক্ষণে সভাস্থল ছাড়িয়ে গুলিস্তান জিরো পয়েন্টসহ পুরো এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। কর্মদিবসের বিকেলে ওই এলাকা ঘিরে তীব্র যানজট তৈরি হয়েছে।
শেখ হাসিনা বক্তব্য দেওয়া শুরু করেছেন। এর অর্থ হলো সভা শেষ হওয়ার পথে। এ রকম জনসভা তো অনেকই কাভার করি। সভা শেষে দ্রুত অফিসে গিয়ে ছবি জমা দেওয়ার তাড়া থাকে। শেখ হাসিনা বক্তব্য শেষ করার আগেই সেদিন কিন্তু আমি ধীরে ধীরে ওই এলাকা ছাড়ার জন্য হাঁটা শুরু করেছি, আবার একই সঙ্গে ছবি তুলছি।
ভিড় ঠেলে পল্টনে পৌঁছলাম। হঠাৎ শুনি পেছনে লোকজন চেঁচামেচি করছে আর দৌড়াচ্ছে। পরিস্থিতি বোঝার জন্য পেছনে তাকিয়েই দেখি, শত শত লোক দৌড়াচ্ছে। যে যেভাবে পারছে। কেউ গাড়িতে ঢিল ছুড়ছে। কেউ কেউ আবার ভাঙচুর চালাচ্ছে। আমি ব্যস্ত হয়ে উঠলাম ছবি তুলতে। আমি ছবি তুলছি আর আওয়ামী লীগ অফিসের দিকে এগোচ্ছি। তখনও আমি জানি না আসলে কী ঘটেছে। লোকজনের কাছে জানতে চাই। কয়েকজন বলল, নেত্রীকে মেরে ফেলেছে। আমি আর দেরি না করে আওয়ামী লীগ অফিসের দিকে দ্রুত এগোতে থাকি।
জিরো পয়েন্টের সামনে এসে দেখি বেশ কিছু গাড়িতে আগুন জ্বলছে। আমি ক্যামেরা দিয়ে একের পর এক ছবি তুলছি। আরো একটু এগিয়ে দেখি ভ্যানে করে আহত কয়েকজনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সবাই দৌড়াচ্ছে। এবার আমিও দৌড়ে আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি, কেউ কাতরাচ্ছে আর কারো কারো নিথর দেহ পড়ে আছে। চারদিকে রক্ত আর অসংখ্য স্যান্ডেল। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও সাবের হোসেন চৌধুরীকে দেখি ফুটপাতে অসহায় দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁদের গায়ের সাদা পাঞ্জাবি রক্তে ভিজে গেছে। হাসপাতালে যে যাবেন তারও কোনো উপায় নেই।
আমি ছবি তুলতে লাগলাম। যারা প্রথমে ভয়ে আশপাশে সরে পড়েছিল তারা এরই মধ্যে ফিরে এসে আহতদের উদ্ধার করা শুরু করেছে। কাউকে কাউকে দেখলাম ক্ষোভে উত্তেজিত হয়ে ঢিল ছুড়ছে। আহতরা আর্তচিৎকার করছে। রাস্তায় তখনো পুলিশ দাঁড়িয়ে। কিন্তু কেউ উদ্ধারে এগিয়ে আসছে না।
ক্ষুব্ধ, উত্তেজিত লোকজন আশপাশের ভবনে ঢিল ছোড়া শুরু করে। পুলিশ এর জবাব দেয় লাঠিপেটা ও টিয়ার গ্যাসের শেলের মাধ্যমে। একপর্যায়ে দুই পক্ষই শান্ত হয়। ভ্যান, রিকশা, মোটরসাইকেল—যে যেভাবে পারছে আহতদের ঢাকা মেডিক্যালের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
সাংবাদিকরা আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে ছোট রাস্তায় পড়ে থাকা স্যান্ডেলের মধ্যে গ্রেনেড দেখতে পায়। খুব কাছ থেকে ছবি তোলে সবাই। এরই মধ্যে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। সময়মতো অফিসে পৌঁছে পত্রিকায় প্রকাশের জন্য ছবি দেওয়ার বিষয়ও আছে। এমন অপ্রত্যাশিত ঘটনার ছবি তোলার জন্য মানসিকভাবে মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। ২১ আগস্টের সেই বিকেল ও সন্ধ্যার কথা আজও মনে পড়ে।
লেখক : কালের কণ্ঠ’র জ্যেষ্ঠ ফটো সাংবাদিক









