, , ,

শিরোনামঃ-




স্বামী না পিতা? জন্মসনদ একাধিকবার সংশোধন করেও মেলেনি সরকারি চাকরি

আরিফিন রিয়াদ, গৌরনদী,বরিশাল করেসপন্ডেন্ট।

আপডেট টাইম : জুন ০৩ ২০২৫, ০১:০৩ | 823 বার পঠিত | প্রিন্ট / ইপেপার প্রিন্ট / ইপেপার

বরিশালের আগৈলঝাড়ায় জন্মনিবন্ধন সংশোধনের নামে চলছে নজিরবিহীন অনিয়ম ও জালিয়াতির ঘটনা। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে সরকারি চাকরির উদ্দেশ্যে এই জালিয়াতি করা হলেও সময়মতো প্রয়োজনীয় সংশোধন না হওয়ায় চাকরি মেলেনি সংশ্লিষ্টদের।
নীতিমালা নয়, নিয়ম চালান ‘মালি’!
জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী জন্মতারিখ সংশোধনের ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট বা শিক্ষাগত সনদের ভিত্তিতে কেবলমাত্র দিন ও মাস সংশোধনের সুযোগ থাকলেও জন্ম সাল বা পুরো বয়স পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। তবে অভিযোগ উঠেছে, সরকারি নীতিমালার তোয়াক্কা না করে খোদ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারিহা তানজিনের ছত্রছায়ায় ‘মালি’ পদে নিয়োজিত কর্মচারী তারিকুল ইসলাম হলুদ মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে একাধিকবার পাল্টে দিয়েছেন নাগরিকদের জন্মনিবন্ধনের তথ্য, জন্ম তারিখ ও বয়স।
একটি পরিবার, দুইটি বয়স, একাধিক সংশোধন!
বাগধা ইউনিয়নের গোপালসেন গ্রামের বাসিন্দা নিখিল মধু ও তার স্ত্রী অঞ্জু মধুকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক বিরল নথি জালিয়াতির কাহিনী। যেখানে মালি হলুদের মধ্যস্থতায় নিজেদের সরকারি চাকরির উপযুক্ত করতে বয়সে এবং স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে আনা হয় কৌশলী পরিবর্তন। জন্মনিবন্ধনের মূল রেকর্ড অনুযায়ী নিখিল মধুর প্রকৃত জন্ম তারিখ ২ মার্চ ১৯৭৩ হলেও সরকারি চাকরির উপযুক্ত করতে তার বয়স সংশোধন করে ৭ মার্চ ১৯৮২ করে এক লাফে ৯ বছর কমিয়ে আনা হয়। একই উদ্দেশ্যে তার স্ত্রী অঞ্জু মধুর জন্মতারিখেও আনা হয় পরিবর্তন যেখানে অঞ্জুর বয়স ৫ জুলাই ১৯৮৫ থেকে প্রায় ৪ মাস এগিয়ে ২ মার্চ ১৯৮৫ বানানো হয়।
স্বামী না পিতা? নথি বিভ্রান্তি, বাস্তবে প্রতারণা!
সবচেয়ে বিস্ময়কর ও বিভ্রান্তিকর ঘটনা ঘটে অঞ্জু মধুর জন্মনিবন্ধনের স্বামী’র ঘরে। যেখানে নিখিল মধুর নাম স্বামীর পরিবর্তে ‘পিতা’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়! অর্থাৎ, বাস্তবে স্বামী হলেও সরকারি নথিতে স্বামী নিখিল মধু হয়ে যান নিজের স্ত্রীর ‘পিতা’! অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী সংশোধনের প্রথম ধাপে দেখা যায়, ২০২৩ সালের ২৬ নভেম্বর একটি আবেদনের মাধ্যমে অঞ্জু মধুর জন্মনিবন্ধনে প্রকৃত পিতা নিল কান্ত বাড়ৈর নামটি ভুল লিপিবদ্ধ হয়েছে মর্মে দাবি করে সংশোধনের মাধ্যমে স্বামী নিখিল মধুর নাম পিতা’র ঘরে প্রতিস্থাপন করা হয়। কিন্তু কাকতালীয়ভাবে এই সংশোধনের পরও কাঙ্খিত চাকরি না মেলায় এক বছর পর ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর দ্বিতীয় ধাপে আরও একবার সংশোধনের আবেদন করে পিতা’র ঘর থেকে নিখিলের নাম মুছে স্বামী’র ঘরে প্রতিস্থাপন করা হয়।
সশরীরে উপস্থিত না হয়েও দুই দফা সংশোধন!
জন্মনিবন্ধন সংশোধনের নীতিমালা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সশরীরে উপস্থিত থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদন করার কথা থাকলেও এই ঘটনায় দেখা যায় সংশোধনের পুরো প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট দুই জন নিখিল ও অঞ্জু একবারও অফিসে যাননি বরং নিখিল মধুর ভাই রিপন মধুই দুইবার আবেদন করে সংশোধন করেন। উপজেলার বাগধা ইউনিয়নের গোপালসেন গ্রামে গিয়েও খোঁজ মেলেনি নিখিল বা অঞ্জুর। তবে তার ভাই রিপন সরাসরি স্বীকার করেন অর্থের বিনিময়ে হলুদ স্যারের মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করেছেন তিনি। রিপন বলেন, ‘ঢাকায় একটি সরকারী চাকরির সুযোগ ছিল। সেই চাকরির জন্য ভাই আর ভাবীর তথ্যে পরিবর্তন ও বয়স কমানো লাগে। আমি অনলাইনে আবেদন করে ইউনিয়ন পরিষদ পরে উপজেলা অফিসে গিয়ে হলুদ স্যারের মাধ্যমে টাকা দিয়ে সংশোধন করাই। কিন্তু কাগজ পেতে দেরি হওয়ায় চাকরি হয়নি তাই পরে আবার সংশোধন করি। ’
কে এই ‘হলুদ স্যার’?
অনুসন্ধানে জানা যায়, অনলাইনে আবেদন করা হলেও সংশোধনের পুরো প্রক্রিয়ায় অনিয়মের মূল হোতা হিসেবে উঠে এসেছে ইউএনও অফিসের উদ্যান পরিচর্যাকারী তারিকুল ইসলামের নাম। যিনি স্থানীয়ভাবে ‘হলুদ স্যার’ নামেই পরিচিত। হলুদ সরকারি পদমর্যাদায় একজন সাধারণ মালি হলেও দীর্ঘদিন ধরে দপ্তরের ভেতরে এক অঘোষিত ক্ষমতার শাসক হয়ে উঠেছেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, আগৈলঝাড়া উপজেলা আওয়ামীলীগের অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য তার শ্বশুর বখতিয়ার শিকদারের রাজনৈতিক আশীর্বাদ এবং তৎকালীন সংসদ সদস্য হাসানাত আব্দুল্লাহর বিশেষ সুপারিশে হলুদ প্রথমে অস্থায়ীভাবে উপজেলা পরিষদে নিয়োগ পান। পরবর্তীতে ‘মালি’ পদে স্থায়ী হয়ে ধাপে ধাপে একাধিক প্রশাসনিক কাজ নিজের আয়ত্তে নেন। এখন এই ‘হলুদ স্যার’ শুধু বাগান যতেœই সীমাবদ্ধ নন বরং তিনি জন্মনিবন্ধন সংশোধনের মতো স্পর্শকাতর কাজ, দপ্তরের গোপন নথি ব্যবস্থাপনা, দাপ্তরিক কম্পিউটার ব্যবহার এমনকি অফিস সহকারীর কক্ষ ও নির্ধারিত চেয়ারও জোরপূর্বক দখল করে রেখেছেন।
নীরব ভূমিকায় ইউএনও!
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো এই অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য একাধিকবার বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকা ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও ইউএনও ফারিহা তানজিনের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেয়ায় হলুদ এখনও বহাল তবিয়তে তার অঘোষিত দপ্তর-দখল চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে আইডি-পাসওয়ার্ড তার হেফাজতে থাকায় হলুদের অপকর্মে তার প্রশ্রয় রয়েছে।
হলুদের বক্তব্যে অভিযোগের তীর ইউএনও’র দিকে!
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তারিকুল ইসলাম হলুদ নিজেকে টেকনিশিয়ান দাবী করেন এবং অভিযোগের দায় ইউএনও’র উপর চাপিয়ে বলেন, আইডি পাসওয়ার্ড স্যারের কাছেই থাকে। কাজ তো আমি করি না, কাজ স্যার করেন। অফিস সহকারী মতিউর রহমান কাজ না জানায়, আমি তার চেয়ারে বসি। গত পাঁচ বছর যাবত কাজ না পারায় কোন ইউএনও’র আমলেই সে চেয়ারে বসতে পারে নি। আমি শুধু ওই একজনের নয়, সব অফিস সহকারীর কাজ করি। তবে ফাইল সংক্রান্ত কোনো কাজ আমি করি না।
এদিকে হলুদ নিজেকে টেকনিশিয়ান দাবী করলেও হলুদ মালি পদেই রয়েছেন উল্লেখ করে আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারিহা তানজিন বলেন, সে যদি কোন অনিয়ম করে থাকে তাহলে অবশ্যই সেটা খতিয়ে দেখা হবে।

Please follow and like us:

সর্বশেষ খবর

এ বিভাগের আরও খবর

প্রধান সম্পাদক- খোরশেদ আলম চৌধুরী, সম্পাদক- আশরাফুল ইসলাম জয়,  উপদেষ্টা সম্পাদক- নজরুল ইসলাম চৌধুরী।

 

ঢাকা অফিস : রোড # ১৩, নিকুঞ্জ - ২, খিলক্ষেত, ঢাকা-১২২৯,

সম্পাদক - ০১৫২১৩৬৯৭২৭,০১৬০১৯২০৭১৩

Email-dailynayaalo@gmail.com নিউজ রুম।

Email-Cvnayaalo@gmail.com সিভি জমা।

প্রধান সম্পাদক কর্তৃক  প্রচারিত ও প্রকাশিত।

 

সাইট উন্নয়নেঃ ICTSYLHET